

আদমদীঘি (বগুড়া) ঃ
লাগবে নাকি জগ, মগ, টিফিন বক্স, চিরুনী, বালতিসহ হরেক রকমের প্লাসষ্টিকের জিনিসসহ সিলভারের হাড়ি, পাতিল। এছাড়াও রয়েছে স্টিলের চামস, বাটিসহ হরেক রকমের জিনিস। লাগবে নাকি আপা। আসুন কম দামে পছন্দের জিনিস বেছে বেছে নেন।” এভাবেই সান্তাহার শহরের অলিগলি ও এর আশপাশ গ্রামের বিভিন্ন মহল্লায়,ও জনসমমুখে গলা ছেড়ে ভ্যানগাড়ীতে বিভিন্ন রকমের পরিবারের জন্য দরকারী নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেরি করে বিক্রি করে জীবন যুদ্ধে বেঁচে আছেন ফেরিওয়ালা নামে খ্যাত পেয়েরা বেগম ।
পেয়েরা বেগমের আসল বাড়ি গাইবান্ধা জেলার মহিমাগঞ্জের গড়গড়িয়া গ্রামে। ওই গ্রামেই দিনমজুর পিতা-মাতা পেয়ারার বিয়ে দিয়েছিলো এক মাদকাশক্ত যুবকের সথে। বিয়ের পর প্রতিদিনই অর্থের জন্য স্বামীর নির্যাতন চলতো পেয়েরা বেগমের উপর। এর এক পর্যায়ে পেয়েরা বেগম ওই মাদকাশক্ত স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে আসে বাবা-মার কাছে।
একদিন বগুড়া জেলার দুপচাচিয়া উপজেলার তালোড়া গ্রামের ফেরিওয়ালা ফজল উদ্দিন মহিমাগঞ্জের গড়গড়িয়া গ্রামে ফেরি করে জিনিস বিক্রির সময় পেয়েরা বেগমের সঙ্গে পরিচয় হলে দু’জনের মাঝে গড়ে ওঠে প্রেমের সর্ম্পক। সম্পর্কের কিছুদিন পর ফজল উদ্দিন ও পেয়েরা বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তারা সান্তাহার রেলওয়ে জংশন স্টেশন শহরের রেলওয়ে কলোনীর সাহেবপাড়ায় ভাড়ার বাসায় সংবার শুরু করেন। তাদের ঘরে আসে ১ ছেলে ও ১মেয়ে। বিয়ের পর থেকে স্বামীর ফেরি করা আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল পেয়েরা বেগমকে। তখন পেয়েরা বেগমও সীদ্ধান্ত নেন যে তিনিও তার স্বামীর মতো করে ফেরি করে জিনিস বিক্রি করবেন। কথা আর কাজের সাথে মিলরেখে ঋন নিয়ে একটি পায়ে ঠেলা ভ্যানগাড়ি কিনে পর্চাসাজিয়ে ফেরি করে ব্যবসা শরু। এরপর থেকে পেয়েরাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন পেয়েরার সংসারে কোন অভাব নেই । দূর হয়েছে পেয়েরা বেগমের সংসারের অভাব-অনটনের গল্প। আর নিজে কর্ম করতে পেরে নিজেও খুশি হয়েছেন।
পেয়ারা বলেন যেদিন বিক্রি ভালো হয় সেদিন দুই থেকে তিন হাজার টাকা বিক্রি হয়। এছারা প্রতিদিন হাজার বারোশো টাকা বিক্রি হয়। এতে করে খরচ বাদ দিয়ে কোন দিন ১হাজার কোন দিন ৫শত টাকা আবার কোন দিন ২ হাজার টাকাও লাভ হয়। এতে করে তার সংসারের অভাব দূর হয়েছে। স্বামী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে এখন তিনি অনেক সুখে আছেন। সংসারের সকল খরচ বাদ দিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয়ও করছেন পেয়েরা বেগম। কিন্তু এই ব্যবসা তো আর সারা বছর একই ভাবে হয় না। বর্ষা মৌসুমে সব সময় গ্রামে যাওয়া হয় না। অসুস্থ্য হলে বের হওয়া যায় না। তবুও তিনি অনেক ভালো আছেন। মানুষের দুয়ারে গিয়ে কারো কাছে হাত পাততে হয়না এবং মন্দ কোন কাজ করতে হচ্ছে না। শুধু ভ্যানগাড়ী ঠেলে বিভিন্ন গ্রামে যেতে হয়। যতদিন বেচে আছি ও সুস্থ্য আছি ততদিন আমি এই ব্যবসাকে ধরে রাখার চেষ্টা করবো। ব্যবসা করে সৎ ভাবে সৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়েই জীবন-যাপন করতে চাই। কর্মকে ছোট করে না দেখে সমাজের অনেক নির্যাতিত ও স্বামী কর্তৃক অবহেলিত নারীরা ইচ্ছে করলেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের পায়ে দাড়াতে পারেন। সমাজের মানুষের বাঁকা কথাকে কানে না ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে তবেই এই সমাজে কোন নির্যাতিত ও অবহেলিত নারীকে আর পেছনে পড়ে থাকতে হবে না।