ব্যাতিক্রমী এক ভ্রমণকাহিনী “চ্যাঙের খালে ব্যাঙের ফাল”

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

Manual7 Ad Code

ইফতেখার শামীম:

 

Manual2 Ad Code

১) বইয়ের নেশা আমার সেই শৈশব থেকেই। যখন যে বই পেয়েছি, এক প্রকার মুগ্ধতা নিয়ে পড়েছি। ঠিক এজন্যই আজ যৌবনের সদর দরোজায় এসেও ” হুমায়ূন আহমেদ” এর ” মে- ফ্লাওয়ার”,

এইচ এম খলিল সম্পাদিত সমুদ্র সৈকতে টারজান, জোনাথন সুইফট এর “লিলিপুটের দেশে” এবং “লাপুটাদের দেশে”, এই হাতেগোণা মাত্র ৪টি গ্রন্থই আমার পাঠ্য ভ্রমণকাহিনী।

সর্বশেষ কিছুদিন আগে সংযোজন হলো গল্পকার সেলিম আউয়াল স্যারের ব্যাতিক্রমী এক ভ্রমণকাহিনী “চ্যাঙের খালে ব্যাঙের ফাল”।

 

২) আমরা সাধারণত ভ্রমণকাহিনীতে লেখকের অন্যান্য দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার শব্দভান্ডারকেই গ্রন্থাকারে পাই। কিন্তু সেই গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে গল্পকার সেলিম আউয়াল একটি কবিতার কথা মনে করিয়ে দিলেন।

নবম-দশম শ্রেণীতে প্রায়ই একটি কবিতা পড়তাম,

বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরি/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু/

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শীষের উপরে/ একটি শিশির বিন্দু।

 

Manual4 Ad Code

৩) চ্যাঙের খালে ব্যাঙের ফাল অন্য কোনো দেশ ভ্রমণের লেখকের ব্যাক্তিগত শব্দভান্ডার নয়, বরং বিভিন্ন সময় লেখক নিজ দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাকেই এই গ্রন্থে শিল্পের তুলিতে একেঁছেন। নিজ দেশের বিস্তৃত সৌন্দর্যের গাণিতিক প্যাটার্ন তৈরি করে লেখক শত পাঠকের হৃদয়ে দেশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার চমৎকার আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।

 

৪) লেখক নিজেই বলছেন,

“দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরের দুয়েকটি দেশ সফরের সুযোগ আমার হয়েছে। সপ্তাহ- দু সপ্তাহ কতোটুকু আর দেখা যায়, তাদের সাজিয়ে রাখা দুয়েকটি দর্শনীয় স্থানই ঘুরে ফিরে দেখা। ভ্রমণকাহিনী লেখলে অনেকের মতো ঘুরেফিরে সেই সবেরই বর্ণণা। কিন্তু জনমের যে মাটিতে হাফ সেঞ্চুরি পার হলো, কতোটুকু দেখা হয়েছে সেই ভূমিটুকুন। দেশের ভেতরের ঘুরাঘুরির গালগল্প টুকটাক লেখলে তো মন্দ হয় না, সেই ভাবনায় বিভিন্ন সময়ে লেখা ভ্রমণকাহিনীর সংকলন ‘চ্যাঙের খালে ব্যাঙের ফাল ‘।

 

৫) হেডলাইটটি হঠাৎ করে নিভে জিপের স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেলো। গাড়ি যে চালাচ্ছিলো ওর নাম পল। ছিলো হিন্দু, বাপের আমল থেকে খ্রিষ্ঠান হয়েছে। তাই এখন ওর নামধাম খ্রিষ্টানদের মতো। পল বললো লাইটের সুইচ ভেংগে গেছে। চারপাশে তাকাতেই গা ছম ছম করে উঠে। রাস্তা থেকে খানিকটা সমতল ভূমি ছেড়েই দুপাশে ছোট দুটো টিলা। কি সব গাছগাছালিতে ছাওয়া। টিলাগুলো খুব উঁচু নয়, বিস্তৃতও নয়। হেডলাইটের আলোয় দেখেছিলাম। টিলার খানিক পরই সমতল ভূমি, ধানের ক্ষেত। বেশ কিছু ক্ষেতের জমি পেরিয়ে আবার টিলা। এই এলাকায় ধান চাষের মতো পরিকল্পনা করে টিলায় গাছ চাষ করা হয়েছে। বছর কয়েক পরে রোপন করা গাছ কাটলে অনেক টাকার কাঠ মিলবে। টিলার গাছগুলোর ঠিক মাথার উপরে ঘষা তামার আধুলির মতো বিশাল একখানা চাঁদ আলো ছড়াচ্ছে। আলোটা কেমন মরা মরা।

 

এভাবে খুঁটিনাঁটি বিষয়গুলো চমৎকার উপস্থাপনের মাধ্যমে গল্পকার আমাদের সবুজ অরণ্য’কে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন পাঠক হৃদয়ে

 

৬) চব্বিশ জানুয়ারির সন্ধ্যে সাতটা, উনিশ শত বিরানব্বই সাল। কিছুক্ষণ পরই আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো। ফিরে যাবো ক্ষণিকের ফেলে আসা বাসাবাড়িতে। আর কখনো এভাবে এই দিনের পিকনিকে যাবার সুযোগ হবে না। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাবে অবিরত, ঘড়ির কাটা ঘুরবে অবিরাম। জীবন সয়গ্রামে সবাই আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়বো। কেউ বিজয়ী হবো, কেউ হবো পরাজিত। অনেকদিন পর একজনের সাথে আরেকজনের দেখা হতে পারে। তখন হয়তো আজকের এই আনন্দঘন মুহুর্তের কথা মনে থাকবে না। পুরনো সেই আবেগে জড়িয়ে ধরবে না- দোস্ত কি খবর? ক’জন সেদিন উপলব্ধি করতে পারবে জলের ধারার এই হিম ছোঁয়া।

আমি খুব ফীল করছিলাম- জীবন বৃক্ষ থেকে ক’টা পাতা ঝরে গেলো। জীবন বৃক্ষটা একদিন পাতাশূন্য হয়ে শুকিয়ে যাবে।

লেখকের সূত্র ধরেই বলি, বইয়ের এইখানে এসে আমিও খুব ফীল করছিলাম জীবন নদে হারিয়ে ফেলা অনেক বন্ধু, অনেক স্মৃতি। ভীষণ ইমোশনে চোখের ভিতর ভিজে যাচ্ছিলো। লেখকের স্বার্থকতা এইখানেই, নিজের কথাগুলো দিয়ে পাঠকের হৃদয় ছোঁয়া। পাঠক’কে তার নিজের অব্যক্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়া।

 

৭) মোট ১৫ টি স্থান পরিদর্শনের ভ্রমণকাহিনী নিয়ে রচিত বইটিতে প্রতিনিধিত্ব করছে সুন্দরের পৃথিবী, পৃথিবীর হুর সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ। বইটি যেন এদেশের সুন্দরের প্রতিচ্ছবি। বইটি পড়তে পড়তে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম রঘুনন্দন পর্বতের মায়া হরিণের দলে, প্রেমে পড়েছিলাম সীতার হাওরের খোঁপায় ফুল গোঁজা টিপরা মেয়ের। বইটি পাঠ করতে করতে আমি ঘুরে এসেছি পান, পানি আর নারীর রাজ্য, হাসন রাজার রঙিন রামপাশা, আর আমার স্বপ্নের প্রজাপতির ডানায় চড়ে দেখেছি জন্মভূমি বাংলা’কে।

Manual6 Ad Code

 

৮) গল্পকার সেলিম আউয়ালের ৫৫তম জন্মদিবস উপলক্ষ্যে ১০ জানুয়ারি ২০১৮ ‘তে সিলেটের কৈতর প্রকাশন থেকে প্রকাশিত “চ্যাঙের খালে ব্যাঙের ফাল” পাঠ করার মাধ্যমে ভ্রমণের নেশা প্রবলভাবে চেপে ধরেছে আমাকে। বই’টি উৎসর্গ করা হয়েছে লেখক ও প্রকাশক মোস্তফা সেলিম, গবেষক ও সাংবাদিক সুমনকুমার দাশ এবং লেখক ও শিক্ষক সুজিত রঞ্জন দেব’কে।

বইটির প্রচ্ছদ করেছেন মুমিনুল মুহিব, এবং বইটির শুভেচ্ছা মূল্য ধরা হয়েছে ২০০ টাকা।

Manual5 Ad Code

 

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code