মব সন্ত্রাস: সামাজিক দায়বদ্ধতার বড় চ্যালেঞ্জ

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ১০ মাস আগে

Manual3 Ad Code

সংগ্রাম দত্ত

দৈনিক খবরের কাগজ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ “মব সন্ত্রাস থামাবে কে “শীর্ষক এক বিশেষ প্রতিবেদনে ছেপেছে। প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক বাস্তবতায় সবচেয়ে ভয়াবহ যে প্রবণতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, তা হলো ‘মব সন্ত্রাস’। সরকারের নানা পদক্ষেপ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও একের পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে কবর থেকে লাশ তুলে আঘাত ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা কেবল বর্বরতাকেই নয়, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

মব সন্ত্রাসের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা-

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত এক বছরে (আগস্ট ২০২৪ থেকে আগস্ট ২০২৫) ২২০ জন মানুষ মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৯৬ জন।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ১২৪ জন।

শুধু গত আগস্টেই নিহত হয়েছেন ২১ জন।

এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, শিক্ষার্থী-গ্রামবাসীর সংঘাত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা, এমনকি আদালতের ভেতরে সাংবাদিক লাঞ্ছনার মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ-

Manual2 Ad Code

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, রাজনৈতিক সরকারের অনুপস্থিতি মব সন্ত্রাস বাড়ার একটি বড় কারণ। তিনি বলেন, “কেবল পুলিশ দিয়ে মব সন্ত্রাস দমন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক শক্তি ও জবাবদিহি ছাড়া এ প্রবণতা কমবে না।”

সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বর্তমানে এক ধরনের ‘হযবরল’ অবস্থা বিরাজ করছে। তার মতে, দৃঢ় মনোবল ও রাজনৈতিক ঐক্যের অভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল পদক্ষেপের কারণে মব সন্ত্রাস ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যেভাবেই হোক, মব সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় এ প্রবণতা শহর থেকে গ্রামে আরও ছড়িয়ে পড়বে।”

মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির তিনটি সাম্প্রতিক ঘটনার (রাজবাড়ী, রাজশাহী ও পল্টন) উদাহরণ টেনে বলেন, রাষ্ট্র চাইলে প্রতিরোধ করতে পারত। তিনি প্রশ্ন তোলেন— আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত থেকেও কেন প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলো? এটি দুর্বলতা নাকি প্রচ্ছন্ন সমর্থন— উভয় অবস্থাই ভয়ংকর।

রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান-

পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেছেন, পুলিশ মানবিক পুলিশিং করতে চাইছে, তাই বলপ্রয়োগ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। তবে বাধ্য হলে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করা হবে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্বীকার করেছেন, গত কয়েক দিনের ঘটনায় পরিস্থিতি ‘একটুখানি’ খারাপ হয়েছে, তবে তা আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

Manual8 Ad Code

বিশ্লেষণ ও করণীয়-

পরিসংখ্যান, বাস্তবতা ও বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে—

বিচারহীনতার সংস্কৃতি মব সন্ত্রাসের অন্যতম প্রধান উৎস।

রাজনৈতিক শূন্যতা ও অস্থিতিশীলতা এ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃঢ় অবস্থান অনুপস্থিত বা দুর্বল, যা মবকে আরও উগ্র করে তুলছে।

রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি।

 

মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—

Manual8 Ad Code

দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

রাজনৈতিক ঐক্য ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ও দৃঢ় পদক্ষেপ।

জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা।

উপসংহার-

মব সন্ত্রাস কেবল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর আঘাত নয়, এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আক্রমণ। সরকার যদি কেবল নিন্দা ও বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এই নীরবতা একদিন রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই অকার্যকর করে তুলতে পারে। এখনই কঠোর আইনগত ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে মব সন্ত্রাস প্রতিহত না করলে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ অরাজকতার মুখে পড়বে।

Manual7 Ad Code

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  • মব সন্ত্রাস: সামাজিক দায়বদ্ধতার বড় চ্যালেঞ্জ
  • Manual1 Ad Code
    Manual6 Ad Code