

সংগ্রাম দত্ত
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক ছোট্ট শহর শ্রীমঙ্গল। প্রকৃতির সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা এ শহর শুধু চা-বাগান আর পাহাড়-টিলার জন্যই নয়, বরং শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের জন্যও পরিচিত। এখানকার সন্তানরা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থেকে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানে অবদান রাখছে। তাঁদেরই একজন, মেধা ও শ্রমের সমন্বয়ে তৈরি এক তরুণ বিজ্ঞানী—মো. আসিফ ইকবাল ফাহিম। সম্প্রতি তিনি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি নিয়ে আয়ারল্যান্ডের প্রখ্যাত ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন (ইউসিডি)-এ পিএইচডি গবেষণার অভিযাত্রা শুরু করেছেন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি—জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Generative AI)।
প্রস্থান থেকে নতুন সূচনা-
বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫। ভোররাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে আয়ারল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন ফাহিম। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডাবলিনের পথে তাঁর পদক্ষেপ শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং দীর্ঘদিনের সাধনা ও অধ্যবসায়ের ফসল। বিমানবন্দরে বিদায় জানাতে আসা স্বজনদের চোখে জল থাকলেও গর্বও ছিল সমানভাবে। শ্রীমঙ্গলের এই মেধাবী তরুণ এখন নতুন এক বিশ্বে, নতুন এক জ্ঞানভুবনে নিজের মেধার আলোকছটা ছড়াতে যাচ্ছেন।
পরিবারের অনুপ্রেরণা ও শিক্ষার উত্তরাধিকার-
ফাহিমের পরিবার শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনেও অবদান রেখেছে বহুদিন ধরে। তাঁর পিতা কাউছার ইকবাল শ্রীমঙ্গলের একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। অন্যদিকে ফাহিমের পিতামহ মরহুম মো. আব্দুল মালিক, যিনি সকলের কাছে লেবু স্যার হিসেবে পরিচিত, ছিলেন শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলের স্বনামধন্য শিক্ষক। সমাজে শিক্ষার আলো ছড়ানোই ছিল তাঁর জীবনের মূল ব্রত। বলা যায়, জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা ফাহিমের পরিবারে বহুদিন ধরেই লালিত। এই উত্তরাধিকারই হয়তো তাঁকে গবেষণার পথে অনুপ্রাণিত করেছে।
শিক্ষাজীবনের গল্প-
শ্রীমঙ্গলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর ফাহিম উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা যান। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি গবেষণা, প্রকল্প ও নানা একাডেমিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মেশিন লার্নিং ও নিউরাল নেটওয়ার্কের জগতে প্রবেশ করে তিনি খুঁজে পান নিজের স্বপ্নের দিশা। নানা গবেষণামূলক কাজ, প্রবন্ধ প্রকাশ ও আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ তাঁকে ধাপে ধাপে এগিয়ে দেয়।
ফাহিম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—
“আমার লক্ষ্য শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়; আমি চাই নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে, যা মানুষের জীবন সহজ করবে।”
কেন জেনারেটিভ এআই?
আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানবসভ্যতার রূপ পাল্টে দিচ্ছে। বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্পকলা, এমনকি দৈনন্দিন জীবনেও বিপ্লব ঘটাচ্ছে। ভাষা মডেল, ছবি তৈরি, সঙ্গীত, এমনকি চিকিৎসা গবেষণাতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। তবে এর সাথে সাথে নৈতিকতা, ডেটা প্রাইভেসি, ভুয়া তথ্য এবং শ্রমবাজারে প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠছে।
এই চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার সংযোগস্থলেই গবেষণার ইচ্ছা ফাহিমের। তিনি বিশ্বাস করেন, এআই মানুষের সৃজনশীলতাকে অগ্রসর করবে, তবে সঠিক নীতি ও গবেষণার অভাবে এটি ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাঁর পিএইচডি গবেষণা এই ভারসাম্য খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা।
সাফল্যের পথ-
ফাহিমের এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘদিনের নিরলস সাধনা, অধ্যবসায় ও ত্যাগের মধ্য দিয়েই তিনি আজকের জায়গায় পৌঁছেছেন। শিক্ষাজীবনে অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়েও তিনি গবেষণাকে চালিয়ে গেছেন। পারিবারিক সহযোগিতা, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং নিজের একাগ্রতা তাঁকে বারবার এগিয়ে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি পাওয়া যে কোনো গবেষকের জন্য একটি বড় অর্জন। আর এ অর্জন প্রমাণ করে, বাংলাদেশের তরুণরাও বিশ্বমানের গবেষণায় সমানভাবে অবদান রাখতে সক্ষম।
স্থানীয়দের গর্ব-
ফাহিমের সাফল্যে শ্রীমঙ্গলের মানুষ ভীষণ আনন্দিত। স্থানীয় শিক্ষক, সাংবাদিক ও তরুণ শিক্ষার্থীরা তাঁকে নিজেদের অনুপ্রেরণার প্রতীক মনে করছেন। তাঁর এই অর্জন শ্রীমঙ্গলবাসীর গর্ব। আগামী দিনে তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবেন।
একইভাবে তাঁর প্রাক্তন শিক্ষকরা মনে করেন, ফাহিমের সাফল্য দেখিয়ে দিল যে ছোট শহরের সীমাবদ্ধতা কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। যদি মেধা ও শ্রম থাকে, তবে বিশ্ব দরজা খুলে দেয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-
ফাহিমের স্বপ্ন শুধু গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান তাঁর কাজ বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য পথপ্রদর্শক হোক। ভবিষ্যতে দেশে ফিরে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নয়নে অবদান রাখার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তি কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে তিনি কাজ করতে চান।
এক অনুপ্রেরণার প্রতীক-
ফাহিমের যাত্রা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে—স্বপ্ন বড় হতে হবে, আর সেই স্বপ্ন পূরণে চাই ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম এবং একাগ্রতা। তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি শ্রীমঙ্গল তথা বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল গৌরবের বিষয়।
বাংলাদেশের অনেক তরুণ আজ বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখছে। ফাহিমের সাফল্য তাঁদের জন্য এক বাস্তব দৃষ্টান্ত। তাঁর মতো একজন গবেষকের পথচলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাহস যোগাবে নতুন দিগন্ত খোঁজার।
উপসংহার-
আজ যখন ফাহিম দূর আয়ারল্যান্ডে নতুন জীবনের পথে হাঁটছেন, তখন শ্রীমঙ্গলের মাটিতে তাঁর শিকড় অটুট। সেই শিকড় থেকেই তিনি শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন বৈশ্বিক গবেষণার পথে। তাঁর হাতে হয়তো একদিন গড়ে উঠবে এমন কোনো উদ্ভাবন, যা বদলে দেবে মানুষের জীবন। আর সেদিন শ্রীমঙ্গলের মানুষ বলবে গর্বভরে—“ও আমাদের সন্তান, আমাদের ফাহিম।”