‘মঙ্গা’ যেন আর ফিরে না আসে

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual8 Ad Code

ত্তরাঞ্চলের মানুষ ‘মঙ্গা’ নামের অভাবের সাথে লড়াই করছে। দীর্ঘ সময় ধরে এ লড়াইয়ে এ অঞ্চলের মানুষ যখন ‘মঙ্গা’ নামক এ অভিশাপ থেকে অনেকটা মুক্ত হওয়ার কাছাকাছি। সে সময়ে সারাবিশ্বের মতো করোনা ভাইরাসের কারনে সারাদেশের ন্যায় উত্তরাঞ্চলের মানুষেরও জীবনযাত্রা আজ স্থবির। কর্মহীন এ অঞ্চলের মানুষ আবার কী এই মঙ্গা নামক অভিশাপের কবলে পড়তে যাচ্ছে? করোনা পরিস্থিতি যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই ভাবাছে মানুষকে।
উত্তরাঞ্চলের জেলার গুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলা অনেকটা পিছিয়ে পড়া। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কুড়িগ্রামের মানুষ নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের কারনে কুড়িগ্রামের মানুষের সব স্বপ্ন কী তাহলে আজ থেমে যাবে? এমন আশংকা আজ ধুকে ধুকে ভাবাচ্ছে কুড়িগ্রামের মানুষকে। ব্রহ্মপূত্র, ধরলা, তিস্তা নদীসহ প্রায় ১৬টি নদ-নদী কুড়িগ্রামের মানুষকে প্রতিনিয়ত সর্বশান্ত করেছে। নদী ভাঙ্গন কুড়িগ্রামের মানুষের সব কিছু কেড়ে নিচ্ছে। অভাবের পালকে প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে ভাঙ্গনের শিকার পরিবার গুলো। এসব নদী অববাহিকাসহ চলাঞ্চলে বসবাসকারী হাজার হাজার পরিবার এমনিতেই খাদ্য কষ্টে থাকেন। বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে নদী পাড়ের মানুষগুলো নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করেন। হত-দরিদ্র পরিবারগুলো বছরের বেশিরভাগ সময় সাহায্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার উপর বর্তমান সময়ের মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের কারনে কর্মহীন হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। ঘরবন্ধি মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। তাহলে ‘মঙ্গা’ শব্দটি কী এ অঞ্চলের মানুষকে আবারও হাতছানি দিচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অনেকটা সে দিকেই যাবে এমন আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য নানামুখি উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহন করায় মঙ্গা শব্দটি ভুলেই যেতে বসেছিল এ অঞ্চলের মানুষ। সরকারের নানামুখি উন্নয়ন কর্মসূচি আর নিজেদের চেষ্টায় মঙ্গাকে জয় করে অনেকটা স্বাভলম্ভি হতে পেরেছিল অনেকে। আজ করোনা পরিস্থিতির কারনে সবকিছু থমকে গেছে।এমনিতেই এ সময়টা এ অঞ্চলের মানুষের হাতে তেমন কাজ থাকে না। কাজের সন্ধানে কর্মহীন মানুষগুলোকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে কাজ করতে হয়। তাও বন্ধ হয়ে আছে মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারনে। ঘরবন্ধি কর্মহীন মানুষ গুলো এখন অনেকটা দূর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছেন। প্রশাসনের উদ্যোগে সম্প্রতি দেশের কয়েকটি জেলায় কৃষি শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে। অনেক শ্রমিক জীবিকার জন্য ঝুকি নিয়ে গেলেও সে সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।
এক সময় মঙ্গা বা আকাল শব্দটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে ছিল। মঙ্গা নামের অভিশাপের গ্যারাকল থেকে মুক্ত হতে দীর্ঘসময় ধরে তাদের লড়াই করতে হচ্ছে। কিন্তু প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের কারনে আবার তা ফিরে আসার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর এসময়ে এ অঞ্চলর মানুষ কাজের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়তো। হাজার হাজার নারী-পুরুষ পোষাক শিল্পে কাজ করে নিজেদের স্বাভলম্ভি করে তুলেছে। শুধু কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়ছে কুড়িগ্রামের মানুষ। পরিশ্রম আর চেষ্টা করে মানুষ মঙ্গা শব্দটা নিজেদের মন থেকে প্রায় মুছে ফেলতে পেরেছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারনে নি¤œ আয়ের কর্মহীন মানুষ গুলোর জীবনে আবারও ছন্দপতন আসে। কাজের জন্য ঘর থেকেও বের হতে পারছে না তারা। ধারদেনা করে কর্মহীন মানুষ গুলো পরিবার-পরিজন নিয়ে কোন রকমে দিন পার করতে পারলেও পরিস্থিতি ক্রমেই তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় দিন যতই এগুচ্ছে, ততই তাদের মধ্যে আশংকা দেখা দিচ্ছে। করোনা ভাইরাসের কারনে দীর্ঘ সময় যদি এ পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা বা আকালের সাথে আবারও লড়াই করে বাঁচতে হবে মানুষকে। তবে একটা দিক লক্ষ্যনীয় করোনা আমাদের ঘরে থাকার অভ্যাস তৈরি করছে। করোনা ভাইরাসের কারনে মানুষ শৃঙ্খলাবোধ শিখছেন। ধৈর্য্যরে সাথে অপেক্ষা করে মানুষ প্রতিকূল পরিবেশকে নিজেদের অনুকুলে আনার চেষ্টা করছেন। আমরা যদি এ বিষয়গুলো আগামী দিনে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ আগামীতে দ্রুত এগিয়ে যাবে। এখন শুধুই অপেক্ষা, কবে মরণঘাতি এ ভাইরাসের কবল থেকে রক্ষা পাবে মানুষ। আবার কবে স্বাভাবিক পরিবেশে মুক্ত ভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারবে মানুষ? সে অপেক্ষা যেন দীর্ঘ না হয়, সেটাই এখন পৃথিবীর সকল মানুষের একমাত্র চাওয়া।
উত্তরাঞ্চেলের কর্মহীন মানুষদের নিয়ে লিখতে গিয়ে ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিনের মহানুভবতার কথা এসে গেল। ভিক্ষা করে জমানো ১০ হাজার টাকা করোনা দূর্গত মানুষের জন্য দান করেছেন শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলার ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিন।
সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগের আট জেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের সূচনা বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাজিম উদ্দিনের প্রশংসা করে বলেন, ‘এই যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নাজিম উদ্দিন, তার কাছ থেকে আমাদের অনেক শেখা উচিত’। ফলে বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদপত্রসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশংসায় ভাসে পুরো দেশ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নাজিম উদ্দিনের মহানুভবতা প্রশংসা করে আরো বলেন, ‘জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু দান করে সারাবিশ্বে মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের মাঝে এখনও এই মানবতা বোধটা আছে। কিন্তু সেটা আমরা পাই যারা নিঃস্ব তাদের কাছে। অনেক সময় দেখি বিত্তশালীরা হাহুতাশ করেই বেড়ায়। তাদের মানবতাবোধ কম। ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিন একজন সাধারণ মানুষ। আগে টুকটাক কিছু করতো। এখন করতে পারে না। দূর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যায়। ভিক্ষা করে ১০ হাজার টাকা জমা করেছিল, থাকার ঘর ঠিক করবে বলে। তার গায়ে ভাল জামা নেই। খাবারও ঘরে ঠিকমতো নেই। সেই মানুষ তার জমানো টাকা তুলে দিয়েছেন, করোনা ভাইরাসে যারা ক্ষতিগ্রস্থ তাদের সাহায্যের জন্য’।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাজিম উদ্দিনের প্রশংসা করেছেন। আমরাও গর্বিত নাজিম উদ্দিনের জন্য। স্যালুট আপনাকে নাজিম উদ্দিন। আপনি পথ দেখালেন, মানবতার সেবায় শেষ সম্বল দিয়েও এগিয়ে আসা যায়। করোনা ভাইরাাসে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে তার আপনজনও এগিয়ে আসেন না। ঢাকার একটি ফার্মেসীতে ওষুধ কিনতে এসে একজন হঠাৎ লুঠিয়ে পড়ে মারা গেলেন, উপস্থিত একজন মানুষও এগিয়ে আসেনি। আজ মানবতা যেন কোথায় এসে থমকে দাড়িয়েছে। ভাবতেই অবাক লাগছে। স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও করোনা আতংকে আপনজনরাও এগিয়ে আসেন না। করোনা উপসর্গের সন্দেহে মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনেও অনিহা তাদের। কিন্তু পরবর্তি সময়ে করোনা পরীক্ষায় দেখা যায়, মৃত ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত ছিলেন না। কিন্তু মৃত্যুর পরে কেউ আপনার লাশ ছুঁতে পর্যন্ত আসল না। যাদের জন্য জীবনের নীতি, নৈতিকতা সব কিছু বিসর্জন দিয়ে অবৈধ ভাবে বিত্তবৈভব বানালেন, তারা কেউ আসল না। করোনা আমাদের বাস্তবতার নিরিখে একজন সৎ নীতিবান মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে। তর্জনী উচিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, যাদের জন্য সম্পদ তৈরি করেছেন, তারা আপনার অর্থ-সম্পদ ভোগ করলেও আপনার পাশে শুধু আপনি। করোনা আমাদের একটা আদর্শিক জীবনের ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে।
নাজিম উদ্দিনরা সব সময়ে পিছনের সারিতে থাকলেও, মানবতাবোধ সৃষ্টিতে সামনের সাড়িতেই থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।
করোনা ভাইরাসের কারনে কর্মহীন মানুষের কল্যানে নাজিম উদ্দিন ছাড়াও মিঠাপুকুর উপজেলার লতিবপুর ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের দলিত সম্প্রদায়ের মিলন রবিদাস জুতা সেলাই করে ঘর বানানোর জন্য জমা করা ২০ হাজার টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের হাতে তুলে দিয়েছেন।
এছাড়াও সারাদেশের নি¤œআয়ের রিক্সা চালক, অটো রিক্সা চালকসহ অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করছেন। করোনা ভাইরাসে কর্মহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। কিন্তু এসব খেটে খাওয়া মানুষের মানবতার উদ্রেক হলেও আমাদের হয় না কেন? এমন প্রশ্ন কয়েকদিন থেকে মনের মাঝে ঘুুরপাক খাচ্ছে। মনে হয় কেন যেন আমরা বদলে যাচ্ছি, মানবতা আমাদের কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করেন, মানুষের কল্যানে জন্য। কিন্তু মানুষের এ দূঃসময়ে রাজনীতিবিদদের এ অন্তঃধ্যান মানুষকে ভাবাচ্ছে। রাজনীতিবিদরা তাহলে কি নিজেদের জন্যই রাজনীতি করেন? চিরায়িত এ সত্যটা নতুন করে বললে, বিষয়টা তিতো লাগে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করেন, নিজের পুজি বড় করার জন্য। সে ভাবেই হোক না কেন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মানুষকে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে যেখানে প্রশাসনের গলদগর্ম অবস্থা, সেখানে পোষাক মালিকরা তাদের কারখানা খুলে দিলেন। চাকুরী রক্ষার ভয়ে ছাপোষা কর্মীরা চাকুরী বাঁচাতে ঢাকায় দৌড়াচ্ছেন। সে ভাবেই হোক না কেন? অনেকে অসহণীয় দূর্ভোগের শিকার হয়েও ঢাকা যাচ্ছেন। সেখানে নেই কোন সামাজিক দুরত্ব রক্ষার বালাই। আমরা আসলে করোনা মোকাবেলায় অদ্ভূদ ঘোড়ার পিটে সওয়ার হয়েছি। কোনটা রক্ষা করবো আমরা। জীবন না চাকুরী? এ পরিস্থিতিতে আমরা কোনটাই কী রক্ষা করতে পারবো? ###
জাহাঙ্গীর আলম সরদার,
সাংবাদিক ও সহকারী অধ্যাপক,
উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজ,
উলিপুর, কুড়িগ্রাম।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code