পহেলা মার্চ দুপুর থেকেই শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

Manual4 Ad Code

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘যদি আমরা নিজেদের প্রথমত বাঙালি, পাঞ্জাবি ও সিন্ধি ভাবতে শুরু করি এবং শুধুই ঘটনাচক্রে নিজেদের মুসলমান ও পাকিস্তানি ভাবি, সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়া অনিবার্য।’

২৩ বছর পর জিন্নাহ্র সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়; পাকিস্তান ভেঙে ১৯৭১ সালে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

১৯৭১-এর এই দিনে বাঙালি জাতি তার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ও নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত এই কার্যকর অসহযোগ আন্দোলন ছিল বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

Manual3 Ad Code

এ অসহযোগ আন্দোলনে হাইকোর্টের বিচারপতি থেকে শুরু করে বেসামরিক প্রশাসনের কর্মচারী, আধাসামরিক বাহিনী থেকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত সবাই সক্রিয় সমর্থন জানিয়ে আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিক ক্ষমতাসীন না হয়েও অসহযোগের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার দায়িত্ব স্বহস্তে নিতে বাধ্য হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সরকারবিহীন স্বাধীন প্রশাসনযন্ত্র সুষ্ঠুভাবে কাজ করে ২৫ মার্চ পর্যন্ত।

Manual6 Ad Code

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বাঙালি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্য ক্ষণ গুনছিল তখন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আকস্মিক এদিন জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন।

Manual5 Ad Code

ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠে বাংলাদেশ। বিক্ষোভে উত্তাল হয় রাজপথ। ছাত্ররা স্লোগান দেয়, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। পহেলা মার্চ দুপুর থেকেই পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও রণাঙ্গনের সাংবাদিক হারুন হাবীব তার পহেলা মার্চের ঘটনা ডায়ারির পাতায় তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘এমসিসি ক্রিকেট দলের খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ঢুকতে যাচ্ছি। হঠাৎ ভেতর থেকে হাজার হাজার মানুষ স্লোগান দিতে দিতে বেরিয়ে এলো।

ইয়াহিয়া খান বেতারে ঘোষণা দিয়েছে ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবে না। বুঝতে পারছি, আমাদের আসলে যুদ্ধ করতে হবে। স্লোগান দিয়ে লাভ নেই। আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কেন ক্ষমতা দেবে না পাঞ্জাবিরা? শেখ মুজিবের উচিত পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা। মহসীন হলের ১০৭ নম্বর রুমে আমি ও আব্দুল হালিম অনেক রাত পর্যন্ত এ নিয়ে অনেক কথা বললাম। যাচ্ছে কোথায় দেশটা?’ শহিদজননী জাহানারা ইমামের স্মৃতিচারণাতেও সেই দোলাচল ধরা পড়ে।

তিনি একাত্তরের দিনগুলিতে এ দিনের রোজনামচায় লিখেছেন : ‘…শেখ মুজিব আগামীকাল ঢাকা শহরে, আর পরশু দিন সারাদেশে হরতাল ডেকেছেন। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গণজমায়েতের ঘোষণাও দিয়েছেন। জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের কী পরিণাম হতে পারে, তা নিয়ে বহু রাত পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা চলল খাবার টেবিলে বসে। রাত প্রায় বারোটার দিকে শুতে গিয়েও ঘুম এলো না। অনেক দূর থেকে স্লোগানের শব্দ আসছে।…কেবল জয় বাংলা ছাড়া অন্য স্লোগানের কথা ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু তবু এ সম্মিলিত শতকণ্ঠের গর্জন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে এসে পড়েছে শ্রুতির কিনারে।’

Manual6 Ad Code

হারুন হাবীব ও জাহানারা ইমামের মতো সারাদেশের মানুষ আশা নিরাশা এবং আশঙ্কা ও সম্ভাবনার দোলাচলে দুলছিল। সচেতন তরুণরা মনে মনে তৈরি হচ্ছিল কঠিন সংগ্রামের সংকল্প গ্রহণে। মানুষের মনে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানুষের মনের সেই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধতা আঁচ করতে পেরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ ও ৩ মার্চ তত্কালীন পাকিস্তানে সর্বাত্মক হরতাল পালনের ঘোষণা দেন এবং ৭ মার্চ তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভার ঘোষণা দেন। সেই শুরু।

একে একে পেরিয়ে আসে বিক্ষুব্ধ ২৫টি দিন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালায়; শুরু হয় মুত্তিযুদ্ধ। এরই পথ ধরে ৯ মাসে আমরা পাই একটি স্বাধীন দেশ-বাংলাদেশ।’

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code