

ডেস্ক রিপোর্ট:ফলমূল, শাকসবজি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য সবকিছুতেই ভেজাল মিলছে। এককথায় বলা যায়, ভেজাল ছাড়া খাদ্য নেই। আর মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠছে খাদ্যে মেশানো বিভিন্ন রাসায়নিক ও ভারী ধাতু। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ভয়াবহ। ওসব খাবার বাড়াচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি। যদিও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) কাজ করছে। কিন্তু পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। যা দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং বিএফএসএ ও বিএসটিআই সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাজারে খাদ্যে ভেজালের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিগত ১০ মাসে ১ হাজার ৭৫৬টি খাদ্যনমুনা পরীক্ষা করে বিভিন্ন পণ্যে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সারফেস অ্যাকটিভের মতো রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যা খাদ্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ভেজাল হিসেবে গণ্য। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস, বাচ্চাদের জুস, চানাচুর, মরিচ-হলুদের গুঁড়া, ঘি, পাউডার দুধ, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা, মধুসহ নানান পণ্যে ওসব অনিয়ম ধরা পড়ে। পরীক্ষিত চিপসের ৬৫ শতাংশে অ্যাক্রিলামাইড পাওয়া গেছে, যা ভাজা বা পোড়ানোর ফলে তৈরি হওয়া একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক।
সূত্র জানায়, ভেজাল খাদ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদান ধীরে ধীরে বিকল করে দেয় মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির সঙ্গেও ওসব খাবারের সম্পর্ক রয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে খাদ্য তৈরি করছে। লক্ষ্য অতিমুনাফা। মূলত মাঠপর্যায়ে নিয়মিত ও কার্যকর তদারকির ঘাটতির সুযোগে দিন দিন খাদ্যে ভেজালের পরিধি বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) জুলাই-এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে বিএফএসএর ১ হাজার ৭৫৬টি নমুনার ৫৮৬টির (৩৩.৪ শতাংশ) খাবারে ভেজাল বা দূষণ মিলেছে। আর ১১২টি নমুনায় সরাসরি ভেজাল উপাদান শনাক্ত হয়েছে। যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষায় দেখা গেছে, গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান রয়েছে। ৩৫ শতাংশ ফলে ও ৫০ শতাংশ শাকসবজিতে কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। চালের ১৩টি নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক এবং পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসাসহ ভারী ধাতু এবং লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। এমনকি মুরগি ও মাছেও মিলেছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক। আর ভেজালের হার বিগত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
সূত্র আরো জানায়, ভেজাল খাদ্য গ্রহণে ক্যানসার, কিডনি ও ডায়াবেটিস রোগী বাড়ছে। এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতি বছর দেশে ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে, ২ লাখ কিডনি রোগে, দেড় লাখ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। তাছাড়া গর্ভবতী মা ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মদান করে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে হেপাটাইটিস, কিডনি, লিভার ও ফুসফুস সংক্রমিত রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।
এদিকে এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা জানান, ভেজাল খাবার প্রতিরোধে বিএফএসএ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে। বাজার থেকে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে প্রতি মাসে পরীক্ষা করা হয়। তবে সংস্থাটির নিজস্ব ল্যাব না থাকায় রাজধানীর সরকারি বিভিন্ন পরীক্ষাগারে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করে পরীক্ষাগুলো করে থাকে। তাছাড়া দেশের সব জেলা থেকে প্রতি মাসে দুটি নমুনা পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে। জেলাগুলোয় মাত্র তিনজন কর্মী দিয়ে ওসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। জনবল সংকটের কারণে মনিটরিংয়ে কিছুটা সমস্যা হয়।
অন্যদিকে ভেজাল খাদ্যে জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব প্রসঙ্গে সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলাম জানান, বাইরে থেকে কেনা খাবারে বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর উপাদান মেশানো হয়। শরীরের জন্য ক্ষতিকর রং, প্রিজারভেটিভ, ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। মুখরোচক করার জন্য অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করা হয়। ওসব উপাদান মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে। লিভারের সমস্যার পাশাপাশি ওসব খাবার কিডনির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অনেক উপাদান দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি করে এবং দুরারোগ্য রোগ জন্ম দেয়। তাই ওসব খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। বাড়িতে স্বাস্থ্যকর উপায়ে বানানো খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে।