

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)
আমার সংগ্রহে থাকা বেশি পছন্দের বইগুলোর মধ্যে নিকোলা ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ বইটি অন্যতম। ছোট একটি বই হওয়ায় সব সময় হাতের কাছে রাখা যায় এবং সময়ে-অসময়ে হাতে নিয়ে দু-এক পাতা পড়া যায়। বইটি এতই ভালো লাগে, দু-একবার পড়া অংশটিও আবার পড়তে ইচ্ছা হয়। করোনাভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্র পরিচালকরা যখন দিশাহারা তখন সেদিন কী মনে করে যেন মনে হলো, দেখি তো এ রকম মহামারি মোকাবেলায় ম্যাকিয়াভেলির কোনো পরামর্শ আছে কি না। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে মহামারি মোকাবেলার বিষয়ে কিছু না পেলেও যেকোনো দুর্যোগ ও বিপদ মোকাবেলায় রাষ্ট্র পরিচালকদের সামর্থ্যগত বৈশিষ্ট্যের একটা বর্ণনা পাওয়া গেল বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ের ১১তম পৃষ্ঠায়, যেখানে তিনি প্রাজ্ঞ ও সুদূরপ্রসারী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতার বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। সংকট ঘাড়ের ওপর এসে পড়ার আগেই যাঁরা বুঝতে ও দেখতে পারেন এবং সেটি যথেষ্ট দূরে থাকতেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম হন, তাঁদেরই ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্রনায়ক বলেছেন। রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতারা শুধু চলতি সংকট নিয়ে ব্যস্ত থাকেন না, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বিপদ সম্পর্কে সতর্ক হন এবং তা মোকাবেলায় যথেষ্ট সময় থাকতেই প্রজ্ঞাজনিত ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম হন। আগেভাগে বিপদ সম্পর্কে আঁচ করতে পারলে তা মোকাবেলা করা যত সহজ হয়, একবার সেটি ভেতরে ঢুকে গেলে সমাধান কঠিন হয়ে যায়। তবে ম্যাকিয়াভেলি স্বীকার করেছেন, রোগব্যাধিসহ যেকোনো বিপদ ও তার ভয়াবহতা একেবারে শুরুতে চিহ্নিত করা কঠিন। তবে সেটি যিনি পারেন তিনিই ব্যতিক্রম এবং তাহলে সমস্যার সমাধান অনেক সহজ হয়ে যায়। এর বিপরীতে ব্যাধি বা বিপদ যখন ছড়িয়ে পড়ে তখন চিহ্নিত করা সহজ হলেও সমাধান কঠিন হয়ে যায়।
ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে চীনের উহান শহরে ভাইরাসের উৎপত্তির শুরুতে চীন যদি এর অভাবনীয় সংক্রামক ক্ষমতা সম্পর্কে খোলামেলাভাবে বিশ্বকে জানাত, তাহলে বিশ্ব সংস্থাগুলো ও নেতারা হয়তো অনেক আগেই সতর্ক হতে পারতেন। প্রায় দুই মাসের অধিক সময় হাতে পেয়েও সামষ্টিকভাবে বিশ্বের রাষ্ট্র পরিচালকরা, জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিকভাবে কোনো সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারেনি। জাতিসংঘের ব্যানারে অনেক আগেই সিদ্ধান্ত হতে পারত জরুরি রাষ্ট্রীয় কাজ ছাড়া সব ধরনের ভ্রমণ নিষিদ্ধ। এর সঙ্গে প্রতিটি দেশ সে দেশে অবস্থানরত বিদেশিদের স্বাস্থ্যসেবাসহ সব ধরনের দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা যদি দিত, তাহলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মানুষ নিজ নিজ দেশে ফেরার জন্য পাগল হতো না। সংক্রমণের ব্যাপকতা এত ভয়াবহ রূপ নিত না। ইভিল বা ধ্বংসকারী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার চেয়ে তার জন্ম ও বেড়ে উঠা ঠেকাতে পারাটাই রাষ্ট্রনায়কোচিত কাজ। বর্তমান সময়ে বিশ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থার দুই কর্ণধার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, দুই রাষ্ট্রই করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে মানবসমাজকে সতর্ক হওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারেনি। সবাই যখন বিষয়টি বুঝতে পেরেছে তখন করোনা কাউকে আর সময় দেয়নি।
রাষ্ট্রনায়কের এত বড় অভাব অতীতে বিশ্বের মানুষ কখনো দেখেনি। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা আমরা পেয়েছিলাম এবং তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের সংগ্রামে যথাসময়ে যথাপদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলেই মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম। যুগে যুগে বিশ্বে রাষ্ট্রনায়কের আবির্ভাব হয়েছিল বলেই মানবসভ্যতা আজ অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে এত দূর আসতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই সময়ে রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞার অভাবে বিশ্বে সামগ্রিকভাবে যা ঘটছে তাতে অনেক বিজ্ঞানী বলা শুরু করেছেন, সেদিন আর হয়তো দূরে নয়, যেদিন মানবজাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো সম্পদশালী দেশে করোনা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রীর অপ্রতুলতা কী করে হয়? যদিও সব দেশেই একই অবস্থা। এতে বোঝা যায়, সর্বতোভাবে সব দেশই করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছুই আঁচ করতে পারেনি। অথবা হতে পারে, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে চরম সিদ্ধান্তহীনতায় সব কিছু ভবিতব্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যবস্থার এমন সমন্বয়হীনতার বহিঃপ্রকাশ আগে কখনো দেখা যায়নি। আসলে স্বল্পসংখ্যক ধনিক শ্রেণির অর্থলিপ্সা ও অতিমুনাফার কাছে বিশ্বব্যবস্থা আজ অবরুদ্ধ। ফলে বিশ্বব্যাপী যেসব কর্মকাণ্ড চলছে তার বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় সার্বিকভাবে মানুষ যেসব ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে তা রোধকল্পে কতখানি কী করা হচ্ছে, সে প্রশ্নটিই আজ করোনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে আবার জ্বলন্ত হয়ে উঠেছে। বেশির ভাগ পর্যবেক্ষক ও গবেষক বলছেন, করোনাভাইরাসটি প্রথমে কোনো বন্য প্রাণীর দেহে জন্মেছে এবং সেখান থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে। বন্য প্রাণীর দেহে এটি নিরীহ থাকলেও হতে পারে মানুষের দেহ ভাইরাসটির জন্য অত্যন্ত উর্বর স্থান, বিধায় এত দ্রুত তার জন্ম ও বিস্তার ঘটছে।
টেলিগ্রাফ পত্রিকার সূত্রে বাংলাদেশের পত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছে, নামকরা চিকিৎসা সাময়িকী নেচার মেডিসিন গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে এবং তাতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসটি মানুষের তৈরি নয়, এটি বাদুড়, সাপ বা বনরুই-জাতীয় কোনো বন্য প্রাণীর দেহ থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে। এই ধারণা যদি সঠিক হয়, তাহলে নিশ্চয়ই আশা করা যায়, বন্য প্রাণীর দেহে এমন একটি মানবঘাতী ভাইরাস কেন এবং কিভাবে জন্ম নিল তা বিজ্ঞানীরা অদূর ভবিষ্যতে আবিষ্কার করবেন। তবে শিল্প বিপ্লবজনিত সভ্যতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিশ্বের শক্তিবলয়ের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চরম প্রতিযোগিতার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সার্বিক পরিবেশের ওপর কতখানি বিরূপ চাপ পড়ছে এবং তাতে মানুষসহ সব প্রাণীর দেহে কখন কী ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হচ্ছে তার হদিস বিজ্ঞানীরা কতটুকু রাখছেন বা রাখতে পারছেন, সেই প্রশ্ন করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে আবার মানুষের মনে প্রকটভাবে আসছে।
শিল্পসভ্যতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বৈশ্বিক ক্ষতিকে একটি সীমার মধ্যে রাখার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন হচ্ছে। জলবায়ুর মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতি না করে উন্নয়নের গতিমাত্রা বজায় রাখার বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি অনেক আগেই মানুষের হাতে এলেও অতি মুনাফা এবং স্বল্প সময়ে অধিক সম্পদ গড়ার লিপ্সা, মোহ ও প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে শিল্পপতি ওই ধনিক শ্রেণি সে পথে যাচ্ছে না। অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পদ দখলে রাখার জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলে দুনিয়াজুড়ে যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ ও প্রক্সি যুদ্ধে প্রতিদিন, মাস ও বছরে হাজার হাজার টন বোমা আকাশে ও ভূমিতে নিক্ষেপিত হচ্ছে। সাগরের নীল পানির নিচে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণে সাগরতলের ভূ-প্রকৃতির সর্বনাশ হচ্ছে। ফলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আকাশ, পাতাল, বাতাস, পানি, সাগর, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল সব কিছু আজকে বিষে বিষে বিষময়। পানি ও বাতাস যদি বিষাক্ত হয়, তাহলে কোনো প্রাণিকুলের কি বিষপান থেকে মুক্ত থাকার উপায় আছে? সব জানা সত্ত্বেও অস্ত্র প্রতিযোগিতা থামছে না। কারণ অস্ত্রের ব্যবসায় সম্পদ বাড়ে জ্যামিতিক হারে। তাহলে মানবতা কোথায়?
প্রকৃতির ওপর আঘাতের পর আঘাতে একসময় প্রকৃতির প্রত্যাঘাত অসম্ভব কিছু নয়। তাই করোনা যদি প্রকৃতির প্রতিশোধ, অর্থাৎ রিভেঞ্জ অব নেচার হয়, তাহলে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। সব কিছু জানার পরও আজ বিশ্বব্যবস্থা করোনার আক্রমণ থেকে বিপন্ন মানুষকে রক্ষা করার জন্য সময়মতো উদ্যোগ নিতে পারেনি। করোনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, কোনো রাষ্ট্রই, সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে একক প্রচেষ্টায় টিকে থাকতে পারবে না। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বসম্প্রদায়ের সামনে আজ সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জ উপস্থিত। ঐক্যবদ্ধ, একাত্ম ও সমন্বিত বিশ্ব উদ্যোগ ব্যতিরেকে তা মোকাবেলা করা যাবে না। অর্থনৈতিক মহামন্দার শঙ্কা প্রকাশিত হচ্ছে সব জায়গা থেকে। মনুষ্যজনিত কর্মকাণ্ডের বিপরীতে প্রকৃতির বিরূপ প্রতিক্রিয়া রোধে যেমন, ঠিক তেমনি করোনা মোকাবেলায়ও বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রকট দুর্বলতা সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুতরাং আগামী দিনে করোনা অথবা এর চেয়েও মহাদুর্যোগ ঠেকানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে সার্বিক বিশ্বব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।