সময় অসময় ১৭

লেখক:
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual6 Ad Code

মীর লিয়াকত::

Manual1 Ad Code

বাঙালী ও বাংলাভাষাভাষীদের মধ্যে কবি নজরুল এক অনন্য চেতনার নাম। নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। নজরুল চর্চা ও নজরুলের চেতনা আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে অটুট করে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে  নজরুলকে যেন আমরা বড় দায়সাড়া ভাবে দেখছি। তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন উদযাপন চাড়া তেমন আর কিছুই চোখে পড়ে না। যতোটুকু করা হচ্ছে তাও মনে হয় যথার্থ আন্তরিকতার সাথে হচ্ছে না। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। চেতনার কবি নজরুলকে চেতনায় স্থান দিতে হবে।
বলা হয়ে থাকে নয়টি মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু মনেপ্রানে মুল যুদ্ধ শুরু হয়েছিল কয়েকযুগ আগে থেকে। বায়াহ্নের ভাষাকাড়া আন্দোলন হয়ে উনষত্তরের গণআন্দোলন পর্যন্ত এ সংগ্রাম ছিল অব্যাহত। প্রথম থেকেই এ সংগ্রামে নজরুলের গান ও কবিতা যুগান্তকারী প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে। একটি জাতিতে চেতনাবোধে জাগরিত করে তোলার এ অনুভূতি অবিস্মরনীয়।
অবহেলা বঞ্চনার এক অবনর্নীয় সময়ে কবি নজরুলের জন্ম। শেকল ভাঙ্গার গান নিয়েই নজরুলের শুরু। ইংলিশ বেনিয়ারা বাঙ্গালীদের দমন করে রাখার জন্য যে বিষদৃশ আইন করেছিল তার সমুল উচ্ছেদ চেয়েছেন বিদ্রোহী কবি। গেয়েছেন মানুষের জয়গান। নতুন পথে আহŸান জানিয়েছেন যাত্রা শুরুর।
‘নতুন পথের যাত্রা পাথিক চালাও অভিযান,
উচ্চকন্ঠে উচ্চারো আজ মানুষ মহীয়ান’।
এরপর আবার বলেছেন
‘চারিদিকে আজ ভীরুর মেলা
খেলবি যে আয় নতুন খেলা’
ওরে জোয়ার জলে ভাসিয়ে ভেলা
চারদিকে উচ্ছ¡ল’।
বাঙ্গালীর চেতনাকে সমুন্নত রাখতে নজরুলের কবিতা গান এমন একটি স্থান জুড়েছিল যে মনে হয়েছে এ যেন বাঙ্গালীদের সত্যিকারের মূলমন্ত্র। এই দুুর্নিবার মন্ত্রবলে নজরুল বাঙ্গালীর হৃদয়ে রবেন আজীবন অম্লান। অবিভক্ত ভারতে হিন্দু মুসলমানের বিভক্তিকে নজরুলই নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস পেয়েছেন। বলেছেন-
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন
কান্ডারী বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার’\

খালেদ আবার ধরিয়াছে আসি অর্জুন ছোড়ে বান
জেগেছে ভারত ধরিয়াছে লাটি হিন্দু মুসলমান।

Manual2 Ad Code

স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙ্গালীদের মধ্যে কোন বিভক্তি ছিল না। এ যুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-শিক্ষক সহ সর্বস্তরের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মাতৃভূমির স্বাধীনতার যুদ্ধে। শ্রমিকের গানে নজরুল বলেছেন-
‘ধ্বংস পথের যাত্রীদল
ধর হাতুড়ি তোল কাষে শাবল’।

নদী মাতৃক দেশে পাল তোলা, গুন টানা মাঝির ঘামের গন্ধও নজরুলকে আকৃষ্ট করে। নায়ের মাঝিদের প্রবিত্ত ছিল নজরুলের আমিয় প্রেরনা।
‘মাঝিরে তোর না নাও ভাসিয়ে মাটির বুকে চল
শক্ত মাটির ঘায়ে উঠুক রক্ত পদতল’।

Manual3 Ad Code

আবার জেলেদের প্রতিও তার মমত্ববোধ। জেলেরা যাতে নিজেদের অধম মনে না করে তাই তাদের জন্য নজরুল ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত।
‘নীচে পড়ে রইব না আর শুনরে ও ভাই জেলে
এবার উঠবোরে সব ঠেলে’।
সাধারন কুলি বলে সবাই তাদের ঘৃণা করে। অথচ নজরুল সেই কুলিদের জন্য দরদী হয়েছেন। তাদের দুঃখবোধকে শব্দের গাথুনিতে তুলে ধরেছেন। দুর্বলের প্রতি হয়েছেন সহানুভূতিশীল।
‘দেখিনু সেদিন রেলে
কুলি বলে এক বাবুসাব তারে
ঠেলে দিল নীচে ফেলে
চোখ ফেটে এলো জল
এমনি করিয়া জগৎ জুড়িয়া
মার খাবে দুর্বল’।
চাষীরা তাদের ঘাম শ্রম দিয়ে ফসল তুলে আনে। জীবন ধারনের জন্য আমরা সবাই সেই ফসলের মাধ্যমেই বাঁচি। সর্বহারা এসব কৃষকদের তিনি যুগিয়েছেন প্রেরনা।
‘ওঠরে চাষী জগৎবাসী ধর কষে লাঙ্গল
আমরা মরতে আছি ভাল করে মরবো এবার চল’।

ছাত্ররাই ভবিষ্যতের মূল শক্তি। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন-
‘আমরা শক্তি আমরা বল
মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান
উর্ধে বিমান ঝড় বাদল
আমরা ছাত্রদল’।

Manual3 Ad Code

কারনে অকারনে শোষক শ্রেনী শোষিতের রক্তে গোসল করেছে। এখানে বন্দীদের সংখ্যা শুধু বেড়েই চলতো। নজরুল সেই বন্দীদের মুক্তির জন্য শব্দের আগুন জ্বেলেছেন।
‘যত অত্যাচারী যত বজ্রহানি
হাঁকে নিপীড়িত জনমন মথিত বানী
নব জনম লভি অভিনব ধরনী
ওরে ঐ আগত\
জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যতো
জগতের লাঞ্চিত ভাগ্যহত\
এই আগুন শব্দের দহনে শোষক আরো জ্বলে ওঠে নানাভাবে বস্যতা স্বীকার করানোর চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু কবির শ্বাসত বিদ্রোহী কন্ঠ-এখানে ঝংকৃত হয়ে ওঠে।
‘আমি বেদুইন আমি চেঙ্গিস
আমি আপনারে ছাড়া করিনে কাহারে কুর্নিশ।

আর সহ্য হলো না শোষক সরকারের। কবিকে নিক্ষেপ করলো ওরা কারাগারের প্রকোষ্টে। কারারুদ্ধ হলেও রুদ্ধ হলো না তার কন্ঠ। সাথে সাথে তার কন্ঠে ঝংকৃত হলো-
‘কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট
রক্ত জমাট শেকল পূজার পাষান ভেদী
ওরে ও তরুন ঈষাণ বাজা তোর প্রলয় বিষান
রক্তনিশান উড়–ক কারার
প্রাচীর ভেদী \
…ওরে ও পাগলা ভোলা দেরে দে প্রলয়দোলা
গরাদগুলা জোরসে ধরে হেঁচকা টানে
মার হাঁক হায়দরী হাঁক…
নাচে ঐ কালবোশেখি কাটাবে কাল বসে কি
দেরে দে ঐ ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি
লাথি মার ভাঙ্গরে তালা যত সব বন্দীশালা
আগুন জ্বালা আগুন জ্বালা
ফেল উপাড়ি \
অপর স্থানে বলেছেন,
‘শিকল পরা ছল
মোদের এ শিকল পরা ছল
এ শিকল পরে শিকল তোদের
করবরে বিকল’।
অত্যাচারী বৃটিশ বেনিয়াদের শোষনের কীর্তি দেখেছেন স্বচক্ষে এই বিদ্রোহী কবি। ফুঁসে উঠে বলেছেন,
‘এদেশ ছাড়বি কিনা বল
নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রনাঙ্গনে তার
‘চল্ চল্ চল ্
উর্দ্ধগগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণীতল
অরুনপ্রাতের তরুন দল
চলরে চল্।
ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত
আমরা আনিব রাঙ্গা প্রভাত
আমরা টুটাবো তিমির রাত
বাঁধার বিন্ধ্যাচল \
গানটি যোদ্ধাদের জন্যে সবচেয়ে বড় উজ্জীবনি হাতিয়ার। যেমন রনাঙ্গনে তেমনি অনুশীলনে সবখানে। রনসঙ্গীত হিসাবে এ গানটি এখন বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। স্বাধীনতা লাভের পর
আজ সৃৃষ্টি সুখের উল­াসে
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে
মোর টগবগিয়ে খুন হাসে \
এই গানটি দেশ গড়ার মন্ত্র সঙ্গীত হিসাবে অনুপ্রেরনা যোগায়। সোনার বাংলা পাক বর্বর বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হবার পর বাংলার অন্ধকার আকাশে রক্তিম সূর্য জেগে উঠে সোনালী থালার মতো। নজরুলের সেই অমৃত সুরই ভেসে ওঠে সমগ্র দেশজুড়ে।
এমনি অসংখ্য গান-
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ঐ নতুনের কেতন ওড়ে
কালবোশেখির ঝড় \
আসছে এবার অনাগত
প্রলয় নেশায় নৃত্যপাগল
সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে
ধমক হেনে ভাঙলো আগল
মৃত্যু গহন অন্ধকুপে
মহাকালের চন্ডীরূপে ধুম্রধুপে
বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে
আসছে ভয়ংকর
ওরে ঐ আসছে ভয়ংকর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর \
যদি বলা হয় বাংলা স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে যে সব স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তার একটি নজরুলের উজ্জীবনী প্রেরনা ও উপলব্দি থাকলে কি অতিশেয়াক্তি হবে? নিশ্চই না। তার কারন বাঙ্গালীর মনের সুপ্তবাসনাকে জাগিয়ে তুলতে নজরুলের অবিনাশী  গান কবিতা অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল।
‘মহাবিদ্রোহী রনক্লান্ত
আমি সেই দিন হবো শান্ত
যেদিন উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল
আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপান
ভীমরনভূমে রনিবে না’

আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব
ভিন্ন
আমি ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ
চিহ্ন!
সেই কবির শব্দ পুঞ্জই কালের পর কাল আমাদের উজ্জীবিত হতে শিখিয়েছে। যার ফলশ্র“তিতে দু’শ বছরের জঞ্জাল ও সর্বশেষ পাক বাহিনীর খড়গ থেকে আমরা আজ স্বাধীনতা অর্জন করেছি।
দেশের স্বাধীনতার উষালগ্নে  ১৯৭৫ সালের প্রথম ভাগে ধানমন্ডিতে কবি নজরুলকে কাছে থেকে দেখার ও তার সামনে গান করার বিরল সুযোগ হয়েছিলো আমার।
১৯৭৫ সাল। কবি তখন ঢাকায়।এ সময় অসুস্থ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকায় তার ধানমণ্ডির বাসভবনে। কবি নজরুলের কাছে বসে কবিকে নজরুল গীতি শোনানোর স্মৃতিকথা জীবন যতোদিন আছে ততোদিন তা আমার ভুলে যাবার কথা নয়। তিনি প্রথমে শোয়া ছিলেনÑ পরে মোটা কোলবালিশ পাশে নিয়ে বসেছিলেন বিছানায়।  আর আমরা যারা কাছে বসে গান করেছিলাম তারা মেঝের শীতলপাটির ওপর বিছানো চাদরে। দর্শনপ্রার্থীদের বলা হয়েছিলো যদি কেউ গান করতে পারেন তাহলে কবি বসবেনÑ অন্যথায় তিনি শুয়ে থাকবেন। আমরা যারা ছিলাম তাদের মধ্যে আমার মতো কয়েকজনই গাইলেন। আমি তখন বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে (ওয়াইজঘাটের বাফায়) উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের শিক্ষার্থী ছিলাম। নজরুলগীতির অসামান্য প্রতিভা বেদারউদ্দিন আহমদ ছিলেন আমাদের (বাফা’র) তৎকালীন অধ্যক্ষ। সেখানে আমি ওস্তাদ শাহজালাল ঈমনীর কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখতাম।
কবির পাশে বসে গেয়েছিলাম ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ এবং ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি।’ এ সময় খিলখিল কাজী সহ কবি পরিবারের কয়েকজন ও অপর দুজন শিল্পীও ছিলেন। অপ্রকৃতিস্থ হলেও কবি গান শুনে আমার গানের ডায়েরীটা হাতে নিয়ে (সেই স্পর্শ-স্মৃতির ডায়েরীটা আজো আমি আমার সংগ্রহে রেখেছি) উল্টে পাল্টে দেখেন এবং ঠোঁট দিয়ে কী যেন বলতে চেষ্টা করেন। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট শব্দ করেন। কিন্তু তখন তো আর কবির কন্ঠে শব্দ নেইÑ Ñনি:শব্দে চোখ বড় বড় করে তাকাতেন সেই শেকল ভাঙ্গার গানের কবি। ফুলের জলসায় নীরব কবির এ অভিব্যক্তি প্রকাশের স্মৃতি আমার জীবনে থাকবে চির অটুট।
স্বাধীনতা আমাদের অহংকারÑ আর বিদ্রোহী কবি নজরুল সেই অহংকারের চেতনাবোধÑ আমাদের সারা জাতির গর্বের ধন! যুগে যুগে কালে কালে এই অমর কবি বেঁচে রইবেন বাঙ্গালীর মন ও মননেÑ সকলের মর্মের বাঁধনে!
তবে একটি অপ্রিয় সত্য কথা বলতেই হয়, আমার মনে হয় জাতীয়ভাবে জাতীয় কবির যে মর্যাদা যে মূল্যায়ন প্রয়োজন তা সত্যিই বড় অপ্রতুল। দেশ জুড়ে নজরুল চর্চাকে আরো বেশি বৃদ্ধি করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের ঊষালগ্নে কবিকে বাংলাদেশে এনে যে মর্যাদা দিয়েছিলেন তা অবশ্যই আমাদের ধরে রাখতে হবে। এখন যে তাঁকে মর্যাদা দেয়া হচ্ছে না তা ঠিক নয়। কিন্তু তা যেন দায়সাড়া গোছের। আন্তরিকভাবে নজরুলের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তুলে ধরতে হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code