১২ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জ হানাদার মুক্ত দিবস

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual6 Ad Code

 

Manual5 Ad Code

রবিউল কবির মনু, গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা):
আজ ১২ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জ হানাদার মুক্ত দিবস। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং এদেশীয় পাকিস্তানী দালালদের সৃষ্ট বিভীষিকাময় দিনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে শত্রুমুক্ত হয় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ট এ এলাকার গণমানুষ সম্মিলিতভাবে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন দেশের অন্যান্য এলাকার মতোই।
মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের উপর্যুপরি গেরিলা আক্রমণে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে চুড়ান্ত আঘাত আসে ১১ ডিসেম্বর ভোর রাতে। সেদিন হিলি, গাইবান্ধা, বোনারপাড়া এবং মহিমাগঞ্জ থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের ত্রিমুখী আক্রমণে গোবিন্দগঞ্জের রাখালবুরুজ ইউনিয়ন আর সাঘাটার কচুয়া ইউনিয়নের ত্রিমোহিনী এলাকায় সম্মুখযুদ্ধে প্রায় দুই শতাধিক পাকসেনা নিহত হয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে অনন্যোপায় হয়ে পাকসেনারা তাদের পোষাক পরিবর্তন করে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পড়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে যায়। ফলে চূড়ান্ত বিজয়ের চারদিন আগেই স্বাধীনতার স্বাদ পান এখানকার মুক্তিকামী মানুষ। সেদিনের এ বিজয়ের খবরে উচ্ছাস আর আনন্দে ফেটে পড়েছিল গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সকল মুক্তিকামী মানুষ।
মুক্তিযোদ্ধা মো: এন্তাজুর রহমান জানান, মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে গোবিন্দগঞ্জের অদূরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের করতোয়া নদীর উপরের কাটাখালী সেতুটি ধ্বংস করে পাকিস্তানী বাহিনীর রসদ ও যুদ্ধাস্ত্র বহনের যাত্রাপথ ধ্বংস করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে এখানকার ছাত্র-জনতা। ২৭ মার্চ সকালে শুরু হয় সেতু ভাঙ্গার কাজ। এ সময় রংপুরের দিক থেকে পাক বাহিনীর একটি কনভয় ছুটে আসে ব্রীজের কাছে। কনভয়টি পৌঁছেই এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে থাকে মুক্তিপাগল বাঙ্গালীর ওপর। এ সময় নিরস্ত্র বাঙ্গালী জনতা প্রাণভয়ে ছুটে পালাতে গেলে হানাদারের এলোপাতাড়ি গুলির আঘাতে শহীদ হন আব্দুল মান্নান আকন্দ, বাবলু মোহন্ত, বাবু দত্তসহ অজ্ঞাত পরিচয় এক কিশোর ও এক বৃদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরু সেদিন থেকেই এ জনপদে।
এরপর রেলপথ, সড়কপথ ও নদীপথের সহজলভ্যতার কারণে ভারতের আসাম প্রদেশের ‘মানকার চরে’ মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং এ যাবার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হয় মহিমাগঞ্জকে। এ কারণে পরবর্তীতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী মহিাগঞ্জে দুটি ক্যাম্প স্থাপন করে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আর তাদের ও এদেশীয় দালালদের সহায়তায় কাটাখালী সেতুর হাওয়াখানা, মহিমাগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা এবং রংপুর চিনিকলের অতিথি ভবনে স্থাপিত ক্যাম্পে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয় এখানকারসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধরে আনা শত শত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে। মহিমাগঞ্জের তিন বিশিষ্ট ব্যক্তি শহীদ এমাদ উদ্দিন আকন্দ, আব্দুল কাদের সরকার আর আব্দুস সোবহান আকন্দকে হত্যা করা হয় গোবিন্দগঞ্জ-মহিমাগঞ্জ সড়কের মালঞ্চা নামক স্থানে। এ জনপদের বিজয়ের আগের দিন দিন বিকেল বেলায় একদল রাজাকারের গুলিতে নিহত হন মহিমাগঞ্জ কর্মকারপাড়ার অমূল্য কর্মকার নামের এক যুবক। শহীদের পরিজনরা অভিযোগ করেছেন, ২০১৫ সালের এ দিনে স্থানীয় কর্মকারপাড়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া সড়কটির নামকরণ ‘শহীদ অমূল্য কর্মকার সড়ক’ করা হলেও আজও শহীদের তালিকায় ওঠেনি তার নাম।
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১১ ডিসেম্বর ভোর রাতে হিলি, গাইবান্ধা, বোনারপাড়া ও মহিমাগঞ্জ থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের ত্রিমুখী আক্রমণে প্রায় দুই শতাধিক পাকসেনা নিহত হয় ত্রিমোহিনীঘাট এলাকায়।
পরদিন ১২ ডিসেম্বর জয়বাংলা স্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে বিজয় আসে এ জনপদে। স্বাধীনতাকামী গণমানুষের বিপুল হর্ষধ্বনী আর মিছিলে মিছিলে বিজয়ের বার্তা জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও ছাত্র-জনতা গোবিন্দগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে সমবেত হয়ে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা উত্তালন করে। চুড়ান্ত বিজয়ের চার দিন আগেই হানাদার মুক্ত হয় তৎকালীন রংপুর জেলার প্রবেশদ্বার গোবিন্দগঞ্জ । এ বিজয়ের মাধ্যমে সম্পুুর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয় তৎকালীন গাইবান্ধা মহুকুমা।

Manual4 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code