

সম্পাদকীয়: জাতিসংঘ আজ বলেছে, ২০২০ সালে বৈশ্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, যার বেশিরভাগই সম্ভবত কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও মহামারির প্রভাব এখনও পুরোপুরি খতিয়ে দেখা হয়নি[1], কয়েকটি সংস্থার (মাল্টি-এজেন্সি) এক যৌথ প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ বা ৮১ কোটি ১০ লাখ মানুষ গত বছর অপুষ্টিতে ভোগে। সংখ্যাটি এটাই নির্দেশ করছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীকে ক্ষুধামুক্ত করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে বিশ্বকে ব্যাপক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা শীর্ষক প্রতিবেদনের এই বছরের সংস্করণটি মহামারির যুগে এ জাতীয় প্রথম বৈশ্বিক মূল্যায়ন। যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অগ্রিকালচার অরগানাইজেশন (এফএও), ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি), ইউনাইটেড ন্যাশন্স চিলড্রেন্স ফান্ড (ইউনিসেফ), ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (ডব্লিউএইচও)।
এই প্রতিবেদনের আগের সংস্করণগুলো ইতোমধ্যে লাখ লাখ মানুষের – যাদের অনেকেই শিশু – খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টির প্রতি বিশ্বকে সতর্ক করে। এই বছরের প্রতিবেদনের ভূমিকায় জাতিসংঘের পাঁচ সংস্থার[2] প্রধানরা লিখেছেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মহামারি অব্যাহতভাবে আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে চলেছে, যা বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।”
কূটনৈতিক গতি বৃদ্ধির বিষয়ে নতুন আশাবাদ ব্যক্ত করলেও তারা একটি “সংকটপূর্ণ মুহূর্ত” সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তারা লিখেছেন, “এই বছর আসন্ন জাতিসংঘ খাদ্য সম্মেলন, বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি বিষয়ক সম্মেলন, এবং জলবায়ু বিষয়ক কপ২৬ সম্মেলন খাদ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির বিষয়টিকে এগিয়ে নেওয়ার অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
ইতোমধ্যে ২০১০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অপরিবর্তনীয় হ্রাসের আশাকে ধুলিস্যাত করে দিয়ে ক্ষুধা পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। উদ্বেগজনকভাবে, ২০২০ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ছাপিয়ে নিরঙ্কুশ এবং আনুপাতিক –- উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষুধা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৯ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০১৯ সালের ৮.৪ শতাংশের চেয়ে বেশি ছিল।
অপুষ্টির শিকার মানুষের অর্ধেকেরও বেশি (৪১ কোটি ৮ লাখ) এশিয়ায় এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি (২৮ কোটি ২০ লাখ) আফ্রিকায় বসবাস করে। আর অপেক্ষাকৃত একটি ছোট অংশ (৬ কোটি) লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে বসবাস করে। তবে ক্ষুধা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আফ্রিকায়, যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশই অপুষ্টির শিকার, যা অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ।
পরিমাপের অন্যান্য সূচকেও ২০২০ সালটি ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। সামগ্রিকভাবে, ২৩০ কোটিরও বেশি মানুষের (বা বিশ্বের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ) বছরজুড়ে পর্যাপ্ত খাবারের অভাব ছিল: মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রাদুর্ভাব হিসেবে পরিচিত এই সূচকের এক বছরের বৃদ্ধি গত পাঁচ বছরের সম্মিলিত বৃদ্ধির সমান ছিল। লিঙ্গ বৈষম্য গভীরতর হয়েছে: ২০২০ সালে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা প্রতি ১০ জন পুরুষের বিপরীতে নারীর সংখ্যা ছিল ১১ জন (২০১৯ সালের ১০.৬ থেকে বেশি)।
অপুষ্টির সবগুলো ধরনই বিদ্যমান রয়েছে, যেখানে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ২০২০ সালে পাঁচ বছরের কমবয়সী প্রায় ১৪ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি শিশু ছিল খর্বকায় বা তাদের বয়সের তুলনায় কম উচ্চতাসম্পন্ন; ৪ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি শিশু ছিল রোগা বা তাদের উচ্চতার তুলনায় শীর্ণকায়; এবং প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ শিশুর ওজন ছিল নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি।[3] ৩০০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু স্বাস্থ্যকর খাবার থেকে বঞ্চিত ছিল, যার বড় কারণ খাদ্যদ্রব্যের অতিরিক্ত মূল্য। প্রজনন বয়সী নারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রক্ত স্বল্পতায় ভোগেন। বিশ্বব্যাপী কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে, যেমন — অনেক শিশুকে এখন শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। তবে তা সত্ত্বেও ২০৩০ সালের মধ্যে পুষ্টির কোনো সূচকে লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব সঠিক পথে নেই।