বিনোদন ডেস্কঃ ‘অনুস্বর’ নাটক দলের প্রযোজনা মঞ্চস্থ হওয়ার তারিখটি নজরে আসে ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে। ‘তিনকড়ি’ নামটি ছাপিয়ে চোখে পড়ে ‘দহন আর দাহতে বিপর্যস্ত হওয়ার গল্প’। চোখে পড়ে, কিন্তু মাথায় ঢোকে না। উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। ‘দহন’ আর ‘দাহ’ শব্দ দুটোর মানে জানি, কিন্তু তা কীভাবে ঘটবে নাটকে? এসব চিন্তা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে খুঁজে পাই ‘অনুস্বর’ নাটক দলের ফেসবুকের পাতা, সেখানে গল্পের ইঙ্গিত পড়ে যা বুঝতে পারি তা আমার কাছে সহজ ও স্বাভাবিক একটি গল্প-ছায়ার অনুমান চোখে ভেসে ওঠে, তবে সেই গল্পমুখ পড়ে চরিত্রগুলো দেখা যায় না।
মন খারাপ নিয়ে নাটকটি দেখতে গেলাম। বসতে বসতে আশেপাশে তাকানোর আগেই আমার চোখ টেনে নেয় মঞ্চ, মঞ্চের হালকা আলো। যেন কুসুমিত সূর্যের উদয় হচ্ছে, তখনো তার তেজ বাড়েনি। আধো-আলোয় একটা সুঠাম দেহ এমনভাবে ব্যায়াম করে চলেছে যেন সূর্য-দেবতার প্রণাম করে চলেছে। আলো-আঁধারের ঘোর কেটে যায় হই-হুল্লোরে!
ঘোষণা আসে ‘লড়াই, লড়াই লড়াই’। ঘোষণা লড়াইয়ের হলেও যে ভীতি নেই কারোর মাঝে। আর তখনই ‘তিনকড়ি’ নামের পরিচয় পাওয়া যায়। সুঠাম দেহ, চোখে যেন আগুন— লড়াইয়ের আগেই হাত-পায়ে বিজয়ীর উল্লাস যেন টগবগ করছে। দুই পক্ষের সমর্থকই উল্লসিত। বৃদ্ধ, শিশু, যুবক ও ভিন্ন গ্রামের মানুষ সকলে এক হয়ে লড়াই দেখে। লড়াই শেষ হয়, তিনকড়ির বিজয় ও বিজয় মিছিল শেষে সে হাত-মুখ ধোয়া ও গোসলে যায় তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে।
গোটা নাটক জুড়ে অবাক হওয়ার মতো শব্দটি একসময় আমার কানে আসে। মুখে পানি দেওয়া, সাঁতার কাটা কিংবা ডুব দিয়ে একপাড় থেকে আরেক পাড়ে গিয়ে ওঠা—এসবকিছু যে শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় এই আমার প্রথম দেখা ও শোনা।
কোনো এক বেশ্যার গল্প শোনায় তিনকড়ি। এই বেশ্যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে সে ঘর বাঁধার। কিন্তু তিনকড়ি এত যত্ন করে তার বর্ণনা দেয়, সহমর্মী আবেগতাড়িত হয়ে যখন তার যৌবনের যত্নের কথা বলে তখন সেই বেশ্যাকে সম্মান করতে ইচ্ছে করে।
তিনকড়ির নায়িকাকে দেখতে ইচ্ছা করে। পশ্চিম উইংস থেকে নায়িকা আসে। আলো নিয়ে, সুরেলা কণ্ঠে; গান বাজে, গানে গানে কথা হয় ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে দু’জন। তবে ঘর বাঁধার স্বপ্নে একটা ‘কিন্তু’ যেন ওদের মনে জাগে। তারপর সহজ সমাধানে যায় দুজনে। সমাজের চোখকে পরোয়া না করার পথ বেছে নেয়। একটা মানুষ আরেকটা মানুষের সাথে থেকে ভালো থাকার পথ তারা বেছে নেয়।
নাটক এভাবেই গতি পেতে থাকে। এই ঘটনা এভাবে চলতে থাকলেই ভালো হতো, সংঘর্ষ দেখতে হতো না।
বগুড়া অঞ্চলের ভাষায় এগুতে থাকা গল্পে সবার সুখের সাথে সবাই, দুঃখে সকলে দুখী। কিন্তু আজমীর শরীফ, কামরুকামাখ্যা ঘুরে আসা সাধু চরিত্রটি হঠাত্ ধর্মভীরু হয়ে ওঠে। যে সাধুর কণ্ঠে মেতে থাকত এ গ্রামের সকল মানুষ সেই সাধু কেবল তার ধর্মের প্রচারসংগীত ছাড়া আর কোনো গান গাইবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে। ভিন্ন ধর্মের লোকেদের সঙ্গ এড়িয়ে চলা ভালো ইত্যাদি বুঝিয়ে চলা মানুষদের জোট তৈরি করে। আরেকদল মানুষ যাদের সংখ্যা খুব কম তারা সাধুর এই পরিবর্তনগুলো মন থেকে মেনে নিতে পারে না। তাই অপর দলের মানুষ শক্তি ও জোটবদ্ধ হতে থাকে তিনকড়ির দলে।
তিনকড়ি নাটকে এসব অনুষঙ্গ আসে ৪৭’র দেশ ভাগকে কেন্দ্র করে। ধর্মের আধিপত্য যেন মানুষকে এসব কোন্দলের ঘটনার দিকে ধাবিত করে। আগুন দেয় একে অন্যের ঘরে, অস্তিত্বে। এসব ঘটনার প্রবাহে আমি যাকে পতিতা বলেছি, সমাজের সেই পতিতাকে বিয়ে করে ঘরে আনে নাটকের নায়ক তিনকড়ি। এই ঘটনায় যেন ক্ষিপ্ত হয় সমাজ, সমাজের মানুষ।
পুরো প্রযোজনায় কোথাও যেন ছেদ নেই! একটি ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনা যেনো আনন্দ, হিংসা, সমাজ বাস্তবতার মেলবন্ধন।
