মাদকের ভয়াল থাবা: শাস্তি ও প্রতিকারের উপায় মুফতী মুহাম্মদ নোমান কাসেমী

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৪ years ago

Manual3 Ad Code

ভূমিকা : প্রতিটি দেশের তরুণ ও যুবসমাজ সে দেশের সম্পদ। যুবসমাজ বিপথগামী হলে দেশ ও জাতির অধপতন নেমে আসে। যুবক বয়সের যেমন ভাল দিক আছে, তেমনি মন্দ দিকও আছে। তরুণ ও যুবসমাজকে ভাল কাজে নিয়োজিত করতে পারলে অনেক সুফল আশা করা যায়। তরুণ ও যুবসমাজ দেশ ও দেশের কল্যাণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু অত্যন্ত দু:খজনক বিষয় হলো, বর্তমানে তরুণ ও যুবসমাজ অনেকটাই বিপথগামী।
সাংসারিক টানাপোড়েন, বেকারত্ব, কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পেঁৗছতে না-পারার দুঃসহ যন্ত্রনা থেকেই আসে হতাশা। হতাশা থেকেই যুবসমাজের এ বিপথগামীতা। তাই মাদকাসক্তরা ভাবে, সাংসারিক সকল ঝামেলা থেকে নিস্কৃতি পেতে হলে মাদকসেবনই বুঝি উত্তম পন্থা। এই ভুল ধারণাই তাদের জীবনে এক সময় কাল হয়ে দেখা দেয়। জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতকে জয় করার মানসিকতা হারিয়ে তারা উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে যায়। আখের সমাজের কাছে, পরিবার-পরিজনের কাছে তারা হয়ে উঠে বোঝা। এক পর্যায়ে তারা নিজের জীবনকে মূল্যহীন ভাবতে শুরু করে।
মাদকের নেশা আত্মঘাতী, যা সমাজ, দেশ, মনুষ্যত্ব সর্বোপরি বিশ্বব্যাপী ডেকে আনছে বিপর্যয়। ব্যক্তিজীবনে যেমন মাদক স্বাস্থ্য, সম্পদ, মান-সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি নষ্ট করে ব্যক্তিকে করে তোলে সমাজের ঘৃণা ও নিন্দার পাত্র, তেমনি তাদের মাঝে দেখা দেয় অস্বাস্থ্য, অলসতা, অকর্মন্যতা এবং সামাজিক অপরাধের সীমাহীন নিষ্ঠুরতা। ধ্বসে যায় তার রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, চাকরি, সামাজিক মূল্যবোধের মতো বহু অমূল্য গুণগুলো। এ নেশার কারণেই বিশ্ব থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সর্বজনীন মূল্যবোধ, প্রেম-প্রীতি, স্নেহ-মমতা, শ্রদ্ধা-ভক্তি সৌহার্দ ও ভ্রাতিৃত্ববোধ। তাই মাদক কেবল ব্যক্তিজীবন নয়, সমাজ ও সমষ্টিজীবনেও ডেকে আনছে বিপর্যয়।
বর্তমান বাংলাদেশে মাদকের নেশায় তলিয়ে যাচ্ছে ছাত্র—যুবক তথা তরুণ প্রজন্ম। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম। মাদকের ভয়াল থাবায় ধ্বংসের মুখে যুবসমাজ। বর্তমানে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের দিকে মাদক সেবিদের আকর্ষণ বেশি। উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত শ্রেণীর হাজারো মানুষ আশক্ত হয়ে পড়ছে মাদকে। কিছু মাদক ব্যবসায় নারীদেরকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের নিস্ক্রিয়তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদাসিনতা, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, মাদকের সহজলভ্যতা, মাঝে মাধ্যে র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানে মাদকদ্রব্য সেবন কিংবা বিক্রির দায়ে গ্রেফতারকৃতরা সহজে জামিনে বেরিয়ে আসাসহ বিভিন্ন কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সচেতন মহলের ধারণা।
বিশিষ্টজনদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে মাদক ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এসব মাদক বিক্রির তালিকায় প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানেরা জড়িত রয়েছে। প্রভাবশালীদের কারণে প্রশাসনও নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের টাকায় কেনা হয় মাদক। আর ডেলিভারি ম্যানের সাহায্যে মাদক পৌছে দেয়া হয় বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে, খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ভ্রাম্যমান বিক্রেতারা মাদকদ্রব্য বিভিন্ন স্পটে বিক্রি করে ।
পুলিশকে ম্যানেজ করে মাদক ব্যবসা চলে এমন অভিযোগও রয়েছে। জেলা—উপজেলা থেকে গ্রাম পর্যন্ত মাদকের ছড়াছড়ি হলেও মাদক ব্যবসায়ীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে মাদকসেবীর সংখ্যা। এসব মাদকের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে স্কুল, কলেজের তরুণ ছাত্ররা। যার ফলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সর্বস্তরের অভিভাবকরা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, বিসিক এলাকা, ফুটপাত, বস্তি, হাট-বাজার, পার্কের আশপাশ ও আবাসিক হোটেলসহ বহু স্পটে অবাধে বিক্রি হচ্ছে মাদক দ্রব্য।
মাদক ব্যবসায়ীরা স্কুল-কলেজের ড্রেস পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সাধু সেজে একাজ করছে, যাতে সহজে তাদেরকে চেনা না যায়। সহজে বহন যোগ্য হওয়ায় মটর সাইকেল, সিএনজিসহ বিভিন্ন বাহনের মাধ্যমে ভ্রাম্যমান মাদক বিক্রেতারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। দলীয় পরিচয়ে উঠতি বয়ষের তরুণ ও যুবকরা শহরে অনেক রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা ও মহল্লায় মাদক সেবন করে। জনশ্রম্নতি রয়েছে, জনপ্রতিনিধি-রাজনৈতিক ও পেশাজীবি সংঘঠনের অনেকেই মাদকের সাথে সম্পৃক্ত। এলাকায় তরুণ ও যুবক মাদক সেবীদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধির ফলে অভিভাবক মহল উদ্বিগ্ন ও উৎকন্ঠায় রয়েছেন। অভিভাবক মহল মাদকদ্রব্যের মরন ছোবল থেকে আদরের সন্তানদের বাঁচাতে চান।

ইসলামে মদ্যপান হারাম
মানুষের জন্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে সর্বোত্তম অনুগ্রহ হলো ঐশীগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীম। যা দ্বারা তিনি মানুষকে শয়তানের পাতা বহু লোভনীয় ফাঁদ সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন। তাই কুরআনে বর্ণিত জীবন যাপন পদ্ধতিকে ‘দ্বীনুল ফিৎরাহ’ বা মানুষের স্বভাবজাত জীবনব্যবস্থা বলা হয়। এর সকল বিধি-নিষেধের আসল উদ্দেশ্য মানব জাতিকে সকল অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা। মদ মানুষকে তার প্রকৃতগত স্বভাবের ওপর দাঁড়াতে দেয় না। একথা স্বতন্ত্র কোনো ব্যক্তির বেলায় যেমন সত্য তেমনি বৃহত্তর কোনো সমাজের বেলায়ও। মদ মানুষের মনুষ্যত্ব বিলুপ্ত করে পশুর কাতারে নিয়ে আসে, অথচ মানুষ হলো সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠতম। সর্বোপরি ইসলামে মদ বা নেশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ “হারাম”।
ইসলামে ঘোষিত হারাম দ্রব্যগুলোর ওপর যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, দীর্ঘ গবেষণা আর আলোচনা পর্যালোচনার পর তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এর মধ্যে সত্যিই ধ্বংসাত্মক পরিণতি রয়েছে। সাময়িক বা ছোটখাটো কোনো কল্যাণ থাকলেও তা সময়ের ব্যবধানে ক্ষতিরই কারণ হয়ে দেখা দেয়। যে দ্রব্য জ্ঞান-বুদ্ধি হ্রাস করে দেয়, নেশা সৃষ্টি করে, ধ্বংস করে মানবীয় গুণাবলি এবং ধ্বংস করে সমাজ ও সভ্যতাকে, তা-ই মাদক। তাইতো ইসলামে তা পুরোপুরি হারাম ঘোষণা করেছে। দেড় হাজার বছর আগেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত দরদি ও কঠোর কণ্ঠে আহ্বান করেছেন, মাদককে রুখে দাঁড়াও। সুস্থ সুন্দর সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলো।
শুরুতে ইসলামের মাদকবিরোধিতা পাশ্চাত্য দেশগুলোতে উপহাসের ব্যাপার ছিল। তারা নেশায় বুঁদ হয়ে তুলে ধরেছিল নিজেদের বেহায়াপনা, নোংড়ামি ও নানা ধরনের সভ্যতাবিবর্জিত অমানসিক আচরণ। তারা ইসলামের শ্বাস্যত কল্যাণকর বাণীগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। অথচ এখন সর্বস্তরে মাদকবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে। মাদকবিরোধী জনমত গঠনে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই নানা ফোরাম গড়ে উঠেছে। এসবের মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে, ইসলামই চিরসত্য সুমহান আদশের্র নাম। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম ইসলামই মাদক রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আহ্বান করেছিল। প্রথমে মাদকবিরোধী আদর্শিক এবং চিন্তার আন্দোলন শুরু করে, পরে সামাজিক ও রাজনৈতিক এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ইসলাম মাদকের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্যনির্ধারক স্বরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব এগুলো বর্জন করো, তাহলে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারবে। শয়তান চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হোক এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। তবু কি তোমরা নিবৃত হবে না?’ (সুরা মায়েদা, আয়াত ৯০ ও ৯১)।
উপরোক্ত আয়াতে প্রধান চারটি হারাম বস্তু হতে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাহলো, মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্যনির্ধারক স্বর ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, সূরা মায়েদাহ কুরআনের শেষ দিকে নাযিল হওয়া সূরাসমূহের অন্যতম। অতএব এখানে যে বস্তুগুলো হারাম ঘোষিত হয়েছে, সেগুলো আর মনসূখ হয়নি। ফলে তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত চিরন্তন হারাম হিসাবেই বাকি থাকবে। অসংখ্য নিষিদ্ধ বস্তুর মধ্যে এখানে প্রধান চারটির উল্লেখ করার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ চারটি হারাম বস্তু আরও বহু হারামের উৎস। অতএব এগুলি বন্ধ হলে অন্যগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে।

Manual5 Ad Code

মাদক নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যপারে নবীজীর বাণী:
১. হযরত জাবের রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক নেশাকর বস্তু হারাম’। (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৩৯)
২। হযরত আবুদ্দারদা রাযি. বলেন, আমার বন্ধু (মুহাম্মাদ) আমাকে অছিয়ত করেছেন যে, তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাকে কেটে টুকরা করা হয়, বা আগুনে পুড়িয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ত্যাগ করবে না। কেননা যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয়, তার উপর থেকে আল্লাহর যিম্মাদারী উঠে যায়। আর তুমি মদ্যপান করবে না। কেননা মদ হলো ‘সকল অনিষ্টের মূল’। (ইবনে মাজাহ, মিশকাত হা/৫৮০)
৩। হযরত আনাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদকের সাথে সম্পৃক্ত এমন ১০ ধরনের ব্যক্তির উপর অভিশাপ করেছেন। যথা- ১. যে ব্যক্তি মদ জাতীয় বস্তুর নির্যাস বের করে। ২. যে ব্যক্তি মদ প্রস্তুত করে। ৩. যে ব্যক্তি মদ পান করে। ৪. যে ব্যক্তি মদ পান করায়। ৫. যে ব্যক্তি মদ আমদানি করে। ৬. যার জন্য মদ আমদানি করা হয়। ৭. মদ বিক্রেতা। ৮. মদ ক্রেতা। ৯. অন্যকে সরবরাহকারী এবং ১০. মদের লাভের অংশ ভোগকারী।’ (ইবনে মাজাহ, খ: ২, পৃষ্ঠা ১১২২, হাদিস নম্বর ৩৩৮১)

Manual3 Ad Code

‘উম্মুল ফাওয়াহেশ’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদকে ‘উম্মুল ফাওয়াহেশ’ বা ‘সকল নির্লজ্জতার উৎস’ বলেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—কে বলতে শুনেছি যে, মদ হলো সকল নির্লজ্জতার উৎস। যে ব্যক্তি মদ পান করে, সে যেন তার মা, খালা, ফুফু সকলের উপর পতিত হয়’। (নাসাঈ হা/৫৬৬৬-৬৭; বায়হাক্বী ৮/২৮৭-২৮৮)
হযরত ওসমান গণী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘তোমরা মদ থেকে বেঁচে থাক, কেননা এটি হলো সকল নিকৃষ্ট কর্মের উৎস’। মনে রেখ তোমাদের পূর্বেকার একজন সাধু ব্যক্তি সর্বদা ইবাদতে রত থাকতো এবং লোকালয় থেকে দূরে থাকতো। একদা এক বেশ্যা মেয়ে তাকে প্রলুব্ধ করল। তার কাছে নিজের দাসীকে পাঠিয়ে দিল। সে গিয়ে বললো যে, আমরা আপনাকে আহবান করছি একটি ব্যাপারে সাক্ষী থাকার জন্য। তখন সাধু লোকটি দাসীর সাথে গেল। যখনই সে কোনো দরজা অতিক্রম করতো, তখনই তা পিছন থেকে তালাবদ্ধ করে দেয়া হতো। এভাবে অবশেষে একজন সুন্দরী মহিলার কাছে তাকে পৌঁছানো হলো। যার কাছে একটি বালক ও এক পাত্র মদ ছিল। ঐ মহিলা তাকে বললো, আমি আপনাকে সাক্ষ্য করার জন্য ডাকিনি। ডেকেছি আমার সাথে অপকর্ম করার জন্য।
এখন আপনি আমার সাথে অপকর্ম করবেন, অথবা এই বালকটিকে হত্যা করবেন, অথবা এই এক পেয়ালা মদ পান করবেন। এ তিনটার কোনো একটা গ্রহণ করা ছাড়া আপনাকে মুক্তি দেয়া হবে না। সাধু লোকটি ভাবলো, যেনা বা হত্যা থেকে মদ পান করা তুলনামূলক হালকা গুনাহ, তাই সে মদ পান করলো। এবার সে মাতাল হয়ে গেল, বললো, আরো দাও। শেষ পর্যন্ত সে উক্ত নারীর সাথে অপকর্ম করলো এবং বালকটিকেও হত্যা করলো। অতএব তোমরা মদ থেকে বেঁচে থাক। ‘কেননা মদ ও ঈমান কখনো একত্রে থাকতে পারে না। বরং একটি আরেকটিকে বের করে দেয়’। (দারাকুৎনী হা/৪৫৬৫)
উপরের আলোচনায় একথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, একজন ব্যক্তি ও সমাজকে ধ্বংস করার জন্য কেবলমাত্র মদই যথেষ্ট। অতএব ব্যক্তি জীবনে কঠোরভাবে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা অতীব জরুরী। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

মদপানের ইহকালিন বিচার :
হযরত জাবের রাযি. হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি মদ পান করে, তাকে বেত্রাঘাত কর। যদি চতুর্থবার পান করে, তবে তাকে হত্যা কর। তিনি বলেন, পরে অনুরূপ একজন ব্যক্তিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আনা হলে তিনি তাকে প্রহার করেন’। (তিরমিযী হা/১৪৪৪, নাসাঈ, মিশকাত হা/৩৬১৭)
হযরত সায়েব বিন ইয়াযীদ রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে, হযরত আবুবকর ও হযরত উমর রাযি.-এর যুগের প্রথম দিকে কোন মদ্যপায়ী আসামী এলে তাকে আমরা হাত দিয়ে, চাদর, জুতা ইত্যাদি দিয়ে পিটাতাম। অতঃপর হযরত উমরের যুগের শেষ দিকে তিনি ৪০ বেত্রাঘাত করেন। কিন্তু যখন মদ্য পান বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন তিনি ৮০ বেত্রাঘাত করেন। (বুখারী, মিশকাত হা/৩৬১৬)
আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, একবার এক মদ্যপায়ীকে আনা হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মারার জন্য আমাদের হুকুম দিলেন। আমাদের মধ্যে কেউ তাকে হাত দিয়ে, কেউ জুতা দিয়ে মারল। এরপর তিনি বললেন, ওকে তোমরা তিরষ্কার কর। তখন লোকেরা তাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, ‘তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না’? ‘তুমি কি আল্লাহর শাস্তিকে ভয় পাও না’? ‘আল্লাহর রাসূল থেকে কি তুমি লজ্জাবোধ কর না’? ইত্যাদি। অতঃপর যখন লোকটি ফিরে যাচ্ছিলো, তখন একজন লোক বলে ফেলল, ‘আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করুন’! একথা শুনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা এরূপ বলো না, তোমরা তার উপরে শয়তানকে সাহায্য করো না’। বরং তোমরা বল, ‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা কর’! ‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে রহম কর’। (বুখারী, মিশকাত হা/৩৬২৬, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৬২১;)
অনুরূপ বারবার মদপানের শাস্তিপ্রাপ্ত এক ব্যক্তিকে জনৈক ব্যক্তি অভিসম্পাৎ করলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, তোমরা ওকে অভিসম্পাৎ করো না। আল্লাহর কসম! আমি জানি সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে’। (বুখারী, মিশকাত হা/৩৬২৫)
এতে বুঝা যায় যে, ইসলামী দন্ডবিধির লক্ষ্য হলো ব্যক্তির নৈতিক সংশোধন। শাস্তিপ্রাপ্ত হলে এবং তাওবা করলে ঐ ব্যক্তি নির্দোষ গণ্য হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহিত ব্যভিচারীকে ‘রজম’ করার পর নিজে তার জানাযা পড়েছেন। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৫৬০—৬১)

মদপানের পরকালীন শাস্তি :
১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক নেশাকর বস্তুই মদ এবং প্রত্যেক মদই হারাম। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে নিয়মিত মদ পান করে, অতপর তা হতে তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করবে, আখেরাতে সে ব্যক্তি তা পান করবে না’। (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৩৮) অর্থাৎ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করল অথচ তওবা করল না। আখেরাতে সে তা থেকে বঞ্চিত হবে। (বুখারী হা/৫৫৭৫, মুসলিম হা/২০০৩)
৩. হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা এ ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ যে, যে ব্যক্তি নেশাকর বস্তু পান করে তাকে ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ পান করাবেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ কি জিনিষ? তিনি বললেন, জাহান্নামীদের দেহের ঘাম অথবা দেহনিঃসৃত রক্ত-পূঁজ’। নাউযুবিল্লাহ। (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৩৯)
মদখোর হতভাগারা দুনিয়ার পচা মদ খেয়ে আখেরাতের বিশুদ্ধতম শারাব থেকে বঞ্চিত হবে। দুনিয়ায় এইসব পচা-গান্ধা মদপানে অভ্যস্তদের জন্য জাহান্নামেও অনুরূপ দেহনিঃসৃত পচা রক্ত-পুঁজ পানীয় হিসাবে খেতে দেয়া হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন তারা সেখানে কোনোরূপ শীতলতা কিংবা কোন পানীয় পাবে না’। ‘ফুটন্ত পানি ও দেহ নিঃগৃত রক্ত ও পূঁজ ব্যতীত’ (সূরা নাবা-২৪-২৫; সূরা হা-কক্বাহ-৩৬; মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৩৯)।
খাদ্য হিসাবে তারা পাবে তীব্র যন্ত্রণাদায়ক ও বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত যাক্কূম ফল। (সূরা ওয়াকি‘আহ ৫৬/৫২) ও বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত শুকনা যরী ‘ঘাস’। ‘যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না, ক্ষুধাও মেটাবে না’ (সূরা গাশিয়াহ ৮৮/৬-৭)।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি মদ পান করে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল করা হয় না। আর সে যদি তাওবা করে, আল্লাহ তা‘আলা তার তাওবা কবুল করবেন। তারপর যদি সে পুনরায় মদ পান করে, আল্লাহ আবারো চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল করেন না। তারপর যদি সে তাওবা করে, আল্লাহ তা‘আলা তার তাওবা কবুল করেন। তারপর যদি সে পুনরায় মদ পান করে, আল্লাহ আবারো চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল করেন না। যদি সে তাওবা করে, আল্লাহ তা‘আলা তার তাওবা কবুল করেন। তারপর যদি সে চতুর্থবার পুনরায় মদ পান করে, আল্লাহ আবারো চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল করেন না। তারপর যদি তাওবা করে তার তাওবা কবুল করা হবে না। এছাড়া পরকালে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ‘নাহরে খাবাল’ অর্থাৎ জাহান্নামীদের দেহনি:সৃত রক্ত ও পূঁজের দুর্গন্ধময় নদী হতে পান করাবেন’। (তিরমিযি, হাদিস: ১৮৬২, মিশকাত হা/৩৬৪৩—৪৪)
অন্য হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “মদের নেশায় অভ্যস্ত ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না”। (ইব্নে মাযাহ, হাদিস: ৩৩৭৬)
অতএব হে মাদকাসক্তরা! যেকোন মুহূর্তে পরকালের ডাক এসে যাবে। কবরের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অপেক্ষা করছে। অতএব দুনিয়ার এই সাময়িক ফূর্তি ছেড়ে দিয়ে খালেছ তওবা করুন, ফিরে যান আপনার পালনকর্তার দিকে। তিনি তওবা কবুল করবেন। তিনিই একমাত্র তাওবা কবূলকারী। তওবার বিনিময়ে আপনি পেতে পারেন জান্নাতের বিশুদ্ধতম শারাব। আল্লাহ সকলকে তাওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসার তাওফীক দান করুন! আমীন!!

Manual2 Ad Code

মাদকের প্রচার-প্রসার কেয়ামতের আলামত :
হযরত আনাস রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘ক্বিয়ামতের আলামত সমূহের মধ্যে অন্যতম হলো, ইল্ম উঠে যাবে, মূর্খতা বেড়ে যাবে, যেনা বৃদ্ধি পাবে, মদ্যপান বিস্তার লাভ করবে’। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৪৩৭)
হযরত আবু মালেক আশ‘আরী রাযি. বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—কে বলতে শুনেছেন, ‘আমার উম্মতের কিছু লোক মদকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করে তা পান করতে থাকবে’। (আবূ দাঊদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত হা/৪২৯২)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযি. হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘আমার উম্মত আখেরী যামানায় মদ্যপান করবে। তারা একে বিভিন্নভাবে নামকরণ করবে। (ত্বাবারাণী কাবীর; হা/৯০) অর্থাৎ তারা মদের বিভিন্ন নতুন নাম রাখবে আর তা অনায়াসে পান করতে থাকবে।
এসব হাদীসের বাস্তবতা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। বর্তমানে চারোদিকে মদের ছড়াছড়ি। প্রতিদিন নতুন নতুন নামে কত পদের মদ যে বাজারজাত হচ্ছে তার হিসাব করাও কঠিন। মাদকের এ প্রচার-প্রসার কেয়ামতকে অতি নিকটে নিয়ে আসছে। তাই মাদক থেকে নিজে বেচে থাকা ও সমাজকে বাঁচানোর পথ বের করা দরকার। তা না হলে আগামী বংশধররা অত্যন্ত নির্মমভাবে ধ্বংস হবে ।

Manual7 Ad Code

মাদক প্রতিরোধের উপায় :
মাদক প্রতিরোধের উপায় মূলতঃ দু’টি : নৈতিক ও প্রশাসনিক। প্রত্যেকটিই দু’ভাগে বিভক্ত। নৈতিক প্রতিরোধ দু’ভাবে হতে পারে-
এক. মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা : পিতা-মাতা, গুরুজন, শিক্ষক ও বড়দের উপদেশের মাধ্যমে এটা করা সম্ভব। তরুন ও যুবসমাজকে কাছে ডেকে, পাশে বসিয়ে সাদরে স্বস্নেহে মদের ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরা, ভবিষ্যতের কোন সফলতার কথা বলে তাদের মনে স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা। তার একজনের কারণে বহুজনের নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় প্রদর্শন করা বা এজাতীয় বিভিন্ন সুন্দর পরামর্শ দিয়ে তাদের অন্তরে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা।
দুই. ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করা : মাাদক প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা। আল্লাহভীতিই মানুষকে এ শয়তানী খপপর থেকে মুক্ত করতে পারে। আখেরাতে জবাবদিহিতা এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তির ভয় মানুষকে মাদক বা সকল অনাচারের আগ্রাসন থেকে দ্রুত মুক্তি দিতে পারে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code