শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার-৪) আসনের নির্বাচনী চিত্র: বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৮ মাস আগে

Manual1 Ad Code

সংগ্রাম দত্ত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসন সবসময়ই গুরুত্ব বহন করেছে। এটি একদিকে সিলেট বিভাগের চা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র, অন্যদিকে হিন্দু-সংখ্যালঘু ও চা-শ্রমিক ভোটারদের প্রভাবশালী উপস্থিতির কারণে নির্বাচনী সমীকরণ এখানে আলাদা রূপ নেয়। ইতিহাস বলছে, আওয়ামী লীগ বরাবরই এ আসনে প্রভাবশালী হলেও বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিবারই তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসন এখন বহুদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক অনিশ্চিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে।

ভোটার গঠন ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট-

মৌলভীবাজার-৪ আসন (আসন নং–২৩৮) কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলাকে নিয়ে গঠিত। প্রায় ৮৫১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ আসনে রয়েছে ১৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা।

দুটি উপজেলার নির্বাচন কর্মকর্তাদের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আসনটিতে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫,০৫,৮২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২,৪০,৬৭৬ জন, নারী ভোটার ২,৪১,৯০৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন। এ ছাড়া নতুনভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ২৩,২৩৯ জন।

নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ভোটার নিবন্ধনের কাজ এখনো চলমান রয়েছে। কাজ সম্পন্ন হলে চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার সংখ্যা আরও কিছুটা বাড়বে।

Manual8 Ad Code

 

 

 

 

চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠী-

মোট ভোটারের একটি বড় অংশ চা-বাগানের শ্রমিক। তাদের ভোট ঐতিহাসিকভাবে ‘ব্লক ভোট’ হিসেবে পরিচিত।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়-

প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা চায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন।

প্রধান ধারা গ্রামীণ ভোটার-

Manual5 Ad Code

কৃষক, দিনমজুর ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক ভিত্তিকে প্রভাবিত করে।

যিনি চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন, তাকেই জয়ী হওয়ার পথে এগিয়ে রাখবে।

নির্বাচনের ইতিহাস: ফলাফল ও বিশ্লেষণ-

১৯৯১ (৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন):
আব্দুস শহীদ (আওয়ামী লীগ, নৌকা) – ৭৫,৩২১ ভোট।
মো. আহাদ মিয়া (জাতীয় পার্টি, লাঙ্গল) – ৬০,২১৫ ভোট।
ভোটের ব্যবধান: প্রায় ১৫,১০৬।

চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটে আওয়ামী লীগ প্রভাব বিস্তার করলেও আহাদ মিয়া প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন।

১৯৯৬ (৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন):
আব্দুস শহীদ (আওয়ামী লীগ, নৌকা) – ৯১,৮১১ ভোট।
মো. আহাদ মিয়া (জাতীয় পার্টি, লাঙ্গল) – ৫৯,৮২৫ ভোট।
ভোটের ব্যবধান: প্রায় ৩১,৯৮৬।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের প্রভাবশালী ঘাঁটিতে দৃঢ়ভাবে ফিরে আসে।

২০০১ (৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন):
আব্দুস শহীদ (আওয়ামী লীগ, নৌকা) – ৯৬,৩২৯ ভোট।
মুজিবুর রহমান চৌধুরী (স্বতন্ত্র) – ৭০,৩৬৪ ভোট।
মহসিন মিয়া মধু (বিএনপি, ধানের শীষ) – ৩৪,৭২৬ ভোট।
মো. আছকির মিয়া (জাতীয় পার্টি, লাঙ্গল) – ১৬,৯৭৫ ভোট।

ভোটের ব্যবধান: শহীদ বনাম মুজিবুর রহমান – প্রায় ২৫,৯৬৫।

তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। তবে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোট বিভক্তির কারণে শহীদ সুবিধা পান।

Manual3 Ad Code

২০০৮ (৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন):
আব্দুস শহীদ (আওয়ামী লীগ, নৌকা) – ১,৩১,৭৪০ ভোট।
মুজিবুর রহমান চৌধুরী (বিএনপি, ধানের শীষ) – ৭৯,৫৯৯ ভোট।
ভোটের ব্যবধান: প্রায় ৫২,১৪১।

২০০৮ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেও আওয়ামী লীগ বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়।

২০১৮ (১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন):
আব্দুস শহীদ (আওয়ামী লীগ, নৌকা) – ২,১৬,৬১৩ ভোট।
মুজিবুর রহমান চৌধুরী (বিএনপি, ধানের শীষ) – ৯৩,২৯৫ ভোট।
ভোটের ব্যবধান: প্রায় ১,২৩,৩১৮।

বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী ব্যাপক ব্যবধানে জয়লাভ করেন। তবে এই নির্বাচন দিনের ভোট রাতে হওয়ায় দেশে-বিদেশে প্রশ্ন ওঠে।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা-

আওয়ামী লীগ:

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অবস্থা নড়বড়ে। দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ কারাগারে। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ভানু লাল রায়সহ অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেফতার, বেশিরভাগ নেতাই আত্মগোপনে। কর্মী ও সমর্থকরা হতাশাগ্রস্ত। ফলে সাংগঠনিক তৎপরতা কার্যত স্থবির।

বিএনপি:

২০০৮ সাল থেকে দলটি রাজনীতির মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই নেতা—

আলহাজ্ব মজিবুর রহমান চৌধুরী: ২০০১ সালে স্বতন্ত্র এবং ২০০৮ ও ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২০০৬ সালের পর থেকে তিনি রাজনৈতিক কারণে মোট ২০ বার জেলে গেছেন। একবারে তিনি এক বছর ছয় মাসেরও বেশি সময় জেলে কাটান। জেলে থাকাবস্থায় তাঁর ছোট ভাই, যিনি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা ছিলেন, মারা গেলে তিনি বিশেষ অনুমতিতে মুক্তি পেয়ে দাফনের জন্য বাড়ি আসেন। তাঁরও রাজনৈতিক কারণে প্রায় ১৫ বার জেলে যেতে হয়েছে। এর মধ্যে দুইবার যথাক্রমে ছয় মাস ও তিন মাস করে, মোট ৯ মাস জেল খেটেছেন। চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু এলাকায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

মহসিন মিয়া মধু: তিনি একজন সাবেক পৌর মেয়র ও শিল্পপতি। ১৯৮৪ সালে পৌর কমিশনার হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩, ১৯৯৮, ২০১১ এবং ২০২১ সালে তিনি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি চা-শ্রমিক, সংখ্যালঘুসহ সকল সম্প্রদায়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। রাজনৈতিক কারণে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল এবং এজন্য তাঁকে কারাভোগও করতে হয়েছে।

Manual1 Ad Code

দুই নেতা গণসংযোগ, মিছিল-মিটিং, চা শিল্পাঞ্চল, শহর ও গ্রামাঞ্চল এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন। তবে বিএনপি এখনো দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি।

জামায়াতে ইসলামী:

সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। প্রার্থী ঘোষণা করেছে—সিলেট মহানগরীর প্রথম সারির নেতা অ্যাডভোকেট আব্দুর রব। তিনি এলাকায় বিভিন্ন প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। চা-শ্রমিকসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সমস্যা সমাধানে তাঁর দল বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলেও জানা গেছে।

এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি):

নবগঠিত দল হলেও এর কেন্দ্রীয় নেতা প্রীতম দাশ দীর্ঘদিন ধরে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনে সক্রিয় আছেন। আন্দোলনের কারণে তিনি আটক হয়েছেন এবং বিগত সরকারের আমলে প্রায় পাঁচ মাস কারাভোগ করেছেন।

তিনি নিয়মিত চা-শ্রমিক, সংখ্যালঘু, মৎস্যজীবী সম্প্রদায়সহ সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তরুণ এই নেতা প্রার্থী হলে সংখ্যালঘুসহ সকল শ্রেণির ভোট আনার চেষ্টা করবেন।

জাতীয় পার্টি:

১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল ছিল। একসময়কার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এখন প্রভাব কমে গেছে। কার্যত কোনো প্রার্থীর তৎপরতা চোখে পড়ছে না।

হেফাজতে ইসলাম ও গণ অধিকার পরিষদ:

শুধু সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে—নুরে আলম হামিদি (হেফাজত) ও হারুনুর রশীদ (গণ অধিকার পরিষদ)। সাংগঠনিক তৎপরতা এখনও সীমিত।

বাম জোট ও ক্ষুদ্র দলগুলো-

স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ন্যাপ প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। ঐতিহ্যবাহী এই দলটি জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এবং রুগ্ন রাজনীতির কারণে ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু। বর্তমান অবস্থা দুর্বল। একই রকম অবস্থা সিপিবি, গণফোরাম, জাসদ, ওয়ার্কাস পার্টি প্রভৃতি সংগঠনেরও।

প্রধান নির্বাচনী ইস্যুসমূহ-

চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা অর্জন:

শ্রমিকদের কল্যাণ, সুবিধা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা:

সমাজে শান্তি, সামাজিক সংহতি এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা নির্বাচনী ইস্যু ।

চা শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন ও জীবনমান বৃদ্ধি:

চা-বাগান এলাকার অবকাঠামো, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি:

নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হওয়ার নিশ্চয়তা ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ।

নির্বাচন নিয়ে সংশয়: সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন-

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। হত্যা, চাঁদাবাজি এবং মব জাস্টিসের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এসব পরিস্থিতির মধ্যে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে নির্বাচন হবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

উপসংহার-

শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ আসন দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও এবার তারা সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে। বিএনপি মাঠে শক্তিশালীভাবে সক্রিয়, জামায়াত ও এনসিপি নতুন করে সমীকরণ বদলাতে পারে। চা-শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোটাররাই ফল নির্ধারণ করবে। সবকিছু নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর। বলা যায়, এমতাবস্থায় যদি নির্বাচন হয় তবে এ আসনটি হবে সবচেয়ে অনিশ্চিত ও বহুদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী আসনগুলোর একটি।

 

 

 

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code