

স্টাফ রিপোর্টঃ
আর মাত্র ৩ দিন বাকি পবিত্র ঈদুল আজহার। অথচ এখনও জমে ওঠেনি ঈদের বাজার। করোনার ভয়াল থাবা গ্রাস করেছে সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্য। গত কয়েক ঈদেও সিলেটের ব্যবসায়ীদের ব্যবসা জমেনি। বিপরীতে ব্যবসায়ীদের দেনা বাড়ছে। অনেকেই ব্যবসার পুঁজি হারানোর পথে। এবার সামনে কোরবানি ঈদ। তবুও ব্যবসায়ীরা আশায় ছিলেন। যেহেতু গত রমজানের ঈদে করোনার কারণে বেচা-কেনা কম হয়েছে, তাই এই ঈদে কোরবানির পশুর পাশাপাশি অনেকে জামা-কাপড় কিনবেন- এমনটাই প্রত্যাশা করেছিলেন সিলেটের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তারা হতাশ।
সিলেটের মধুবন সুপার মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, দোকান খুলে বসে আছেন ব্যবসায়ীরা, কিন্তু ক্রেতা নেই। যদিও মাঝে-মধ্যে দুই-একজন ক্রেতা আসেন, তবে তারা শুধু দেখেই চলে যাচ্ছেন।
এ সময় কথা হয় মধুবন সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী ইসহাক আলমের সাথে। তিনি বলেন, সিলেটের ব্যবসায়ীরা লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে আজ হতাশায়। ব্যবসায়ীরা সারা বছর ধরে অপেক্ষায় থাকেন ঈদ-পূজায় একটু ব্যবসা হবে, বেচা-কেনা বাড়বে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে গত দুই বছর থেকে ঠিকমতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাচ্ছে না। সরকার ঈদের সময় প্রতিষ্ঠান খুলে দিলেও ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সিটি কর্পোরেশনের ইউটিলিটি বিল, মার্কেটের সার্ভিস চার্জ সারা বছর ধরে দিয়ে আসছি। কিন্তু ব্যবসা হয় না। এখন পুঁজি হারানোর পথে আমরা। সরকারের উচিত দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখেতে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া।
তিনি আরও বলেন, অতীতে পৃথিবীতে মহামারি আরও এসেছে। বর্তমানে মহামারি করোনাভাইরাস তার তাণ্ডব চালাচ্ছে। ভবিষ্যতেও হয়তো আরও বহু মহামারি আসবে। তাই বলে তো জীবিকা বন্ধ করে দিলে চলবে না। দেশের অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে সচেতনতার মাধ্যমে মহামারিকে মোকাবেলা করতে হবে। সরকার এই মহামারিতে কি দেশের দুর্নীতি বন্ধ করতে পেরেছে? কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবিকার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।
নগরের জিন্দাবাজারের শুকরিয়া মার্কেটে ঈদের জামা-কাপড় ক্রয় করতে এসেছিলেন নগরীর সুবিদবাজার এলাকার ফাইজা জান্নাত। তিনি বলেন, ঈদ মানে খুশি। কিন্তু এবার মহামারির কারণে কারও মনে খুশি নেই। ঘরে ছোট ভাই-বোন আছে। তাদের জন্য বাধ্য হয়ে জামা-কাপড় কিনতে হয়। তারা তো অবুঝ। তারা এই মহামারির ভয়াল তাণ্ডব অনুভব করতে পারছে না। তাদের একটাই দাবি- ঈদ এসেছে, আমাদের নতুন জামা-কাপড় দিতে হবে। তবে চেষ্টা করছি যতটুকু সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাকাটা করার। অনেকেই দেখছি তা মানছেন না।
সিলেটে সিটি সেন্টারের ব্যবসায়ী রায়হান আহমদ বলেন, করোনার কারণে গত বছর থেকে ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে দোকানের ২ জন কর্মী ছাটাই করেছি। আগে ৪ জন কর্মচারী ছিল, এখন ২ জন আছে। এ মাসে দোকান ভাড়া আর কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কিভাবে দেবও সেই চিন্তায় আমি পেরেশান। এখন পর্যন্ত দোকানের কোনো মাল বিক্রি হওয়া তো দূরের কথা, কোনো কাস্টমারও আসেনি।
এ বিষয়ে সিলেটের মঈনউদ্দিন মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, অতিমারি করোনার কারণে মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষেরা চরম আর্থিক সংকটে ভুগছেন। যেখানে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকেই, সেখানে ঈদ শপিং তাদের নিকট হাস্যকর ব্যাপার। কিছু সরকারি চাকরিজীবী বা বিদেশ থেকে প্রাপ্ত টাকা যাদের আছে তারা হয়তো এবারের ঈদে কেনাকাটা করবেন। শুধু তাই নয়, এর প্রভাব পড়বে এবারের কোরবানিতেও।
আম্বরখানা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কুতুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, সরকার করোনা পরিস্থিতে দোকানপাট, শপিংমল খুলে দিয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসা করার। সমিতির পক্ষ থেকে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করা হচ্ছে। এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে যদি কোনোরকমে একটু ব্যবসা হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা বেঁচে থাকতে পারবেন। তা না হলে সিলেটের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। সরকারের প্রতি অনুরোধ, আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হোক।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েব বলেন, সিলেট চেম্বার অব কমার্স শুরু থেকে সিলেটের করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। করোনা মহামারি প্রতিরোধে এফবিসিসিআই’র উদ্যোগে ও সিলেট চেম্বারের সহযোগিতায় ব্যবসায়ী সমিতির মাধ্যমে মাস্ক বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। করোনা মোকাবেলায় সিলেট চেম্বারের পরিচালনা পরিষদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সিলেটের ব্যবসায়ীদের জন্য অনুদান দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সিলেটের ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো তহবিল সিলেট চেম্বারে নেই। যদি কোনো বড় তহবিল সংগ্রহ করা যায়, তাহলে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করা হবে।