সময়োচিত মুদ্রানীতি দরকার

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual7 Ad Code

 

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ:
কভিড-১৯ আসার পর আমাদের অর্থনীতি কতগুলো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। কর্মহীন মানুষ বেড়েছে, মানুষের আয় কমে গেছে, উত্পাদন কমে গেছে, রপ্তানি কমে গেছে। অর্থনীতির সব খাতই কমবেশি নিম্নমুখী। শুধু রেমিট্যান্স একটু বেড়েছে। আর রপ্তানিও কিছুটা বেড়েছে। এটা বড় ধরনের ইতিবাচক কিছু নয়, বরং এটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের একটা সময়োচিত মুদ্রানীতি দরকার। সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে মুদ্রানীতি করাটাই হবে প্রধান কাজ।
কভিড-১৯ আসার আগেও আমাদের অর্থনীতিতে কতগুলো সমস্যা বিদ্যমান ছিল। ব্যাংকিং তথা আর্থিক খাতে নানা রকম অনিয়ম ও দুর্বলতা ছিল, পুঁজিবাজারে দুর্বলতা ছিল, কর্মসংস্থানের অভাব ছিল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কম হচ্ছিল। এসব কথা সবারই জানা। এর মধ্যে প্রবৃদ্ধি করে আমরা এর ওপর এত বেশি নজর দিয়েছি যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানুষের আয়বৃদ্ধি, আয়বৈষম্যের দিকে তেমন বিশেষ নজর দিইনি। এর মধ্যে মারাত্মক পরিস্থিতি হলো আয়বৈষম্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সম্পদবৈষম্যও বৃদ্ধি পাওয়া। কিছু মানুষের আয় এত বেশি বেড়েছে, বিশেষ করে ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্তের আয় যেভাবে বেড়েছে, নিচের দিকের মানুষের আয় সে অনুপাতে বাড়েনি। দিন দিন সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে কিছু মানুষের কাছে। রিয়েল এস্টেট থেকে শুরু করে জায়গা-জমি, বাড়ি-গাড়ি যা-ই দেখেন, এগুলোতে বৈষম্যটা প্রকট হয়েছে। এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটা কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এ অবস্থায় আগের সমস্যাগুলোর যেমন মোকাবেলা করতে হবে, তেমনি এখন কভিডের কারণে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেটারও মোকাবেলা করতে হবে। আগের সমস্যাগুলোর সঙ্গে বর্তমান সমস্যাগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতএব বাংলাদেশ ব্যাংক যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে, সেটাকে একেবারে বাস্তবভিত্তিক (প্রেগমেটিক) ও বাস্তবায়ন উপযোগী করে করতে হবে।
আরেকটা বিষয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন যেভাবে একবর্ষ মুদ্রানীতি দিচ্ছে, আমি মনে করি, সেটা সঠিক নয়। এর যৌক্তিক কোনো কারণ আমি দেখি না। আমার সময়ে দেশে ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম মুদ্রানীতি চালু হয়। সেটা ছিল ছয় মাসের। এটাই চলে আসছিল। কিন্তু গতবার এটা হঠাৎ করেই একবর্ষ হয়ে গেল। আমরা ছয় মাস করেছিলাম, যাতে বুঝতে পারি অর্থনীতির গতি কোন দিকে যাচ্ছে, কী পরিবর্তন হচ্ছে। আপনি এক বছরের জন্য করে বসে থাকলেন এবং এক বছর পর আপনি দেখলেন এটা যথাযথ হয়নি কিংবা মাঝেমধ্যে সার্কুলার দিয়ে বা নির্দেশ দিয়ে পরিবর্তন আনছেন, এটা ঠিক হচ্ছে না। আমি মনে করি, যেকোনো কর্মকাণ্ড বা প্রকল্পগুলো ছয় মাস পর পর পর্যালোচনা করে দেখা উচিত। কোথায় ভুল হয়েছে তা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
এখন নানা পরিবর্তন হচ্ছে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ খাতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। লোকজনের সক্ষমতা, কাজে যোগদান করতে পারবে কি না, রপ্তানির পরিস্থিতি, ক্রয়ক্ষমতা কেমন দাঁড়ায় সেটা আমরা জানি না। রেমিট্যান্স হালে বেশি হয়েছে, আগামী মাসগুলোতে কেমন হবে জানি না। ফলে এসব জিনিস নিয়ে কিন্তু আপনি নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে পারবেন না। এগুলো খুব স্বল্প সময়ে পরিবর্তিত হয়। ফলে এসব বিষয় প্রক্ষেপণ (প্রজেকশন) করা খুবই কঠিন। যা হোক, আমি মনে করি, এক বছরের করলেও এটা যেন ছয় মাস পর রিভিউ করা হয়। আর বাজেটের মতো মুদ্রানীতি এক বছরের হতে হবে—এর তো কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা নেই।
এখন মুদ্রানীতির প্রেক্ষাপটটা হলো, সরকার যে রাজস্বনীতি বা বাজেট দিয়েছে, সেটাকে সম্প্রসারণমূলক করেছে। সরকারি খরচ (পাবলিক এক্সপেন্ডিচার) বাড়ানোর প্রয়োজনও আছে। তাই মুদ্রানীতিটা যেন আগের মতো সংকোচনমূলক না হয়। আমি মনে করি, এবারের মুদ্রানীতি সম্প্রসারণমূলক করা দরকার। কারণ এখানে অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনরর্থায়নকৃত প্রকল্পগুলোর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে এবং ব্যাংকগুলোর তারল্য বাড়াতে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াচ্ছে (মানি ক্রিয়েট করতে সহায়ক হচ্ছে)। অতএব মুদ্রানীতিটা যেন সম্প্রসারণমূলক হয়।
নতুন মুদ্রানীতিতে প্রথম গুরুত্বটা দিতে হবে, কর্মসংস্থানটা যেন আমরা বাড়াতে পারি। দিন দিন আয়ের উৎস কমে যাচ্ছে। অতএব কর্মসংস্থান বাড়ানোর ফোকাসটা মুদ্রানীতিতে থাকতে হবে। বড় বড় শিল্প, রপ্তানি—এগুলো থাকবেই। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজে জোর দিতে হবে। কারণ এগুলো শ্রমনিবিড় এবং দেশীয় পণ্য উত্পাদনের পাশাপাশি এদের অনেকে আবার রপ্তানিও করে। তাই তাদের রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানোর জন্য তাদের সহায়তা দেওয়া উচিত মুদ্রানীতিতে।
দেখা গেছে, এই খাতে প্যাকেজের ২০ হাজার কোটির মধ্যে ৫০ বা ৬০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে মুদ্রানীতি কোনো কাজে লাগবে না—যতই আপনি ঘোষণা করেন। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিন্তু এরই মধ্যে প্রণোদনার টাকা পেয়ে যাচ্ছে। গার্মেন্ট কারখানাগুলো তো পাঁচ হাজার কোটি টাকা নিয়ে শেষই করে ফেলেছে। তাই মুদ্রানীতি যদি সংকোচনমূলক হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ক্ষুদ্র শিল্পগুলো। টাকা কমে গেলে কিন্তু ব্যাংকগুলো ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দেবে না। এমনিতেই তাদের টাকা দিতে চায় না। অতএব এই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। দেশীয় উত্পাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণেও জোর দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মুদ্রানীতি করতে গিয়ে দেখা দরকার যে প্রাইভেট সেক্টরে ক্রেডিট গ্রোথ (ঋণ বিতরণ) ৭-৮ শতাংশে নেমে গেছে। আমি মনে করি, এটা ন্যূনতম ১২-১৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এখন আপনি যদি প্রাইভেট সেক্টরে ক্রেডিট গ্রোথ না বাড়ান, তাহলে ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, পাবলিক সেক্টরে ক্রেডিট গ্রোথ প্রচুর—১৮-১৯ শতাংশ, যেটা সরকারের বড় বড় প্রকল্পে যাচ্ছে। তাই প্রাইভেট খাতে ক্রেডিট গ্রোথ না বাড়ালে ইনভেস্টমেন্ট হবে না।
মুদ্রানীতিতে আরেকটা দিক দেখতে হবে যে এটা যেন কতগুলো টার্গেটে সীমাবদ্ধ না থাকে; যেমন—রিজার্ভ মানি, ব্যাপক মুদ্রা (ব্রড মানি), মুদ্রাস্ফীতির হার এসবের জন্য গাণিতিক (Nominal) টার্গেট রাখলে হবে না। বরং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, বিশেষ করে কভিডোত্তর যে প্যাকেজগুলো আছে, যে কৌশলগুলো নেওয়া হয়েছে, সেদিকে নজরদারি করতে হবে।
মুদ্রানীতির প্রভাবটা তাত্ক্ষণিক হয় না, সময় লাগে। কারণ রাজস্বনীতি বা ট্যাক্স বাড়ালে আপনি সঙ্গে সঙ্গে এটা টের পান। কিন্তু মুদ্রানীতির প্রভাব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাজার, ব্যবসা ইত্যাদির মাধ্যমে একটু সময় নিয়ে দৃশ্যমান হয়। কারণ এটা ব্যাংককে প্রভাবিত করে। ঋণে প্রভাব ফেলে এবং তারপর উত্পাদনে প্রভাব ফেলে। অতএব বিলম্বিত প্রভাবের একটা ঘাটতি যখন আছে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোও যদি বিলম্বিত পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মুদ্রানীতির গুরুত্বটা থাকবে না।
আর্থিক খাতের একটা বিশেষ অঙ্গ হচ্ছে ‘বৈদেশিক মুদ্রা’ বাজার। বেশ কিছুদিন ধরেই আমাদের টাকার মান অন্যান্য মুদ্রার (বিশেষ করে মার্কিন ডলার) তুলনায় কিছুটা অবমূল্যায়িত হচ্ছে। কিন্তু সেই মূল্যটাও বাজারের চাহিদা-সরবরাহে প্রতিফলিত হচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক এই মুদ্রাবাজারকে কিছুটা প্রভাবিত করছে। এখন সময় এসেছে রপ্তানি ও আমদানির ওপর প্রভাব বিবেচনা করে মুদ্রা বিনিময় হার এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিষয়ে মুদ্রানীতিতে কিছু কৌশল ও পদক্ষেপ সন্নিবেশিত করার।
আর কতগুলো বিষয় আসা উচিত, সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য মুদ্রাস্ফীতির একটা চ্যালেঞ্জ থাকে। প্রচলিত ধারণা হলো, মুদ্রানীতি সম্প্রসারণশীল হলে মূল্যস্ফীতি ঘটতে পারে। কিন্তু আমাদের এখন গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ। এটা মোটামুটি সহনীয়। খেয়াল রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যেন মুদ্রানীতিকে সংকোচনশীল করে না ফেলি। এখন সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি করা হলে টাকাটা যদি উত্পাদনশীল খাতে যায়, উত্পাদন বাড়ে, বাজারে যদি উত্পাদিত পণ্য ও সেবা আসে, তাহলে টাকা বাড়লেও কিন্তু মূল্যস্ফীতি হবে না। কারণ তখন টাকার সরবরাহ, ক্রয়ক্ষমতা ও উত্পাদন পরস্পরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে। মুদ্রানীতি যেন বাজার চাহিদাকে উজ্জীবিত করতে পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। সুতরাং একই সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও চাহিদা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।
কৃষি খাতও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ফসল নয়, পশু পালন, পোল্ট্রি এবং মত্স্য খামারও এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। মুদ্রানীতিতে কৃষি প্রক্রিয়াকরণেও মনোযোগ দিতে হবে। সেখানে কৃষির উন্নয়নের সঙ্গে আত্মকর্মসংস্থান যেন বাড়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে আত্মকর্মসংস্থানে জোর দিতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যারা আছে তারা কিন্তু ঋণ পায় না সাধারণত। প্রণোদনা প্যাকেজেও তারা নেই। এখন সময় এসেছে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে জোর দেওয়ার। বাংলাদেশ ব্যাংক যুবক এবং উৎসাহী উদ্যোক্তাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য পুনরর্থায়ন তহবিল তৈরি করতে পারে। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখনো এদিকে বিশেষ সেবা ও প্রডাক্ট নিয়ে আসেনি।
মোটকথা এবারের মুদ্রানীতি যেন গতানুগতিক না হয়। দুঃখের বিষয়, এবারের বাজেটটা গতানুগতিক হয়ে গেছে। বাজেট যেভাবে গতানুগতিক হয়েছে, মুদ্রানীতিটা যেন গতানুগতিক না হয়। আমাদের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা, অর্থনীতিকে সচল রাখা, আয়বৈষম্য দূর করা, নির্দিষ্ট গৎ এবং ধারণার বাইরে অর্থাৎ heterodox মুদ্রানীতি যেন হয়। কর্মসংস্থান বাড়ানো, বহির্বাণিজ্য বাড়িয়ে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা যায় এমন সহায়ক মুদ্রানীতি দরকার। মনে রাখতে হবে, মুদ্রানীতি একা কিছু করতে পারে না; এর সঙ্গে রাজস্বনীতিও জড়িত। অতএব মুদ্রানীতি যেন প্রকৃত সহায়ক ভূমিকা রাখে।
লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
অনুলিখন : আফছার আহমেদ
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code