

সংগ্রাম দত্ত
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় উদ্যান এবং অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনাঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা। এটি একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বাংলাদেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে এটি অন্যতম। মৌলভীবাজার কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ১২৫০ হেক্টর আয়তনের এ বন জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। লাউয়াছড়া উদ্যানে বাংলাদেশ বন বিভাগ কর্তৃক স্থাপিত তথ্য বোর্ড।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে এই বনকে ‘জাতীয় উদ্যান’ হিসেবে ঘোষণা করে। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ এবং উদ্ভিদ।নিরক্ষীয় অঞ্চলের চিরহরিৎ অতিবৃষ্টি অরণ্যের মতো এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। সূর্যের আলোর জন্য প্রতিযোগিতা করে এ বনের গাছপালা খুব উঁচু হয়ে থাকে, এবং অনেক ওপরে ডালপালা ছড়িয়ে চাঁদোয়ার মত সৃষ্টি করে। এই অরণ্য এতই ঘন যে মাটিতে সূর্যের আলো পড়েনা বললেই চলে। এটিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অতিবৃষ্টি অরণ্য এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
দেশের বিখ্যাত বনগুলোর মধ্যে লাউয়াছড়ার বন অন্যতম। পরিচিতির দিক থেকে সুন্দরবনের পরেই লাউয়াছড়ার বনের অবস্থান। সিলেট বিভাগে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় এ বন অবস্থিত।
১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে তদানিন্তন ব্রিটিশ সরকার এখানে বৃক্ষায়ন করলে তা’ বেড়ে আজকের এই বনে পরিণত হয়। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার মৌলভীবাজার ফরেস্ট রেঞ্জের আওতাধীন ২,৭৪০ হেক্টর আয়তনের পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন ছিলো এলাকাটি। সেই সুবাদে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পূর্ববতী নাম ছিল পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন। বনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতি ভ্রমণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পশ্চিম ভানুগাছ বনের ১,২৫০ হেক্টর এলাকাকে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) (সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘জাতীয় উদ্যান’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
চিরহরিৎ এ বনে নিরক্ষীয় অঞ্চলের বর্ষাবন বা রেইনফরেষ্টের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। একসময় বৃহত্তর সিলেটের সর্বত্রই এ ধরনের বন ছিলো। তবে বাণিজ্যিকভিত্তিতে চা বাগান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে ক্রমে সংকুচিত হতে হতে মাত্র কয়েকটি স্থানে চিরহরিৎ এ বর্ষাবনের অস্তিত্ব টিকে রয়েছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভূপ্রকৃতি পাহাড়ি মৃত্তিকা গঠিত। উঁচু-নিচু টিলা জুড়ে এ বন বিস্তৃত। বনের মাটিতে বালুর পরিমাণ বেশি এবং প্রচুর পাথর দেখা যায়। বনের মাটিতে পাতা জমে জমে পুরু স্পঞ্জের মতো হয়ে থাকে। জায়গায় জায়গার মাটিই দেখা যায় না। এসব স্থানে জোঁকের উপদ্রপ খুব বেশি। বনের ভেতর দিয়ে অনেকগুলো পাহাড়ি ছড়া বয়ে চলেছে। এসব ছড়ার কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোতে শুধু বর্ষার সময়ই পানি থাকে। ছড়ার পানি পরিষ্কার টলটলে এবং ঠান্ডা। যেসব ছড়াতে শুষ্ক মৌসুমেও পানি থাকে সেসব ছড়ার কাছে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা দেখা যায়।
লাউয়াছড়ার বনে বাঁশ ঝাড় ও বেতের ঝোঁপ
জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে লাউয়াছড়ার জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের সমৃদ্ধতম বনগুলোর একটি। আয়তনে ছোট হলেও এ বন দুর্লভ উদ্ভিদ এবং প্রাণীর এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। বনে প্রবেশের সাথে সাথেই নানা ধরনের বন্যপ্রাণী, পাখি এবং কীটপতঙ্গের শব্দ শোনা যায়। বনের মধ্যে প্রায় সারাক্ষণই সাইরেনের মত শব্দ হতে থাকে; প্রকৃতপক্ষে এটি এক ধরনের ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।
লাউয়াছড়ার জাতীয় উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখা যায়।
এ বনে স্তন্যপায়ী আছে নানা প্রজাতির। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। বনের মধ্যে কিছু সময় কাটালেই উল্লুকের ডাকাডাকি কানে আসবে। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, বানর, শিয়াল, মেছোবাঘ, রামকুত্তা, এশীয় কালো ভাল্লুক, মায়া হরিণ সহ নানা প্রজাতির জীবজন্তু। মায়া হরিণ সাধারণত উচ্চতায় ২০-২২ ইঞ্চি। এদের বাদামী রঙের দেহ যা’ পিঠের দিকে ঘিয়ে গাঢ় রং ধারণ করে।
গত ৫ এপ্রিল এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, গত ৩০ বছরে বন উজাড় ও আবাসস্থল কমায় উল্লুকের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমে তিন হাজার থেকে মাত্র ৪০০টির কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে।
এ বনে সরীসৃপ আছে নানা প্রজাতির। তার ভেতর অজগর হচ্ছে অনন্য। এখানে পাওয়া যায় হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ।
উদ্যানের বন্য পাখির মধ্যে সবুজ ঘুঘু, লাল বনমোরগ, তুর্কি বাজ, সাদামাথা সাতভায়লা, ঈগল, হরিয়াল, কালোমাথা টিয়া, কালো-পিঠ চেরালেজি, ধূসরাভ সাত সহেলি, প্যাঁচা, কালো ফিঙে, বাসন্তী লটকনটিয়া, কালো বাজ, লালমাথা টিয়া, কালো-মাথা বুলবুল, পরঘুমা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সাধারণ দর্শনীয় পাখির মধ্যে সবুজ টিয়া, ছোট হরিয়াল, সবুজ বাঁশপাতি, তোতা, পান্না কোকিল, পাঙ্গা, কেশরাজ প্রভৃতির দেখা মিলে।
২০০৯ সালে শ্রীমঙ্গল শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের শ্রী সিতেশ রঞ্জন দেব তাঁর চিড়িয়াখানা থেকে দুটি লক্ষ্মীপেঁচা ও একটি বন বিড়ালও অবমুক্ত করেন এ বনে। তাঁরই হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গল গত ২০১২ সাল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার লোকালয় থেকে অজগর সাপ, বানর, লজ্জাবতী বানর, মেছো বিড়াল, চিতা বিড়াল, বনবিড়াল, বিভিন্ন ধরনের প্যাঁচা, মদনটাক, মুনিয়া পাখি, শকুন, তক্ষক, শঙ্খিনী সাপ, গন্ধগোকুল, রেড আইক্যাট স্নেক, ধূসর ফণীমনসা ও বিভিন্ন রকমের বিরল প্রজাতির প্রাণীসহ প্রায ৭০০ টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক স্বপন কুমার দেব সজল স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিককালে বন উজার, খাদ্যের অভাব ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন রকমের বন্যপ্রাণী খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে ছুটে আসায় স্থানীয় এলাকাবাসীর কার থেকে খবর পেয়ে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কর্তারা বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করে বনাঞ্চলে পুনরায় অবমুক্ত করা হয়েছে বলে সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের জানিয়েছেন।
লাউয়াছড়ার বনেই রয়েছে বিপন্ন প্রজাতির উল্লুক। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে এ উল্লুক বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে । লাউয়াছড়ার বনেও এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। দুই দশক আগে এই বনে কয়েক হাজার উল্লুক দেখা যেতো। কিন্তু বর্তমানে সে সংখ্যা কমতে কমতে একশোরও নিচে এসে ঠেকেছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে একসময় হয়তো এই বন থেকে উল্লুক চিরতরে হারিয়ে যাবে। নির্বিচারে বন ধ্বংসের ফলে উল্লুকের বাসস্থান ও খাদ্যসংকট সৃষ্টিই এদের সংখ্যা হ্রাসের প্রধানতম কারণ। লাউয়াছড়ার বনে বর্তমানে মাত্র ৪৯ টি উল্লুক অবশিষ্ট আছে। নিকটবতী ছাউতলি ও কালাছড়ার বন মিলিয়ে এ সংখ্যা ৬০-এর মত। লাউয়াছড়া ও এর আশপাশের বনে মোট ১৬ টি উল্লুক পরিবার রয়েছে। ভোরবেলা লাউয়াছড়ার বনে গেলে অনেক সময় উল্লুকের দেখা পাওয়া যায়। এই বনে উল্লুকের প্রিয় খাদ্য চামকাঁঠাল বা চাপালিশ ফল।
বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর সংগ্রহ তালিকায় যুক্ত হয়েছে একটি হনুমানের বাচ্চা। বাচ্চা হনুমানটি মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বিশামনি গ্রামে মাছের খামারে ঘেরাজালে আটকা পড়া হনুমানটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ট্রাস্টের নির্বাহী প্রধান আনোয়ারুল ইসলাম শনাক্ত করেন যে, এটি অতিবিপন্ন প্রজাতির ‘ফ্যায়র্স লাঙ্গুর’। হনুমানটি প্রথমে সিতেশ রঞ্জন দেবের চিড়িয়াখানায় রাখা হয়। পরে এটিকে সিলেট বন বিভাগের হেফাজতে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জানকীছড়ায় রাখা হয়। ধরা পড়াকালীন সময় এর বয়স ছিলো মাত্র তিন মাস।
শকুনের নিরাপদ এলাকা-১ তফসিল অনুসারে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান শকুনের জন্য নিরাপদ বলে ঘোষিত।
লাউয়াছড়া বনাঞ্চলে রয়েছে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ। আছে গর্জন, সেগুন, গামারি, মিনজিরি, জামরুল, চাপালিশ, নাগেশ্বর, শিমুল, লোহাকাঠ, জাম, ডুমুর, তুন, শিরিষ প্রভৃতি। নানা প্রকারের দেশীয় গাছ দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশে নানা ধরনের অর্কিড দেখতে হলেও এ বন এক অপূর্ব স্থান।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশেই রয়েছে মাগুরছড়া আদিবাসী নৃগোষ্ঠী খাসিয়াপুঞ্জি। খাসিয়ারা বন ও প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে গড়ে তুলেছে তাদের আবাস। তাদের আবাসভূমিগুলো একাধিক টিলা অতিক্রম করে উঠে গেছে ছোট ছোট টিলার উপরে। তাদের প্রধান পেশা পান চাষ।
জীববৈচিত্র্য, উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও পরিবেশ বিপর্যয়ের খবর সংগ্রহকালে জানা যায় যে, গ্যাস অনুসন্ধান ও এর ফলে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় পরিবেশবাদী ও সচেতন মহলের ব্যাপক প্রতিবাদসত্ত্বেও ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানী শেভরন লাউয়াছড়া ও এর আশেপাশের বনভূমি এলাকায় ত্রিমাত্রিক অনুসন্ধান শুরু করে। ত্রিমাত্রিক অনুসন্ধানের জন্য বনের অভ্যন্তর ও আশপাশের এলাকায় নির্বিচারে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এসময় বন এলাকায় সৃষ্ট ভূকম্পনে বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বনের কয়েক জায়গায় আগুন ধরে যায়। বনের আশপাশের বাড়িঘরে ফাটল দেখা দেয়। লাউয়াছড়া বনে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অনুসন্ধানের অনুমতি প্রদানের জন্য তৎকালীন তত্বাবধায়ক সরকারও দেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এর আগে ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাতে আরেক বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানী অক্সিডেন্টাল পরিচালিত এধরনের একটি অনুসন্ধানের সময় লাউয়াছড়া বনের পাশেই মাগুরছড়ার অনুসন্ধান কুপে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে পুরো এলাকায় মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। এ বিস্ফোরণের ফলে কয়েক ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে যায়। মাগুরছড়ার বন এখনো সেই ক্ষত বহন করছে। মাগুরছড়া বিস্ফোরণে বাংলাদেশ সরকার ওই কোম্পানীর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করলেও তা এখনো অমিমাংসীত পর্যায়ে রয়ে গেছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সরকারের সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সরকারের পক্ষ থেকে তাই বনরক্ষী নিয়োগ দেয়া হয়, যারা বনের সার্বিক দেখভাল করে থাকেন। কিন্তু পর্যাপ্ত লোকবল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে তাদের অবস্থাও নাজুক।
গত ২৪ জূন ২০১৬ জাতীয় দৈনিক এক প্রতিবেদনে লিখেছে যে লাউগাছড়া বনাঞ্চলের প্রায় ৮০০ একরের উপর ভূমি হয়েছে।
পত্রিকাটি রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে,নির্সগ সহায়তা প্রকল্পের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘অ্যান ওভারভিউ অব দ্য ইস্যুজ অ্যাফেকটিং দ্য নির্সগ প্রজেক্ট এরিয়াজ’ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের শুধু বাগমারা এলাকাই ৫০০ একর বনভূমি বেদখল হয়েছে।
বাগমারা ছাড়াও লাউয়াছড়া উদ্যানের লংগুরপাড়, রাসটিলা, ছাতকছড়া এলাকায় অন্তত ৩০০ একর বনভূমি বেদখল হয়েছে।
লাউয়াছড়ার বনভূমি দখল করে গড়ে উঠা বাগমারা, রাসটিলা, ছাতকছড়া ও ডলুছড়াসহ এলাকার বনভূমি দখলে নিয়ে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসতি স্থাপন করা হয়েছে। আনারস, কাঠাঁল ও লেবুর বাগান করা হয়েছে। পাহাড়-টিলার খাদে করা হয়েছে ধানের আবাদ। যা পত্রিকাটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে চার দশকে একশ্রেণীর প্রভাব প্রতিপত্তিশালী সংঘবদ্ধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ঢুকে বিভিন্ন রকমের গাছ কেটে পাচার করার কারণে বনাঞ্চল প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি। সঙ্ঘবদ্ধ প্রভাবশালী লোকজন বিভিন্ন দলে থাকলেও বনজ সম্পদ লুটপাটে সবাই এক। এমনকি বনাঞ্চলের ভূমি দখল করে চা বাগান, রিসোর্ট, ও বাসাবাড়ি তৈরি বসবাস করেছেন, করছেন। সঙ্ঘবদ্ধ প্রভাবশালী গুষ্টির বিভিন্ন রকমের গাছ পাচার করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বলেছেন, বনছেন। বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত হয়েছেন।
বনাঞ্চল উজারের খবর বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও স্যোশাল মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। এমনকি বিশিষ্ট সমাজসেবক ব্যারিস্টার সুমন পর্যন্ত এখানে এসে লাইভ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় খবর প্রচার করেছেন।
দেশের শীর্ষ মিডিয়া প্রায় তিন বছর পূর্বে যমুনা টিভি এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, লাউয়াছড়াকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণার পর এই বনের প্রতি মানুষের আগ্রহ যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে দখলও। স্থানীয় এমপি, জনপ্রতিনিধিরা বাগান করার নামে দখল করছেন সংরক্ষিত এই বনের জমি। সব জেনেও চুপ থাকতে বাধ্য হচ্ছে বন বিভাগ। এতে বন হারাচ্ছে বৈচিত্র্য। হুমকির মুখে পড়েছে বন্যপ্রাণি ও স্থানীয় বনজীবীরা। যমুনা টিভির প্রতিবেদক প্রভাবশালী দখলদারদের সঙ্গে দেখা করে তাদের বক্তব্য নিয়েছেন। এতে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে দখল করার অভিযোগ করতে ভিডিওতে দেখা গেছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো “সাবেক কৃষিমন্ত্রী শহীদের দখলে থাকা লাউয়াছড়া বনের জায়গা উদ্ধার” প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে বন বিভাগ গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদের দখলে থাকা প্রায় পাঁচ একর জায়গা উদ্ধার করেছে বন বিভাগ।
“অনেক বছর ধরে অবৈধভাবে কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ জায়গাটি দখল করে রেখেছিলেন। ২০১৮ সাল থেকে বন বিভাগ বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও বনের জায়গাটি উদ্ধার করতে পারেনি।”
বন বিভাগের একজন বলেন, ‘জায়গাটি আমরা অনেক আগেই উদ্ধার করতে পারতাম; কিন্তু সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ পাওয়ারফুল লোক হওয়ায় তাঁর কবল থেকে জমিটি উদ্ধার করা কঠিন ছিল। সরকারের সব জায়গায় প্রভাব ছিল তাঁর, সেই কারণে বন বিভাগের লোকজন জায়গাটি উদ্ধার করতে গিয়েও পারেনি।’
এছাড়া অধিক জনসংখ্যার জন্য সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে আবাস গড়ার কারণেও অনেক গাছপালা হারিয়ে যাচ্ছে এই বনাঞ্চল থেকে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঘোর প্রভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক গাছ-গাছালি ও জীববৈচিত্র্য। অন্যদিকে বর্তমানে রেলওয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে ট্রেন চলাচলের নির্বিঘ্নতার জন্য লাইনের পাশের ২৫,০০০ গাছ কাটার জন্য । যার ফলে পুরো বন ধ্বংস হয়ে যাবে।
জুলভার্নের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে করা ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ ছবিটির একটি দৃশ্যের হলিউডের চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছে এই বনে। ১৩টি দেশের ১১৪টি স্থানে চিত্রায়িত হয় ছবিটি। এসব দেশের মধ্যে ছিল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ভারত, বাংলাদেশ, স্পেন, থাইল্যান্ড ও জাপান। আর বাংলাদেশের অংশের শুটিং হয়েছিল সিলেট বিভাগের লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জঙ্গলে। বন ঘেঁষে যে রেলপথ চলে গেছে, ঠিক সেখানেই হয়েছে ছবিটির কিছু দৃশ্যের শুটিং। ছবিটির একটি দৃশ্য ছিল এ রকম ট্রেন ছুটছে। হঠাৎ চালক খেয়াল করলেন, লাইনের সামনে একপাল হাতি আপনমনে চড়ে বেড়াচ্ছে। ট্রেন থেমে যায়। কামরা থেকে নেমে আসেন নায়ক ডেভিড নিভেন, ব্যাপারটা কী দেখতে। সামনের গ্রামেই তখন হচ্ছিল সতীদাহ। নায়ক ছুটে গিয়ে মেয়েটিকে বাঁচান। মেয়েটি হলো শার্লি ম্যাকলেইন। ছবির এই অংশটুকুই চিত্রায়িত হয়েছিল লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইন এলাকায়। Dbj