

ফিচার ডেস্ক: শিক্ষা, পরিবেশ, সমাজের বর্তমান অবস্থান, আমাদের অবস্থা, শিক্ষার
গুরুত্ব, দেশের উন্নয়নে মানবসম্পদের গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়েও লিখেছি। ফল কতটুকু
পেয়েছি, তা নিয়ে আমি সন্দিহান। কারণ, এদেশের মানুষ শিক্ষামুখী নয়, বরং
রাজনীতিমুখী। যুবসমাজের বৃহদংশ শিক্ষাবিমুখ এবং সময় কাটানোর জন্য ফেসবুকমুখী।
মানুষ রাজনীতির পরিবর্তন ও ঘটনা নিয়ে যতটা না অবহিত, শঙ্কিত ও বিজড়িত থাকে,
বলা যায় তার একশ ভাগের দশ ভাগও শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়।
অবশ্য রাজনীতির পরিবেশের ওপর শিক্ষামানের উন্নতি-অবনতি বহুলাংশে নির্ভরশীল,
একথা সত্য। তাই কেউ যদি কাউকে প্রশ্ন করে, ‘আপনাদের দেশে শিক্ষার দশা কেমন?’
এক কথায় এর উত্তর আসবে, ‘রাজনীতির দশা যেমন, তেমন।’ দেশে শিক্ষামানের যদি
অধঃপতন ও মানহীনতা হয়ে থাকে, তার জন্য এদেশের রাজনৈতিক পরিবেশের
অধঃপতনকেই সরাসরি দায়ী করা যায়। একমাত্র অভিভাবকরাই এজন্য উদ্বিগ্ন ও
দিশেহারা। ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।’ পরিবেশের
কারণে যাদের ছেলেমেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে এবং এখনো নষ্ট হতে চলেছে-তাদের অনুশোচনা
ও ছটফটানি অন্য কেউ বুঝতে সমর্থ হবে না বা বুঝতে চাইবেও না। আমরা অর্থাৎ
মাস্টার সাহেবদের অনেকেই তা স্বচক্ষে দেখছি বলেই বলছি। বলছি, শিক্ষার উন্নয়ন
মানেই সমাজ, দেশ ও জাতির উন্নয়ন। একথা অস্বীকার করার জো নেই।
যা হোক, এর আগে শিক্ষার ভিত্তিমূল নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে ‘শিক্ষায় সাত-আর’
(Seven Rs in Education)-এর কথা বলেছিলাম। সেগুলো হলো : পড়া (Reading); লেখা
(WRiting); অঙ্ক (ARithmetic); ধর্ম (Religion); গবেষণা/পর্যবেক্ষণ (Research); জাগ্রত
বিবেক ও মূল্যবোধ (Roused-conscience and Values) এবং ন্যায়নিষ্ঠা (Righteousness)।
এছাড়া শিক্ষার উপকরণ নিয়ে কয়েকটা বিষয় আলোচনা করেছিলাম, যেগুলো হলো-
শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, পরিবেশ, শিক্ষা-উপকরণ ও শিক্ষাপদ্ধতি এবং
পাঠক্রম। এ বিষয়গুলো ব্যাপক বিশ্লেষণধর্মী আলোচনার দাবি রাখে। আজ শিক্ষার
অভিমুখিতা নিয়ে অল্প পরিসরে কিছু বলব।
আমার বিশ্লেষণে প্রত্যেক মানুষের জন্য শিক্ষার অভিমুখিতা হবে তিনটি : এক.
জীবনমুখী শিক্ষা; ২. মনুষ্যত্ব-সঞ্চারক শিক্ষা; এবং ৩. কর্মমুখী শিক্ষা। এ কলামেই
বিষয়গুলো অন্য প্রাসঙ্গিক আলোচনায় অনেকবারই তুলে ধরেছি, যদিও ব্যাখ্যা প্রদান
সম্ভব হয়নি। সব শিক্ষাই মূলত জীবনমুখী শিক্ষা বা জীবনের জন্য শিক্ষা। তবুও
প্রত্যেক মানুষের সাবলীল জীবন নির্বাহ বা অতিবাহিত করার জন্য সাধারণভাবে
বাস্তবকেন্দ্রিক কিছু শিক্ষা প্রতিনিয়ত কাজে লাগে, তা সে যে পেশাতেই থাকুক না
কেন। এখানে জীবনমুখী শিক্ষা বলতে সেগুলোকেই বোঝাতে চাচ্ছি। এগুলোকে ‘লাইফ
স্কিলস’ও বলতে পারি। জীবনের প্রারম্ভেই স্কুল ও বাড়িতে এগুলো ব্যাবহারিকভাবে
শেখা ও চর্চা করা প্রয়োজন। যেমন-যেখানে-সেখানে থুতু না ফেলা, টয়লেটের ব্যবহার
শেখা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা (আদবকেতা) শেখা, ভালো কাজের জন্য ধন্যবাদ
জ্ঞাপন, সাধারণ রান্না, সামাজিক আচার-ব্যবহার, রাস্তা পার হতে শেখা, যানবাহনে
আরোহণ, শরীরচর্চা, সাঁতার শেখা, বাংলা শুদ্ধ উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি, ট্রাফিক রুলস,
দুর্যোগকালীন করণীয়, ভালো সুনাগরিক হতে শেখা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, পরিষ্কার-
পরিচ্ছন্নতা (ঘরবাড়ি ও প্রাঙ্গণ), বিভিন্ন রকম গিরা (Knot) শেখা, মিথ্যা কথা না বলা,
বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করতে শেখা, নেশার ক্ষতিকর দিক ও পরিণতি, সেলাই
করা-বোতাম-হুক লাগানো শেখা, কাপড় ধোয়া, ই-মেইল ম্যানার্স, টেলিফোন ম্যানার্স,
টেবিল ম্যানার্স, সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখা, নিজের ও পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ
শেখা, বিজ্ঞান ও ব্যবসা শেখার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করা, সময়জ্ঞান ও দায়িত্বজ্ঞান
শেখা, হাতের কাজ (পুরোনো জিনিস থেকে নতুন জিনিস তৈরি, সর্বজনীন পরমতসহিষ্ণুতা
ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা/স্বাস্থ্য
সচেতনতা, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার রোধ, প্রতিদিনের পত্রিকা পড়া, ক্লাসের
বইয়ের বাইরেও বই পড়া, কম্পিউটারের সাধারণ ব্যবহার শেখা, অ্যানালাইটিক্যাল
অ্যাবিলিটি ও থিংকিং, প্রবলেম সলভিং অ্যাবিলিটি ইত্যাদি। সব শ্রেণির জন্য সব
শেখা উপযোগী নয়। এগুলো কোনো একটা ক্লাসে একবার শেখালে চলবে না। প্রথম থেকে
দশম শ্রেণির মধ্যে ভাগ করে কোনো কোনোটা একাধিকবারও শেখাতে হবে।