যেভাবে মেহমানদারি করা সুন্নত

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual1 Ad Code

ধর্ম ডেস্কঃ 

মেহমানদারি নবীদের আদর্শ। মেহমানদারি মানুষে-মানুষে বন্ধন দৃঢ় করে। সম্পর্কের গুরুত্ব বাড়ায়। পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে। মেহমানদারি সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। মেহমানদারিতে আছে আনন্দ ও পুণ্য। এটি কল্যাণ ও মহত্ত্বের পরিচায়ক।

ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আমার ফেরেশতারা (পুত্রসন্তানের) সুসংবাদ নিয়ে ইবরাহিমের কাছে এলো। তারা বলল, ‘সালাম।’ সেও বলল, ‘সালাম।’ সে অবিলম্বে কাবাবকৃত গোবৎস (ভুনা গরুর গোশত) নিয়ে এলো।’ (সুরা হুদ, আয়াত : ৬৯)

 

সর্বপ্রথম মেহমানদারির প্রথা প্রচলন করেন যিনি

ইবরাহিম (আ.) সর্বপ্রথম পৃথিবীতে মেহমানদারির প্রথা চালু করেছেন। ইসলামে অতিথিসেবার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মেহমানদারির সঙ্গে ইমানদারির বিশেষ সম্পর্ক আছে। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮; মুসলিম, হাদিস : ৪৮)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে প্রেরিত ফেরেশতাদের দলে হজরত জিব্রাইল, মিকাইল ও ইস্রাফিল (আ.) ছিলেন। তাঁরা মানুষের আকৃতি ধারণ করে ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে আগমন করেন। তিনি তাঁদের মানুষ মনে করে তাঁদের জন্য আতিথেয়তার আয়োজন করেন। ইবরাহিম (আ.)-ই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মেহমানদারির প্রথা প্রচলন করেন। (তাফসিরে কুরতুবি)

বিশ্বনবী (সা.) ছিলেন মেহমানদারির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

মহানবী (সা.) অনেক সময় অতিথি আপ্যায়ন করতে গিয়ে তাকে ও তার পরিবারকে অনাহারে থাকতে হয়েছে। নিজ ঘরে মেহমানদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলে তিনি মেহমানদের কোনো ধনী সাহাবির বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। নবী হওয়ার আগে থেকেই তিনি অতিথিসেবায় সচেষ্ট ছিলেন। সর্বপ্রথম ওহিপ্রাপ্ত হয়ে অনেকটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন মহানবী (সা.)। হজরত খাদিজা (রা.) তখন তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এভাবে—‘আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো রক্ষা করেন আত্মীয়তার বন্ধন, বহন করেন অন্যের বোঝা, উপার্জনক্ষম করেন নিঃস্বকে, আহার দেন অতিথিকে, সাহায্য করেন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ০৩)

 

Manual5 Ad Code

আতিথেয়তা নৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে মহৎ কাজ। অতিথিসেবা নবীদের সুন্নাত। কোনো কোনো আলেমের মতে, বহিরাগত মেহমানের মেহমানদারি করা গ্রামবাসীর জন্য ওয়াজিব বা অত্যাবশ্যকীয়। কেননা গ্রামে সাধারণত হোটেলের ব্যবস্থা নেই। তবে শহরে যেহেতু হোটেল-রেস্টুরেন্ট আছে, তাই সে ক্ষেত্রে মেহমানদারি সুন্নাত। (তাফসিরে কুরতুবি)

মেহমানদারির সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন

আতিথেয়তা ও মেহমানদারি ইবাদত। মেহমানদারি যদি আল্লাহর হুকুম ও রাসুল (সা.)-এর তরিকায় হয়, তাহলে পার্থিব ও পরকালীন দুই ধরনেই লাভ। মেহমানকে সম্মান জানানো, খুশি করা ও আনন্দিত করার পাশাপাশি বিপুল সওয়াবও লাভ হয়। তাই নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি।

এক. মেহমান এলে খুব দ্রুত তাকে স্বাগত জানানো

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন আবদুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধিরা মহানবী (সা.)-এর কাছে আগমন করে, মহানবী (সা.) তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কারা?’ তারা বলল, ‘আমরা (আবদুল কায়েস গোত্রের) রবিআ শাখার লোক।’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘ওই জাতিকে মারহাবা! ওই প্রতিনিধিদলকে মারহাবা! এটা তোমাদের অপরিচিত কোনো জায়গা নয়। এখানে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩; মুসলিম, হাদিস : ১৭)

Manual2 Ad Code

দুই. উপস্থিত যা আছে, তা দিয়ে আপ্যায়ন করা

আবদুল্লাহ ইবনে ওবায়েদ ইবনে উমায়ের (রহ.) বলেন, হজরত জাবের (রা.) নবী করিম (সা.)-এর সাহাবিদের এক জামাতের সঙ্গে আমার কাছে তাসরিফ আনলেন। হজরত জাবের (রা.) সঙ্গীদের সামনে রুটি ও সিরকা পেশ করলেন এবং বললেন, “এটা খাও, কেননা আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ইরশাদ করতে শুনেছি, ‘সিরকা’ উত্তম তরকারি। সে ধ্বংস হোক, যে তার কয়েকজন ভাই তার কাছে আসে, আর সে ঘরে যা আছে, তা তাদের সামনে পেশ করাকে কম মনে করে। ওই সব লোক ধ্বংস হোক, যারা তাদের সামনে যা পেশ করা হয়, তারা তাকে তুচ্ছ ও কম মনে করে।” অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘মানুষের ধ্বংসের জন্য এটা যথেষ্ট যে যা তার সামনে পেশ করা হয়, সে তাকে কম মনে করে।’ (মুসনাদে আহমাদ, তাবারানি)

তিন. মেহমানের জন্য বসার আলাদা ব্যবস্থা করা

মেহমান কারো কাছে গিয়ে মেজবানের জন্য নির্ধারিত স্থানে বসবে না। হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কেউ কারো ঘরে গিয়ে তার অনুমতি ছাড়া তার নির্দিষ্ট আসনে বসবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮৩)

Manual4 Ad Code

চার. আলেম মেহমানকে অত্যধিক সম্মান করা

Manual4 Ad Code

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যাদের ধর্মীয় জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদায় উন্নীত করবেন।’ (সুরা মুজাদালা, আয়াত : ১১)

পাঁচ. মেজবান মেহমানদারির কাজে অংশগ্রহণ করা

ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনায় আমরা দেখতে পাই, তিনি নিজেই দ্রুত আগত মেহমানদের জন্য মেহমানদারির ব্যবস্থা করেছেন। তার সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তোমার কাছে ইবরাহিমের সম্মানিত মেহমানদের কথা পৌঁছেছে কি? যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘সালাম।’ জবাবে সেও বলল, ‘সালাম।’ তারা তো (ছিল) অপরিচিত লোক। তারপর ইবরাহিম তার স্ত্রীর কাছে গেল এবং মোটাতাজা গরুর বাছুর ভুনা করে নিয়ে এলো। তারপর তা তাদের সামনে রেখে বলল, ‘তোমরা খাচ্ছ না কেন?’” (সুরা জারিয়াত, আয়াত : ২৪-২৭)

ছয়. খাবার নিয়ে লৌকিকতা প্রদর্শন না করা

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, “আমরা হজরত উমর (রা.)-এর কাছে ছিলাম। তিনি বললেন, ‘আমাদেরকে লৌকিকতা প্রদর্শন করতে নিষেধ করা হয়েছে’।” (বুখারি, হাদিস : ৭২৯৩)

অন্য হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দুজনের খাবার তিনজনের জন্য যথেষ্ট। আর তিনজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩৯২, মুসলিম, হাদিস : ২০৫৮)

 

মুফতি তাজুল ইসলাম

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code