

তাবারক হোসেন আজাদ, লক্ষ্মীপুর ঃ
ঝরে যাওয়া সুপারির পাতা (খোল) দিয়ে পরিবেশ বান্ধব বাসন, ট্রে ও বাটিসহ নানা প্রকার তৈজসপত্র তৈরি করা যায় তা কখনো ভাবতে পারে নি কেউ। অথচ গ্রামের রাস্তায় ও বাগানে সুপারির গাছের পাতা (খোল) দেখেননি এমন লোক হয়তো খুঁজে পাওয়া যেত না। ওই খোল কুড়িয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন গ্রামের নারীরা। আর এ খোল দিয়েই পন্য তৈরি করা যায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন মামুনুর রশিদ নামে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের উদ্যোক্তা। তিনি খোল দিয়ে পরিবেশ বান্ধব বাসন, ট্রে ও বাটিসহ নানা রকম তৈজসপত্র তৈরি করছেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের মামুনুর রশিদ। কোনো ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য ছাড়া তৈরি করা পণ্যগুলো ক্রমেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে পুরো জেলা জুড়ে। সম্প্রতি উদ্যোক্তা মামুন তার কারখানায় তৈরি করা কয়েকটি পন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করেন।
এই উদ্যোক্তা মো. মামুনুর রশিদের সাথে কথা হয়। তিনি জানান, রায়পুর এলএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে এসএসসি, ১৯৮৫ সালে রায়পুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৯১ সালে ঢাকা তেঁজগাও কলেজ থেকে ¯œাতক পাস করেন। বর্তমানে তিনি এস্যানসিয়াল ড্রাগ্স এর প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। চাকুরী ছাড়া অন্য কিছু করা যায় কিনা তা নিয়ে পরিবারের সাথে আলোচনা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে স্ত্রীর উৎসাহে ২০১৫ সালে ইউটিউবে দেখে ঝরে যাওয়া সুপারির পাতা (খোল) দিয়ে অসাধারণ পন্য তৈরি করা যায়। এই সূত্র ধরে তিনি সাপ্তাহিক ছুটির দু’দিন গ্রামের বাড়িতে এসে সুপারির খোল খোঁজ করতে থাকেন।
এক পর্যায়ে তার অনুসারী কয়েকজন যুবক নিয়ে সুপারির খোল সংগ্রহ করেন। পরে তার বাড়ীর পাশে রায়পুর-মীরগঞ্জ সড়কের তুলাতলি নামকস্থানে সুপারির পাতা দিয়ে বিভিন্ন রকমের বাসন তৈরির কারখানা স্থাপন করেন মামুন। পরে তার কারখানার প্রথম তৈরি করা বাসন তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করেন। চলতি বছরে নিউজিল্যান্ড থেকে জেরিক নামে একজন ভায়ার এসে পণ্য দেখে সস্তোষ প্রকাশ করেন।
উদ্যোক্তা মামুনুর রশিদ আরো জানান, ঝরে যাওয়া পাতা দিয়ে শতভাগ পরিবেশ বান্ধব পণ্য শুধু আমার আয়ের উৎস হবে না তার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে। এক সময় প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে মানুষ এই পণ্য ব্যবহার করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আর এটি শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।
পুঁজির সংকটতো আছেই। তবুও কারখানা বড় করার কাজও শুরু করেছি। অনলাইন মার্কেটিং এবং পরিচিতদের মধ্যে মার্কেটিং করছি। আগামীতে অনেক দূর যেতে চাই। এই পণ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আশাবাদী। ভবিষ্যতে বড় আকারে করতে চাই এবং পরিবেশ বান্ধব আরো কিছু পণ্য নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরের মার্কেটে কাজ করতে চাই। বর্তমানে জাপানের এক ভায়ারের সঙ্গে কথা চূড়ান্ত করেছি। তিনি কিছু পণ্য জাপানে নেবেন। এখন সুপারির পাতা নষ্ট হচ্ছে কিন্তু এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ বিক্রির উদ্দেশ্যেই সুপারির খোল বাগান থেকে ঘরে এনে রাখবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে কারখানাটিতে ১২ জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। সরকারি আর্থীক সহায়তা পেলে কারখানার উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। এ কারখানায় সাত ধরনের প্লেট, বাটি ও ট্রে উৎপাদন হচ্ছে। তৈরি হওয়ায় এই সাত পণ্য পরিবেশ বান্ধব হচ্ছে মামুনের কারখানায়। সামনে সুপারির খোলের আরো নতুন ধরনের আরও পণ্য তৈরি করার প্রক্রিয়া নিয়েছেন।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরীন চৌধুরী জানান, ঝরে যাওয়া সুপারি গাছের পাতা দিয়ে পন্য তৈরি করে ব্যপক প্রশংসিত হয়েছেন উদ্যোক্তা মামুনুর রশিদ। তার এসব কাজে আমি আনন্দিত। বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক আকারে সুপারি উৎপাদিত হয়, কিন্তু সঠিক ব্যবহারের অভাবে এর পাতা (খোল) বিনষ্ট বা সাধারণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।