সীমান্তে ভাঙলো পরিবার, দুধের সন্তানকে রেখেই চলে যেতে হলো মাকে

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Manual7 Ad Code

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

Manual5 Ad Code

ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে এক হৃদয়বিদারক বিদায়ের দৃশ্য। করাচির সায়রা, কালো বোরখায় মুখ ঢাকা, স্বামী ফারহানের হাত ধরে যেন শেষবারের মতো আঁকড়ে ধরেছিলেন তার স্বপ্নগুলোকে। কোলে তাদের নয় মাস বয়সী শিশু আজলান। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- এক মুহূর্তেই তাদের পরিবারটি সীমান্তের ব্যারিকেড আর পাসপোর্টের রঙের কাছে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো।

Manual5 Ad Code

সম্প্রতি ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামের হামলার পর ভারত সরকার পাকিস্তানি নাগরিকদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নয়াদিল্লি থেকে আটারি-ওয়াঘা সীমান্তে পৌঁছান সায়রা ও ফারহান। কিন্তু সীমান্তে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।

ছোট্ট শিশু আজলানের পাসপোর্ট ছিল নীল রঙের, অর্থাৎ ভারতীয়। সায়রার ছিল সবুজ, পাকিস্তানি। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা জানিয়ে দেন, শিশুটি যেতে পারবে না। মায়ের বুকের দুধে অভ্যস্ত আজলান তখন বাবার কোলে, মা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পথে।

সায়রা ও ফারহানের প্রেমের শুরু হয়েছিল তিন বছর আগে ফেসবুকে। ভার্চুয়াল প্রেম বাস্তবে বিবাহে রূপ নেয়। সায়রা তখন পাড়ি জমান দিল্লিতে। আমার জীবন, আমার পৃথিবী, সব কিছুই বদলে গিয়েছিল, বলছিলেন ফারহান।

সীমান্তে বাচ্চার বোতল নিয়ে প্লেনের মতো করে খেলা করে আজলানকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন ফারহান। কিন্তু শিশুটি বোতল চায় না, সে মায়ের স্পর্শ চায়। ফারহানের বোন নুরীন বলছিলেন, দুই দেশের এই যুদ্ধের মাঝে আমাদের নির্দোষ সন্তানগুলো বন্দী হয়ে গেছে। একজন মা জানে, ৯ মাসের শিশুকে ফেলে রেখে যাওয়ার যন্ত্রণা কেমন।

একসময় ভারতীয় রক্ষীরা ফারহানকে ডেকে নেন, মনে হচ্ছিল মানবিকতা জিতে গেছে। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর ফারহান ফিরে আসেন, চোখে জল, কোলে ক্লান্ত আজলান। সায়রা সীমান্ত পার হওয়ার আগমুহূর্তে মূর্ছা যান। কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর কান্না থামছিল না। একপর্যায়ে শেষবারের মতো একত্রিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় তাদের।

Manual7 Ad Code

এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা শুধু সায়রা-ফারহানের নয়। এদিনই করাচির হালিমা বেগম, যিনি ২৫ বছর আগে ভারতের ওড়িশায় বিয়ে করে এসেছিলেন, তাকেও দেশ ছাড়তে বলা হয়। তার স্বামী বহু আগেই মারা গেছেন। দুই ছেলে- ২২ বছরের মুসাইব ও ১৬ বছরের জুবায়ের- তাকে একা ছাড়তে রাজি হননি। কিন্তু তাদের পাসপোর্ট ভারতীয় হওয়ায় তারা মায়ের সঙ্গে যেতে পারলেন না। তিনি কখনো একা ভ্রমণ করেননি, বলেন মুসাইব। আমার মা কোথায় যাবেন? ওখানে তো তার বাড়িও নেই।

সীমান্তে দাঁড়িয়ে হালিমা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ২৫ বছর পর যদি আমাকে এইভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে এই দেশ কি আমার নয়?

‘মিডনাইটস বর্ডারস’ বইয়ের লেখিকা সুচিত্রা বিজয়ন বলেন, এই উপমহাদেশে এমন বেদনার গল্প অগণিত। বিশেষ করে পাকিস্তানি বা ভারতীয় মুসলিম নারীরা, যারা বিয়ের পর অন্য দেশে যান, তাদের জন্য এই সীমান্ত মানেই চিরদিনের অনিশ্চয়তা।

সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বের কারণে এরই মধ্যে দুই দেশ ৭৫০ পাকিস্তানি ও ১ হাজার ভারতীয়কে নিজ নিজ দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। চিকিৎসার জন্য আসা প্রবীণ রোগী, বিয়েতে অংশ নিতে আসা দুই বোন, এমনকি দুই দশক পর মায়ের বাড়ি আসা একজন নারী- সবাইকে ফিরতে হয়েছে হঠাৎ করে।

দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার শিকার এই পরিবারগুলো প্রেম, বিয়ে, সন্তানের মাতৃত্ব- সব কিছু হারিয়ে ফেলছে কেবল একটি সীমারেখার কারণে। আর সেখানে সবচেয়ে বেশি ভুগছে নিষ্পাপ শিশুরা, যাদের কোনো দেশ নেই, আছে শুধু অভিভাবকদের ভালোবাসা।

Manual5 Ad Code

ডেস্ক: আর

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code