বিদেশি ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পে চাপ, নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

লেখক: Rumie
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

Manual6 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট : ঋণনির্ভর বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে প্রশ্ন। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি, পরিচালনাগত জটিলতা এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না পাওয়ায় দেশের বৈদেশিক ঋণের চাপ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়ন ও ঋণ ব্যবস্থাপনার এই সমীকরণ এখন নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Manual3 Ad Code

২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারের বৈদেশিক ঋণ ছিল ২০ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে ঋণের পরিমাণ পৌঁছায় ৮০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক দশকের কিছু বেশি সময়ে ঋণ প্রায় চার গুণ হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই ঋণের বিপরীতে অর্থনীতিতে কতটা প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।

বিমানবন্দরের টার্মিনাল, ব্যয় বাড়ল, সুফল ঝুলে রইল
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এর তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পকে দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হলেও ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা সংশোধন করে ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি ৬ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ এসেছে দ্বিপক্ষীয় ঋণ থেকে।

২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর আংশিক উদ্বোধনও করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে পূর্ণাঙ্গ চালুর লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ভূমিসেবা ও পরিচালনাগত জটিলতা প্রকল্পটিকে আটকে দেয়। এর মধ্যে ঋণের সুদ নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়েছে। মূল ঋণের অবকাশকালও কমেছে।

বিশ্বব্যাংক-এর ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের ভাষায়, বিদেশি ঋণের সুদ অর্থ ছাড়ের দিন থেকেই গণনা শুরু হয়। অর্থাৎ প্রকল্প চালু হোক বা না হোক, সুদের ঘড়ি থেমে থাকে না।

Manual8 Ad Code

ঋণ পরিশোধের চাপে নতুন সমীকরণ
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পূর্বাভাস দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ০৮৬ বিলিয়ন ডলার। পরিশোধের এই ঊর্ধ্বগতি বাজেট ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-এর মহাপরিচালক এ কে এম এমামুল হক বলেন, চলমান প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ দায় অনেক সময় পূর্বাভাসে প্রতিফলিত হয় না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ঋণমান হ্রাসের বিষয়টিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

Manual5 Ad Code

৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণঝুঁকিতে মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে, তবে বড় ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই সতর্কবার্তা ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা ও অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।

Manual2 Ad Code

বিদ্যুৎকেন্দ্র, সক্ষমতা আছে, উৎপাদন কম
২০১৪ সালে শুরু হওয়া মাতারবাড়ী ২ গুণ ৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫৬ হাজার ৬৯৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪৭ হাজার ৯৪৫ কোটি ৩ লাখ টাকা বিদেশি ঋণ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চালু হলেও বয়লারের প্রযুক্তিগত সমস্যায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে।

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তামিম বলেছেন, প্রত্যাশিত উৎপাদন না হওয়ায় সরকার ক্ষতির মুখে পড়ছে। সক্ষমতা ভাড়া বাবদ বছরে প্রায় ১ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা অপারেশনাল ক্ষতির তথ্যও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। সময়সীমা ২০২৬ থেকে বাড়িয়ে ২০২৮ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন না থাকায় শুরুর দিকে অর্ধেক সক্ষমতা ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়েছে।

 

অবকাঠামো আছে, ব্যবহার কম
ঢাকা খুলনা রেললাইন প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের পর দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ। সক্ষমতা থাকলেও বাংলাদেশ রেলওয়ে দিনে মাত্র দুই জোড়া যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করছে। অবকাঠামো বিনিয়োগ ও বাস্তব চাহিদার মধ্যে এই ব্যবধান এখন আলোচনায়।

গাজীপুর বিমানবন্দর বাস দ্রুত পরিবহন করিডর প্রকল্পেও ২ হাজার ৮০০ কোটির বেশি ব্যয় হয়েছে। নকশাগত ও ধারণাগত ত্রুটির কারণে প্রকল্পটি এখনো শেষ হয়নি। ভেঙে ফেলতে হলে আরও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

প্রশ্ন এখন জবাবদিহির
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ নেওয়া স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সময়মতো বাস্তবায়ন, সঠিক নকশা, কার্যকর তদারকি এবং অর্থনৈতিক ফেরত নিশ্চিত না হলে ঋণ উন্নয়নের বদলে দায়ে পরিণত হয়।নতুন সরকারের জন্য তাই চ্যালেঞ্জ শুধু ঋণ পরিশোধ নয়, বরং প্রকল্প বাছাই, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা। অন্যথায় ঋণের অঙ্ক বাড়বে, আর অর্থনৈতিক চাপও দীর্ঘমেয়াদে বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code