ভ্যাট ফাঁকি ১,৬৭৬ কোটি টাকা, আদায় ১৪৩ কোটি টাকা

লেখক:
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual2 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে (২০২০-২০২১) এনবিআরের ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর ২৩৩টি ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ তদন্ত করেছে। এতে প্রায় ১৬৭৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে। জরিমানাসহ এ ফাঁকির টাকা আদায় হয়েছে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ভ্যাট গোয়েন্দার কার্যক্রম মূল্যায়নে এ চিত্র উঠে এসেছে।

সুষ্ঠু করদাতাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা প্রতিরোধ, বিদ্যমান আইন ও বিধির পরিপালন নিশ্চিতকরণসহ ভ্যাট আহরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এনিআরের এই গোয়েন্দা সংস্থাটি।

নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন শুরুর মধ্যেই করোনার বিস্তারের সময়টিতে ভ্যাট ফাঁকি রোধে বড় ধরনের কোনো অভিযানে নামেনি ভ্যাট গোয়েন্দা সংস্থা।পরবর্তীতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে চালু হওয়ায় এনবিআরের নির্দেশে ভ্যাট ফাঁকি রোধে মাঠ পর্যায়ের রাজস্ব আহরণকারী দপ্তরের পাশাপাশি গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করে ভ্যাট গোয়েন্দা।এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণও মিলেছে।

ভ্যাট গোয়েন্দাদের তদন্ত অনুযায়ী প্রধানত পাঁচ উপায়ে ভ্যাট ফাঁকি ঘটে থাকে।এগুলো হলো: ১. কোন কোন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকৃত উপকরণ ক্রয় ও উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের তথ্য গোপন করে মাসিক রিটার্নে কম টার্নওভার প্রদর্শন করে থাকে।ফলে কম প্রদর্শিত বিক্রয়ের উপর যথাযথ ভ্যাট আহরণ হয় না; ২. কোন কোন কোম্পানি একাধিক বার্ষিক সিএ রিপোর্ট তৈরি করে।প্রকৃত আ্যকাউন্টিং এর তথ্য ভ্যাট কর্তৃপক্ষের কাছে ঘোষিত হয় না ; ৩. অনেক প্রতিষ্ঠান বিক্রয়ের উপর ভ্যাট দিলেও ব্যয়ের উপর উৎসে প্রযোজ্য ভ্যাট কর্তন করে না।এতে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাকি হয়; ৪. অনেকে নিবন্ধন না নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করছে।ভ্যাট আইন অনুসারে ব্যবসার পূর্বেই ভ্যাট নিবন্ধন নেয়া বাধ্যতামূলক।এদের কেউ কেউ আবার নিবন্ধন ব্যতিরেকে ক্রেতাদের নিকট হতে অবৈধভাবে ভ্যাট নিচ্ছে ; ৫. আবার কেউ কেউ ভ্যাট নিবন্ধন নিলেও ক্রেতাদের নিকট থেকে সংগৃহীত ভ্যাট আইন অনুসারে সরকারি কোষাগারে জমা দেয় না। এদের এক অংশ যথাযথভাবে ভ্যাট চালানও ইস্যু করে না।

ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর দুইভাবে এই তদন্ত করেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বার্ষিক অডিট কর্মসুচি তৈরি করে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন ও অডিট সম্পন্ন করে। অন্যটি ভ্যাট আইনের ধারা ৮৩ অনুসারে তল্লাশি অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে। গতবছরের হিসাব অনুসারে অডিট সম্পন্ন করা হয় ১৪১টি প্রতিষ্ঠানের। ৮৩ ধারায় অভিযান করা হয় ৯২টি প্রতিষ্ঠানে।

গত অর্থবছরে রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান করাসহ নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে প্রায় বিপুল পরিমাণ ফাঁকি উদঘাটন করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর। এ তালিকায় ব্যাংক, বীমা, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

ভ্যাট গোয়েন্দা দপ্তরের চার্টার অব ফাংশন অনুযায়ী নিয়মিত অডিট পরিকল্পনা প্রণয়ন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, গোয়েন্দা তথ্য ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশেষ অডিট ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের মাধ্যমে সর্বমোট ১৪১ টি প্রতিষ্ঠানের অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। এই অডিটের মাধ্যমে প্রায় ১৪০৪ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটিত হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অডিটে উদ্ঘাটিত টাকা স্বপ্রণোদিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করেছে। অডিটে সর্বোচ্চ রাজস্ব উদঘাটিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ৪৬২ কোটি ২৮লক্ষ, প্রিমিয়ার ব্যাংক লি. ১৪৫ কোটি ১৬ লক্ষ, ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংক লি. ১২৫ কোটি ৭৩ লক্ষ, বেসিক ব্যাংক লি. ১০০ কোটি ৫১ লক্ষ, জনতা ব্যাংক লি. ৪৯ কোটি ৫২ লক্ষ, আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি. ৪৮ কোটি ৮৪ লক্ষ, সোনালী ব্যাংক লি. ৪৪ কোটি ২৭লক্ষ, আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লি. ২৬ কোটি ৩৭ লক্ষ, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স লি. ২৫ কোটি ২৮ লক্ষ, ডিপিএসএসটিএস স্কুল ২৩ কোটি ০৩ লক্ষ, কারিশমা সার্ভিসেস লি. ২০ কোটি ৯৭ লক্ষ, লংকা বাংলা ফাইন্যান্স লি. ২০ কোটি ৬০ লক্ষ, এলিট পেইন্ট এন্ড কেমিক্যাল ইন্ডা: লি. ২১ কোটি ২০ লক্ষ টাকাসহ তালিকায় রয়েছে অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া নিজস্ব জনবল, সোর্স, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, ব্যক্তি বিশেষের গোপন অভিযোগপত্র ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হতে সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্যতা যাচাইপূর্বক এ দপ্তরের গোয়েন্দা দল কর্তৃক সরেজমিনে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও দলিলাদি জব্দকরণের মাধ্যমে প্রায় ১৩৪.৬ কোটি টাকা উদঘাটিত হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অভিযানের মাধ্যমে উদ্ঘাটিত ফাঁকির ক্ষেত্রে স্বপ্রণোদিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৮.৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করেছে। এই অভিযানে সর্বোচ্চ রাজস্ব উদঘাটিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে আকতার ফার্নিচার ৩৯ কোটি ৬৩ লক্ষ, মোহাম্মদী ট্রেডিং ৩৮ কোটি ৯৯ লক্ষ, চারুতা প্রাইভেট লিমিটেড ৩০ কোটি ৩৬ লক্ষ, উজালা পেইন্টস ইন্ডা. ২৭ কোটি ১৪ লক্ষ, হোটেল লেকশোর সার্ভিস লিঃ ১৬ কোটি ৯৮ লক্ষ, ফুড ভিলেজ প্লাস ১৩ কোটি ৫২ লক্ষ, ফুড ভিলেজ লিমিটেড ১২ কোটি ৯৩ লক্ষ, ডিবিএল সিরামিক্স লি. ৬ কোটি ৮৯ লক্ষ, খান কিচেন লিঃ ৩ কোটি ৬০ লক্ষ, সুং ফুড গার্ডেন ৩ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকাসহ তালিকায় রয়েছে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া, গেল অর্থবছরে এ অধিদপ্তর কর্তৃক বিভিন্ন মার্কেটে খুচরা পর্যায়ে বিশেষ জরিপ পরিচালনা করা হয়।এ সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিশেষ নির্দেশে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সর্বমোট ২৫টি মার্কেটে অবস্থিত ১৫,৪৮২ টি দোকানে জরিপ পরিচালনা করা হয়।জরিপে দেখা যায়, নতুন আইন অনুযায়ী ১৩ ডিজিটের ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা খুবই কম।

Manual3 Ad Code

বিশেষ করে চলতি বছরের মে ২৪-৩১ তারিখ এক সপ্তাহের ১৭টি মার্কেট জরিপে দেখা যায় মোট ১৯৭৪ টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিবন্ধন পাওয়া যায় ৫১৬ টি। বাকি ১৪৫৮ টি ব্যবসার কোন ভ্যাট নিবন্ধন নেই। অর্থাৎ অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের হার প্রায় ৭৭.৩৬%।অন্যদিকে নিবন্ধিত ব্যবসার হার ২২.৬৪%। জরিপ অনুযায়ী মাসে ৫ হাজার টাকার উপরে ভ্যাট প্রদান করে মাত্র ১১৩ টি। বাকি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নিয়েছে তবে তারা নামমাত্র ভ্যাট প্রদান করে।

Manual6 Ad Code

এ অধিদপ্তর পরিচালিত জরিপে মার্কেটে অবস্থিত দোকানের মালিক এবং মার্কেট এসোসিয়েশান এর প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করেছে এবং তাদের আইন পরিপালনে উদ্ধুদ্ধ করা হয়েছে। চলতি বছরে এসংক্রান্তে বিভিন্ন সংগঠনের সাথে আরো বেশ কিছু আলোচনা সভার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

Manual2 Ad Code

এনবিআরের ভ্যাট অনলাইন সূত্রে জানা যায়, ভ্যাট গোয়েন্দাদের জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার পর মাঠ পর্যায়ে ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণের হার মাসে প্রায় ৪ গুণ বেড়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব চলতি অর্থবছরে রাজস্ব খাতে লক্ষ্য করা যাবে বলে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর মনে করে।

ভ্যাট ফাঁকি রোধে নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবন,কর্মকর্তাদের উদ্ধুদ্ধকরণ ও অভিন্ন নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গেল অর্থবছরে অধিদপ্তর নিরীক্ষা, তদন্ত ও অনুসন্ধানের মাধমে মোট ১৬৭৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটন করেছে, যার বিপরীতে ১৪৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার তাৎক্ষণিকভাবে জমা হয়।সার্বিকভাবে এর ফলে মাঠ পর্যায়ে রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এ উদঘাটন বিগত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বেশী এবং তাৎক্ষণিক আদায় প্রায় ২.৫ গুণ বেশী।উল্লেখ্য ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটন হয়েছিল ৩১৯ কোটি টাকা; আদায় হয়েছিল প্রায় ৫৭ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরেও ভ্যাট গোয়েন্দার উক্ত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ভ্যাট ফাঁকির আরো নিত্যনতুন ক্ষেত্র উদ্ভাবন এবং তা রোধে অধিকতর কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করা হবে।

Manual5 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code