পাহাড়ে চলছে গাছ কাটা উৎসব, কতৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান
লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago
Manual3 Ad Code
আলীকদম (বান্দরবানের):
বান্দরবানের থানচি-আলীকদম সড়কের সৌন্দর্য্য নয়নাভিরাম। প্রকৃতি যেন তার নিজ সৌন্দর্য্য বিলীন করে দিয়েছে এই সড়কের দুই পাশে থাকা পাহাড়ে। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফুট উচুঁতে এই সড়ক । বর্ষা কিংবা শীত মৌসুমে এই সড়কে আসলে দেখা মিলবে প্রকৃতির লীলা। কিন্তু সেই চিরচেনা প্রকৃতির দৃশ্যপট পাল্টে দিতে কাজ করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী । এই সড়কের দুই পাশের সবুজ গাছগুলোতে চলছে এখন কুঠারের আঘাত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, থানচি-আলীকদম সড়কের ১৩-২৩ কিলোমিটার এলাকায় গেলে দেখা মিলবে প্রকৃতির অক্সিজের প্রদানকারী অসংখ্য ছোট বড় গাছ কাটা হচ্ছে কুঠারের আঘাতে। লাকড়ি সংগ্রহের নামে বৈলাম গাছ,বহেড়া গাছ, রং, গামার,গর্জন শিল, কড়ই, মেহগনি সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছও কাটা হচ্ছে ওই সড়কে । শ্রমিকরা দল বেঁধে ছোট বড় গাছ কাটছেন । আর কিছু শ্রমিক ওই গাছগুলো পরিবহনের জন্য গাছের স্তূপ তৈরি করছেন । আর ঘণ্টা খানিক পড়ে গাছগুলো গাড়িতে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা । আর সড়কের দুই পাশের গাছ কাটার কারনে পাহাড়গুলো হয়ে যাচ্ছে নেড়া ।
উপজেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি সমরঞ্জন বড়ুয়া বলেন, আলীকদমে পরিবেশের যে ধ্বংসলীলা চলছে তা বলার ভাষা নেই । কিছু মুনাফাবাজ ব্যবসায়ী প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উঠা গাছ যেভাবে শুকনো মৌসুমে কাটছে তা কল্পনার বাইরে। থানচি সড়কের দুই পাশে লাকড়ি ও কাঠ পরিবহনের জন্য যেভাবে অসংখ্য পাহাড় কেটে রাস্তা করে তৈরী করেছে, তা কি দেখার কেউ নেই? প্রকৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে যদি বাঁচাতে না পারি আমরাই খুব শীঘ্রই এখানে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ব।
তিনি আরো জানান, এখানে কর্মকর্তাদের চাকরীর সুবাদে আসা। তাই প্রকৃতি ধ্বংস হলেও কিছু অসাধু কর্মকর্তার পকেট ভারী করার মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়ায় বন উজারে তাদের নিরবতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা।
থানচি সড়কের বিভিন্ন পাড়ায় বসবাসকারী কয়েকজন ম্রো বলেন, লাকড়ি সংগ্রহ করার নামে ছোট গাছ কাটা হচ্ছে এরপরও পাহাড়ের ভিতরে থাকা বড় গাছগুলোও কেটে ফেলা হচ্ছে । কয়েকজন পাড়া কার্বারী ও হেডম্যানের যোগসাজশে এই গাছগুলো বিক্রি করা হচ্ছে । পারিপার্শ্বিক কারণে আমরা বাধা দিতে পারছি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী শর্তে বলেন, আলীকদমে গাছ, বাঁশ ছাড়া আর কি আছে ? এখানের মানুষ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে এগুলোর উপর নির্ভরশীল।
তারা আরও বলেন, লাকড়ি বা গাছ সবখান থেকে বনবিভাগের অসাধু কিছু কর্তা ও কর্মচারীদের কমিশন দিতে হয় । তাই আমরা এগুলো কাটার সুযোগ পাচ্ছি । তাছাড়া পাড়া কারবারিসহ পাড়ায় বসবাসকারীই গাছ গুলো বিক্রি করেছে, আমরা তো জোর করে গাছ গুলো কাটছি না।
ব্যবসায়ীদের কাছে গাছ বা লাকড়ি কাটার কোন অনুমতি নিতে হয় কিনা জানতে চাইলে তারা বলেন, চা,পানি ও হাত খরচে সব মিটমাট করা হয়।
এদিকে তৈন রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার শামশুল হুদা বলেন,পরিবহনের সময় তথ্য দিলে আমরা লাকড়ি বা কাঠসহ গাড়ী জব্দ করব । কিন্তু থানচি সড়কে গিয়ে লাকড়ি বা কাঠ জব্দ করার জন্য যে লোকবল ও খরচ পড়ে তা আমাদের দ্বারা বহন করা সম্ভব নয়। পাহাড়ের লাকড়ি ও কাঠ জব্দ করলে সেগুলো কারও জিম্মায় দিতে হবে, না হয় পরিবহন করে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু পাহাড়ে কাউকে জিম্মায় দেওয়া সম্ভব না, আর পরিবহন খরচও বেশি হওয়ায় সেগুলো বহন করে বনবিভাগে নিয়ে আসাও সম্ভব না।
লামা বনবিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এস.এম কায়চার জানান, সড়কের দুপাশের গাছ কেটে কাঠ ও লাকড়ি পাচারের বিষয়টি অবগত ছিলাম না । দ্রুত সংশ্লিষ্ট তৈন রেঞ্জের কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নাছির উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি লাকড়ি ও কাঠ ব্যবসায়ীরা থানচি সড়কের আলীকদম এরিয়ায় ব্যাপক গাছ কাটছে । এটি আমাদের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর । দ্রুত এদের না থামালে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
তিনি আরো বলেন, সরকার বনায়ন করতে নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং গাছ রোপন করছে। কিন্তু কাঠ ও লাকড়ি ব্যবসায়ীরা নির্বিচারে গাছ কাটছে। এমনীতে পাহাড়ে আগের মত গাছ নেই,তার মধ্যে সড়কের পাশে থাকা গাছও কাটছে। এটি মেনে নেওয়া যায় না। কোন ভাবেই বন উজাড় মেনে নেওয়া সম্ভব না।
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ সায়েদ ইকবাল জানান, রাস্তার আশপাশ ও সরকারী খাস জায়গা থেকে গাছ কাটার কোন অনুমতি নেই। কেউ যদি থানচি সড়কের আশপাশ ও খাস জায়গা থেকে আইন অমান্য করে গাছ কাটে তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।