

মৌলভীবাজার জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ শমশেরনগর। কবি আসাদ চৌধুরী শমশেরনগরে এসে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তার মুখ দিয়ে অবাক বিস্ময়ে একটি কথা বেরিয়েছিল, ‘অবাক কাণ্ড, শমশেরনগর কেন উপজেলা নয়!’ আসাদ চৌধুরীর কথা এখনো সবার মুখে মুখে ঘুরে।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান (তৎকালীন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স বা পিআইএ) এর নিয়মিত ফ্লাইট ঢাকা-শমশেরনগর-সিলেট এবং সিলেট-শমশেরনগর-ঢাকা চালু ছিল। ঐ সময়ে একটি ভয়াবহ বিমান দূর্ঘটনার কারণে শমশেরনগর এয়ারপোর্টে নিয়মিত বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এয়ারপোর্টের কারণেই মৌলভীবাজার জেলার মধ্যে অন্য উচ্চতায় অবস্থান নিয়েছে শমশেরনগর।
শমশেরনগরের অতীত ইতিহাস খুঁজলে পাওয়া যাবে অনেক ঐতিহ্যবাহী ঘটনার। এখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অবিভক্ত বাংলার অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব এসে সভা করেছেন। শমশেরনগরেই বঙ্গবন্ধু কমলগঞ্জ তথা সিলেট বিভাগের ত্যাগী জননেতা মোহাম্মদ ইলিয়াসকে ভোট দেয়ার জন্য সর্বসাধারণকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ঐতিহ্যবাহী শমশেরনগর তার বুকে অনেক দুঃখ লুকিয়ে রেখেছে। ষাটের দশকে উপজেলা (তৎকালীন থানা) হওয়ার জন্য সর্বক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েও শমশেরনগর উপজেলা হতে পারেনি। সেই থেকে উপজেলা না হবার যন্ত্রণা দীর্ঘ ৬ দশক ধরে কাঁদাচ্ছে শমশেরনগরকে।
বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হয়।’ শমশেরনগরের ক্ষেত্রেও তা সত্য। তবে সময়ের প্রেক্ষাপটে শমশেরনগরে এখন সঠিক নেতৃত্ব দেয়ার মত অনেক নেতার জন্ম হয়েছে। আশা করা যায় যে কোন কাজে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করে কাঙ্খিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য এখন সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবেন। এলাকার উন্নয়নে রাজনৈতিক বিরোধিতা কিংবা নেতৃত্ব নিয়ে অকারণ হিংসা কিংবা পদ-পদবী না পাওয়ার হতাশা নিয়ে অতীতের মত কেউ সাফল্যকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করার দায় গ্রহণ করবেন না।
শমশেরনগরে ত্যাগী কিছু ব্যক্তিত্বের কারণে অনেক অসম্ভব কাজই সাফল্যের মুখ দেখেছে। কেউ কেউ সামনে না এসে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে শমশেরনগরের উন্নয়নকে সাফল্যমণ্ডিত করেছেন। এলাকাবাসী অবশ্যই তাদেরকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন। আজ এরকম অনেক ব্যক্তিত্বই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তবে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে অবশ্যই তাদের বিকল্প ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছে। আশা করা যায় তাদের মাধ্যমেই শমশেরনগরের উন্নয়নের অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন হবে।
শমশেরনগরের উন্নয়নের অসমাপ্ত কাজগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে শমশেরনগর হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা। সরকারিভাবে হোক কিংবা বেসরকারিভাবে হোক শমশেরনগর হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবী। সকল শ্রেণীপেশার মানুষের অংশগ্রহনে স্বল্প পরিসরে হলেও একটি দাতব্য হাসপাতাল স্থাপনে শমশেরনগরবাসী ঐক্যবদ্ধভাকে কাজ করবে। এখন সেই সময়টিই সামনে চলে এসেছে।
শমশেরনগরে একটি হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগে গত ১৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় স্থানীয় ব্রাদার্স পার্টি সেন্টারে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী এবং শমশেরনগরের কৃতি সন্তান সেলিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় বক্তব্য রাখেন সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর, মুজিবুর রহমান রঞ্জু, সায়েক আহমদ, প্রভাষক আব্দুস সালাম, অধ্যাপক ফজলুর রহমান, মাহমুদুর রহমান আলতা, প্রভাষক আ স ম সায়েম, সাংবাদিক শাহ আলম চৌধুরী, এবিএম আরিফুজ্জামান অপু, এখলাস আহমদ হায়দারী, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, আজিজুর রহমান চৌধুরী, সিতারাম বিন, মিজানুল হক স্বপন, মোয়াজ্জেম হোসেন সানু, প্রভাষক শাহাজাহান মানিক, আহমদুর রহমান খোকন, নূর উদ্দিন, আমিনুর রহমান লিটন প্রমুখ।
সভার শুরুতে বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি ও এলাকার চিকিৎসা সেবার চাহিদা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, ঐতিহ্যবাহী শমশেরনগর শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও ব্যবসা-বানিজ্যে সমৃদ্ধ থাকলেও চিকিৎসাসেবায় পিছিয়ে আছে। চিকিৎসার জন্য এলাকাবাসীকে কমলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। কিন্তু সেখানে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় হয় মৌলভীবাজার কিংবা সিলেটে যেতে হয়। শমশেরনগর-মৌলভীবাজার সড়কটি এমন বেহাল অবস্থায় আছে যে, গর্ভবতী মহিলার রাস্তায়ই প্রসব করার মত ঘটনাও ঘটে। এ কারণে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত মানুষের নিকট এখন শমশেরনগর হাসপাতাল যুগোপযোগী দাবী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্বসম্মতিক্রমে একটি দাতব্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় উপস্থতি সদস্যগণ একমত পোষন করে অভিজ্ঞতার আলোকে সঠিক ও সময়োপযোগী পরামর্শ প্রদান করেন এবং সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বক্তারা বলেন, হাসপাতালটি স্থাপিত হলে শমশেরনগর এলাকাসহ পার্শ্ববর্তী পতনঊষার, শরীফপুর, হাজীপুর ও মুন্সীবাজার ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ চিকিৎসাসুবিধা পাবে।
সভায় শমশেরনগর হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা শেষে দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণীপেশার মানুষের প্রতিনিধি ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে ৮৯ সদস্য বিশিষ্ট প্রস্তাবিত ‘শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়ন আহবাযক কমিটি’ গঠন করা হয়। উল্লেখ্য যে, এ মহতি উদ্যোগে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী ব্যক্তিদেরকেও পরবর্তীতে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শামছুল হকের সঞ্চালনায় সভায় স্থানীয় নানা পেশার মানুষের উপস্থিতিতে সবাই ঐক্যমতে পৌছেন প্রয়োজনের তাগিদে সরকারি হোক কিংবা বেসরকারি হোক, প্রাথমিকভাবে ১০ শয্যা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে। সভা চলাকালে ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী স্থানীয় হাজী মো. উস্তওয়ার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মরহুম বশিরউদ্দিন আহমদ সাহেবের জ্যেষ্ট পুত্র সরোয়ার জামান রানা হাসপাতালের জন্য ১ লক্ষ টাকা এবং তার স্ত্রী আলেয়া জামান হাসপাতালের জন্য ১৩৫ শতক ভূমি দান করার আশ্বাস প্রদান করেন। একই সাথে যুক্তরাজ্য প্রবাসী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম মো. শামসুদ্দিন খানের পুত্র ময়নুল ইসলাম খান হাসপাতালের জন্য ১ লক্ষ টাকা দান করার আশ্বাস প্রদান করেন। ভিডিও কল শেষ হলে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে যুক্তরাজ্য প্রবাসী আমিনুর রহমান লিটন ১ লক্ষ টাকা, বদরুল ইসলাম ১ লক্ষ টাকা, ইউপি সদস্য আজিজুর রহমান চৌধুরী ১ লক্ষ টাকা, ব্রাজিলপ্রবাসী মুজাহিদ আহমদ ২০ হাজার টাকা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাছিত সড়কস্থ আজিজ খান সাায়েম ১০ হাজার টাকা দান করার আশ্বাস দেয়ার উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ তাদেরকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। এ ছাড়া আরো অনেকেই প্রাথমিকভাবে হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটির তহবিলে নগদ অর্থ প্রদানেরও আশ্বাস প্রদান করেন। এভাবে স্থানীয় ও বিভিন্ন দেশে বসবাসরত শমশেরনগরের সন্তানরা হাসপাতাল স্থাপণে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেয়ার প্রেক্ষিতে আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, যে সকল সম্মানিত দাতাগণ নূন্যতম ১ লক্ষ টাকা দান করবেন তাঁদের নাম হাসপাতালের ফটকের সামনে ধাতব অক্ষরে ক্রমানুসারে লিপিবদ্ধ থাকবে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানের আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হবে। ১ লক্ষ টাকার কম অর্থ প্রদানকারী ব্যক্তিবর্গকে সম্মানিত দাতা হিসেবে যথার্থ মূল্যায়ন করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
প্রাথমিক ব্যয় বহন করার জন্য উপস্থিত সদস্যগণ ৬,৫০০ টাকার তাৎক্ষণিক তহবিল গঠন করেন। পরবর্তী ১ সপ্তাহের মধ্যে ব্যাংক একাউন্ট, রসিদবই, সিল, প্যাড, আয়ব্যয় খাতা সহ আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সভায় সর্ব সম্মতিক্রমে কন্ঠশিল্পী সেলিম চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে ও ১১জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক কওে সর্বমোট ৮৯ সদস্যবিশিষ্ট ‘শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা হয়।
কমিটির সদস্যরা হলেন, আহবায়ক-সেলিম চৌধুরী, যুগ্ম আহবায়ক-মুজিবুর রহমান রঞ্জু, সায়েক আহমদ, প্রভাষক আব্দুস সালাম, অধ্যাপক ফজলুর রহমান, আকমল মাহমুদ, মাহমুদুর রহমান আলতা, প্রভাষক আ স ম সায়েম, শাহ আলম চৌধুরী, আব্দুল মালিক বাবুল, এবিএম আরিফুজ্জামান অপু । সদস্য-ডাঃ ফেরদৌস আহমদ, ডাঃ রাফি আহমদ খাঁন, ডাঃ সৈয়দ মাহবুব আলী শুভ, ডাঃ রাবেয়া বেগম, ডাঃ আব্দুল্লাহ ইবনে আমীন, ডাঃ প্রিয়তোষ সুত্রধর, ডাঃ শামছুল আরেফিন, সরওয়ার জামান রানা, এখলাস আহমদ হায়দারী, রতন বর্মা, রইছ উদ্দিন, সালাহউদ্দিন তফাদার, আইয়ুব আলী, আব্দুল মোহিত ইফতিয়ার, শওকত আলী চৌধুরী, সাইফুর রহমান কামরান, আজিজুর রহমান চৌধুরী, ময়নুল ইসলাম খাঁন, জাহিদ ইসকান্দার, মুজিবুর রহমান চৌধুরী মুকুল, নজরুল হক আনোয়ার, আব্দুল হাদী জুয়েল, নিজাম উদ্দিন দরাছত. শিরিন আহমদ, মিজানুল হক স্বপন, সিতারাম বিন, কবির আহমদ, আব্দুস সামাদ সামাইল, সমরেন্দ্র সেনশর্মা, মোয়াজ্জেম হোসেন সানু, আজমল হোসনে জুয়েল, আজিজুল হক জসিম, সৈয়দ জাহাঙ্গীর আহমদ. প্রভাষক শাহাজাহান মানিক, হাফিজুল হক চৌধুরী স্বপন, আব্দুল হান্নান, ডাঃ সুশীল দেবনাথ, শওকত আলী জুয়েল,মিজানুর রহমান মিজান, নাজমুল হোসেন, মোঃ আশিকুর রহমান, আব্দুল শহিদ জহির, আবু কাফি মোঃ শাহি, মুমিত খান শৈবাল, আহমদুর রহমান খোকন, রুহেল আহমদ চৌধুরী মোস্তাফিজুর রহমান সুমন, সিরাজুর রহমান সিপন, সাইফুর রহমান রিপন, জুহেব আহমদ, অনিমশে পাল লিটন, আব্দুর রহমান রানু, আমিনুর রহমান লিটন, শফিউল আলম উজ্জল, আজিজুর রহমান মশাহিদ, শাহীন আল রাজি, আজিজ খান সায়েম, আব্দুল কাদির সাজু, মানিক সিকদার, গোলাম রাব্বি, এনামুল হক এমরাজ, মোকরামিন চৌধুরী মুকুল, সৈয়দ আহসান রাজু, সাকিবুর রহমান সাকি, সৈয়দ ইসতিয়াক উদ্দিন বাবেল, মোজাহিদ আহমদ, ওবায়দুর রহমান লোপন, মিজানুর রহমান চৌধুরী, রাকিবুর রহমান, ইসতিয়াক আহমদে চৌধুরী সৌরভ, মুহিবুর রহমান অপু, মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল, আতিক শাহরিয়ার, ইজাজ নিশাত মুন, মোস্তাক আহমদ, মাহিন আহমদ, সদস্য সচিব-শামছুল হক মিন্টু।
শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক কন্ঠশিল্পী সেলিম চৌধুরী বলেন, শমশেরনগর একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এখানে সব ধরণের সুযোগ সুবিধা থাকলেও অভাব রয়েছে একটি হাসপাতালের। প্রবাসী শমশেরনগরী ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় একটি হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসী ও প্রবাসীদের আন্তরিক সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিধি মেনে হাসপাতাল স্থাপন করা হবে। তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য প্রবাসী ভূমিদাতাসহ কয়েকজনের তাগিদে ও বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত শমশেরনগরের সন্তানদের সহযোগিতা হাসপাতাল স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। তিনি আশাবাদী আগামী দেড় বছরের মধ্যেই শমশেরনগর হাসপাতাল ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করা যাবে। এ জন্য শমশেরনগরের সন্তান যারা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের সাথে মতবিনিময় করা হবে।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবিত হাসপাতালের নাম এলাকার নামানুসারে ‘শমশেরনগর হাসপাতাল’ নামকরণ করা হয়। তবে তার পূর্বে ভূমিদাতাকে তাদের নামে হাসপাতালের নামকরণ করার প্রস্তাব দেয়া হলে তিনি তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে বলেন যেহেতু এলাকার জনগণের সুবিধার জন্য ভূমি দান করা হচ্ছে, কাজেই হাসপাতালটির নামও এলাকার নামে হলে তারা খুশি হবেন।
সভায় জানানো হয়, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সার্বিক সহযোগিতার জন্য ইতোমধ্যে একটি প্রতিনিধি দল কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল নির্বাচনী এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্য এবং অনুমিত হিসাব সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ ড. এম এ শহীদ এমপি মহোদয়ের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি শমশেরনগর এলাকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১০ বেডের একটি সরকারি হাসপাতাল স্থাপনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা আশ্বাস প্রদান করেন। তিনি প্রতিনিধিদলকে দ্রুত ভূমিদান বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য উৎসাহিত করেন। তথ্যটি জানার পর সভার পক্ষ হতে মাননীয় এমপি মহোদয়কে শমশেরনগরবাসীর পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ ড. এম এ শহীদ এমপি মহোদয়কে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মনোনীত করা হয়।
দেশবিদেশে অবস্থানরত এলাকার অভিজ্ঞ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে এবং তাদের অনুমতি সাপেক্ষে পরবর্তীতে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় সাবেক আইজি প্রিজন মেজর জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন (অবসরপ্রাপ্ত) মহোদয়কে প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে নাম প্রস্তাব করা হলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এ ব্যাপারে পরবর্তি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। পরবর্তী সভায় পূর্ণাঙ্গ উপদেষ্টা কমিটিও গঠন করা হবে। উপদেষ্টা কমিটিতে স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত শমশেরনগরের সকল ডাক্তারদেরকে এবং স্বাস্থ্য বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরকেও রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় শমশেরনগর হাসপাতাল পরিচালনার জন্য অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং দক্ষ ব্যক্তিত্ব সাবেক সিভিল সার্জেন ও স্বাস্থ্য বিভাগ, সিলেট এর ডেপুটি ডাইরেক্টর জনাব শফিক উদ্দিন আহমদ সাহেবকে পরিচালক পদে মনোনীত করা হয়। ডা. শফিকউদ্দিন আহমদ এর অভিজ্ঞ হাতের স্পর্শে শমশরেনগরবাসীর স্বপ্ন পূরণ হবে বলে উপস্থিত সদস্যগণ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এছাড়াও কমলগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞ সংগঠক ইমতিয়াজ আহমদ বুলবুল মহোদয়কেও পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সভায় হাসপাতাল স্থাপনে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় হবে, তাই দেশে-বিদেশে অবস্থানরত এলাকার দানবীর এবং স্বচ্ছল ব্যাক্তিদের সাথে যোগাযোগ করে তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। এলাকার স্বচ্ছল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং প্রবাসী ভাইদের সাথে যোগাযোগ করলে তাঁরা অবশ্যই এই মহতি উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবেন বলে সবাই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রস্তাবিত ‘শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটি’র নামে আহবায়ক সেলিম চৌধুরী, যুগ্ম আহবায়ক মুুজিবুর রহমান রঞ্জু ও সদস্য সচিব শামছুল হক মিন্টু এর যৌথ স্বাক্ষরে ব্যাংক হিসাব খোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হাসপাতাল সংক্রান্ত যাবতীয় লেনদেন এই একাউন্টে পরিচালিত হবে। এছাড়াও নির্ধারিত রশিদে সকল আর্থিক অনুদান গ্রহণ করা হবে।
শমশেরনগরে অনেক বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন যারা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে শমশেরনগরের উন্নয়নে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। অনেক বরেণ্য ব্যক্তি না ফেরার দেশে চলে গেলেও তাদের কর্মতৎপরতা এখনো সর্বমহলে আলোচিত হয়। বর্তমান সময়েও শমশেরনগরের এমন কয়েকজন কৃতি সন্তান আছেন, যাদের কারণে দেশ বিদেশে শমশেরনগরের নাম উচ্চারিত হয়। এমন একজন ব্যক্তিত্ব বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী সেলিম চৌধুরী। ১৯৯৭ সালে দেশবরেণ্য কথাশিল্পী, জনপ্রিয় লেখক ও নাট্যকার হূমায়ুন আহমেদ শমশেরনগরে এসেছিলেন সেলিম চৌধুরীর আমন্ত্রণে। সেলিম চৌধুরীর বাসায়ই অবস্থান করেছিলেন হূমায়ুন আহমেদ। সেই সেলিম চৌধুরীই এবার হাল ধরেছেন ‘শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটির। কাজেই আশা করা যায় তিনি সবাইকে একসূত্রে গাঁথার একটি দুঃসাহসিক কর্ম সম্পাদন করবেন এবং শমশেরনগরের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবেন।
শমশেরনগরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অতীত থেকেই একটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রতিটি উন্নয়নের কর্মকাণ্ডেই একটি মহল প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে বিরোধিতা করে থাকেন। শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এরকম একটি প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। কেউ কেউ ভূমির জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এখানে উল্লেখ্য, ভূমিদাতা সরওয়ার জামান রানা তার তিনটি ভূমির কথা জানিয়েছেন। শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়নের জন্য মৌলভীবাজার রোডে তার ১৩৫ শতক ভূমি গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। ভূমি নিয়ে কোন জটিলতা থাকলে তার মৌলভীবাজার রোডে এবং এয়ারপোর্ট রোডে আরো দু জায়গায় ভূমি রয়েছে। সরওয়ার জামান জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। কাজেই কোন ভূমিতে সমস্যা থাকলে অন্য ভূমি দেয়া হবে। মোট কথা হাসপাতালের জন্য ভূমিদানের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তার কোন ব্যতিক্রম হবে না। কাজেই শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়ন এখন সময়ের কাজ।
পরিশেষে শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়নের জন্য এলাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো যাচ্ছে। এলাকাবাসীকে মনে রাখতে হবে এলাকাবাসীর চিকিৎসা সুবিধার জন্যই শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কাজেই এখানে দলমত নির্বিশেষে সবারই এগিয়ে আসা উচিত। সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। শমশেরনগর হাসপাতাল বাস্তবায়ন হলেই শমশেরনগরবাসীর দীর্ঘদিনের আক্ষেপ দূর হবে।
[সায়েক আহমদ, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক, শিশু সাহিত্যিক, ০১৭১২৯৬২৩৯৩]