

অনার্সে পড়াকালীন সময়ে কিছুটা শখ, পাশাপাশি হাতখরচ মেটানোর জন্য টিউশনি করতেন মায়িশা ফারজানা চৌধুরী। গ্র্যাজুয়েশন কম্পলিট করে নিজের পছন্দের চাকুর না পেয়ে হতাশায় ভুগছিলেন নাবিলা কোরেশী। উচ্চতর ডিগ্রির জন্য দেশের বাইরে যাওয়া সম্ভব হয়ে উঠছিল না।
দুজনই এখন পর্যটন ও প্রবাসী জেলা মৌলভীবাজারে নারীদের মধ্যে অন্যতম সফল উদ্যোক্তা। ব্যবসার প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছেন ‘অনলাইন’। মায়িশা গড়ে তুলেছেন ‘Baking Story’ এবং নাবিলা ‘Creative Creations’ নামে অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
ফারহাত ফাইজা ও সুবর্ণা চম্পা। দুজনই সহপাঠি। মাধ্যমিক স্কুলে লেখাপাড়া করা অবস্থায়ই শখের বশে টুকটুক ব্যবসা করতেন। ২০১৬ সাল থেকে অনলাইনে শুরু করেছেন ব্যবসা। দুই বান্ধবী মিলে ‘লীলাবতি’ নামে গড়ে তুলেছেন একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও।
নারী দিবসে আই নিউজকে তাদের ব্যবসা ও ভাবনার কথা জানিয়েছেন এই চার উদ্যোক্তা।
পরিবারে নারীর অর্থনৈতিক অবদান
নাবিলা কোরেশী
আমাদের মধ্যে একটি ধারণা বিদ্যমান যে মেয়ে/নারী মানেই সে কেবল পরিবারের সুবিধাগুলাই ভোগ করে থাকে। তার জন্যই পরিবারের এক বিশাল অংকের টাকা বরাদ্ধ রাখতে হয়। যেমন একটা মেয়ে জন্মের পর থেকে তার নিত্যনৈমিত্তিক খরচ, পড়া লিখার খরচ, তার নানান শখ, চিকিৎসা বাবদ, অতঃপর সর্বোপরি তার বিয়ে পর্যন্ত একটা পরিবার কে শধুমাত্র দিয়েই যেতে হয়।
এছাড়াও আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় তো শুধুমাত্র বিয়ে পর্যন্ত ব্যয়গুলা থেমে থাকে না। বলতে গেলে বিয়ের পরে আরও বেশি খরচ হয়। এই সব কিছুর মধ্যে দিয়ে একটা মেয়েকেই ঘুরে ফিরে পরিহাসের স্বীকার হতে হয় যে “মেয়ে তোমার জন্যই সব”।
আমি আমার নিজের গল্পই বলি, যেখান থেকে আমার মাঝে এই উপলব্ধিটা তীব্র হয়ে ওঠে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে নিজের পড়ালিখার সীমাহীন খরচ। তার মাঝে একটা চিকিৎসার জন্য আবার ইন্ডিয়াতে ১মাসের উপরে যখন থাকা লাগলো, তখন আমার ফ্যামিলির খরচ দেখে আমি খুবই ডিটারমাইন্ড হই যে আমাকে কিছু একটা করতেই হবে।

অতঃপর গতানুগতিকতার বাইরে কিছু একটা করতে চাওয়ার ইচ্ছা থেকেই উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা। অতি অল্প সময়ে সবার আস্তা অর্জন করে নিয়ে যখন Creative Creations ; এর যাত্রা শুরু করলাম। ঠিক সেই সময় থেকেই নিজের সম্পূর্ণ খরচ বহনের পাশাপাশি নিয়ম করেই আমি আমার ভাইয়ের পকেটমানি দিচ্ছি। ওর পড়ালিখার টুকটাক খরচ। তাছাড়াও মাঝেমধ্যেই আমি আমার আম্মুর বিভিন্ন দরকারি জিনিস কিনে দেওয়ার চেষ্টা করি নিজের ইনকাম থেকে। তো মোট কথা এইটাই বলতে চাই যে নারী মানেই এখন আর “বার্ডেন” না। বর্তমানে অনেক নারীরা তাদের স্বামীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উপার্জন করছেন। হোক সেটা ঘরে বসে, আর হোক সেটা বাইরে গিয়ে। আমাদের ছোট্ট শহরেই তো চাক্ষুষ উদাহরণের অভাব নেই। তাহলে আমরা নারীরা আর কোন দিক দিয়ে পিছিয়ে আপনারাই বলুন। বিয়ের আগে হোক বা বিয়ের পরে হোক আমরা কিন্তু পরিবারে বরাবর অবদান রাখছি।
ঝুঁকি নেয়ার সাহস
মায়িশা ফারজানা চৌধুরী
‘Baking Story’ শুরুর পর অনলাইনে অর্ডার পেয়ে কেইক বানিয়ে দেয়া, ‘এ ব্যাপারটিতে সামগ্রিক চাহিদা যাচাই করার কোনো প্রয়োজন পরেনি। কিন্তু MOEF আয়োজিত বৈশাখী মেলায় প্রথমবারের মত অফলাইনে আসার আগে এই জিনিসটাই আমাকে অনেক অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে দিলো।
হোমমেইড বেকিং আইটেমের ক্ষেত্রটিতে কোনো পূর্বসূরি না থাকায় কোন ফ্লেভারের কেইকের কেমন ডিমান্ড মানুষের মাঝে, তা যাচাই করার কোনো সুযোগই ছিল না। এখনো মনে আছে, প্রথম সেই মেলায় আমি ক্যারামেল কেইক এবং রেডভেলভেট কেইক পুরো ১০০% রিস্কের উপরই বানিয়েছিলাম। বানানোর সময় এটা মাথায় রেখেই বানাতে হয়েছে যে, ‘সেইল না হলে বাসায় নিয়ে আসবো! তাও রিস্ক নিবো আমি’। বাসায় আর নিয়ে আসতে হয় নি।

আর আমার ক্যারামেল কেইক এখন অব্দি আমার পেইজের মোস্ট ইউনিক ফ্লেভার। আরেকটা যে বিষয় নিয়ে অসম্ভব স্ট্রেসড হতে হয়েছিল, তা হল প্রাইসিং! হোম মেইড যেকোনো আইটেমেই খরচ অনেক বেশি পরড়ে। তা হয়তো আমরা অনেকে বুঝেও বুঝতে চাই না। যেকোনো জিনিসের বাণিজ্যিক উৎপাদনে একসাথে অনেক অনেক জিনিস তৈরি করা হয় বিধায় প্রতি উৎপাদন খরচ অনেক কমে আসে। কিন্তু ঘরে একদম হাতেগোনা বানানো হয় দেখে প্রতি উৎপাদন খরচ কমে না। যেহেতু ডিমান্ড কেমন হবে, তা নিয়ে একেবারেই আইডিয়া ছিল না তাই প্রাইসটাও রেখেছিলাম বলতে গেলে একদম কস্টিং লেভেলে!
মনে পড়ে, প্রথম মেলায় আমি আর Creative Creations এর নাবিলা পার স্লাইস ১০০টাকা লিখার সাহস পাই নি। আমার হাইয়েস্ট প্রাইস ৯৫ টাকা। দুজনেরই উদ্দেশ্য ছিল, যেন লসে না পড়ি। অবশ্যই বলতে হয়, সেদিন সম্মানিত ক্রেতারা আমাদের সব ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বলেই পরবর্তীতে অনেকবার অফলাইনে আসার সাহস করেছি এবং করে যাচ্ছি। তবে ঐদিন ভালভাবে সাড়া না পেলে যে সবসময়ই এরকম কম প্রাইসে সেইল দিতাম, ব্যাপারটা তাও কিন্তু না।
হয়তো স্টপ হয়ে যেতাম, কারণ সময় আর কষ্টের মজুরি ছাড়া আমি শুধু শুধু কেন একেকটা কেইকের পেছনে গড়ে ৪ ঘন্টা সময় দিবো? অবশ্যই আমি বা আমরা তখন বিকল্প কিছু ভাবতাম। এখনো একটা অর্ডার পাওয়া থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত আমরা যদি আমাদের ব্রেইনস্টর্মিং, পরিশ্রম, সময় আর অবচয় খরচ সবকিছুকে অর্থে পরিমাপ করি তাহলে লাভ বলতে কিছুই থাকে না। আমাদের মজুরীই আমাদের লাভ। কিন্তু বিজনেস স্টাডিজ নিয়ে একটু ধারণা থাকলেই জানা যাবে বিজনেসে নিজের কষ্টের মজুরি কখনোই লাভ না।
তবে এসব প্রতিবন্ধকতার অনেক উন্নতি হচ্ছে দিনদিন। শুরুর দিকে এসব প্রতিবন্ধকতার কারনে থেমে যাই নি, একজন মেয়ে হিসেবে কখনোই ভয়ে পা পিছাই নি। বরং প্রতিটাবার মনে মনে উচ্চারণ করেছি, যা হবার হবে, রিস্ক নিবো আমি। শুরুর দিকে মনে হতো, এই প্ল্যাটফর্মে কোনো পূর্বসূরি থাকলে হয়তো এতো ঝুঁকি, এতো অনিশ্চয়তার মাঝে যেতে হতো না। তবে এখন পেছনে তাকালে মনে হয়, নিজে তিলতিল করে যেকোনো কিছু গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারার আনন্দ অপরিসীম। ভাল লাগে এটা ভেবে যে, হোমমেইড কেইক বা ফুডের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ডিমান্ড বুঝে বিল্ডআপ করতে আমাদের যে পরিমান কষ্ট করতে হয়েছে, আমাদের পরে আর কাওকে এ কষ্টের মাঝে যেতে হবে না।
উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
ফারহাত ফাইজা
‘’বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’’ ছোটবেলা যখন এই লাইনগুলো পড়তাম এর গভীরতা হয়তো এতো ভালোকরে বুজঝতাম না। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে নারীদের রয়েছে বিশেষ অবদান। এটা হতে পারে বাহ্যিক বা চোখের আড়ালে।
প্রতিটা সফল ব্যাক্তির পেছনের গল্প কিন্তু আমরা জানি না। এর পেছনে রয়েছেন নারী। তিনি হতে পারেন মা, বোন বা স্ত্রী। কিন্তু আজও অনেক সমাজের নারীরা পিছিয়ে আছেন।বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। তাই আমাদের উচিৎ তাদের সহযোগীতা করা ও অনুপ্রাণীত করা । নারীদের ই উচিৎ অন্য নারীদের এগিয়ে আসতে সাহায্য করা বর্তমানে তরুন উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রচুর বাড়ছে এর মধ্যে অধিকাংশ ই নারী।

আজ গর্বের সাথে বলতে পারি আমি ও একজন সফল উদ্যোক্তা এবং আরও ২/৩ জন সুবিধা বঞ্চিত নারীদের নিয়ে কাজ করছি।নারী উদ্যোক্তারা যদি সুবিধা বঞ্চিত নারিদের নিয়ে কাজ করেন তাহলে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে।তাদের আর কারো কাছে হাত পাততে হবে না। এবং বর্তমানে বেশ পরিবর্তন হচ্ছে ও ।
২০০৩-০৪ সালের দিক থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বিরাট পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। নারীরাই পারেন ১০০ টাকা দিয়ে সংসার চালাতে। নিজেকে অন্যের সুখে হাসতে হাসতে বিলিয়ে দিতে পিছপা হন না এই নারী। তাই হয়তো একাই ভালোবাসে সমস্যা ও সমাধানের হালটি কাঁধে তুলে নিতে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পার করেই চলে এই নারী।
নারীর ক্ষমতায়নে নারীদের সখ্যতা
সুবর্ণা চম্পা
কোন এক বিশেষ দিনে নারী দিবস সীমাবদ্ধ না হয়ে প্রতিদিন হোক নারীদের। আর একজন নারী তখনই স্বাধীন হবে যখন প্রতিটি নারী একে অন্যের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবে। নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা নারীর স্বাধীনতা তবেই সম্ভব যখন নারীরা পরস্পরের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ অহংবোধ মনোভাব ভুলে একে অন্যেকে সাহায্য সহযোগিতা করবে। আমি করছি মানে শুধুই আমি করব এমনটা না করে আমি তুমি সকলে একত্রিত হয়ে করলে বরং ভাল। আমি তোমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হব এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে আমি নিজেকে তোমার চেয়ে উচ্চতর মনে করব এমনটা যেন না হয়। নারীরা একে অন্যকে অণুপ্রাণিত করবে।
প্রতিটি নারীর একে অন্যের প্রতি ভালবাসা সখ্যতা গড়ে তোলার মাধ্যমেই নারীরা এগিয়ে যাবে। আজকাল আমরা নারীরাই নারীদের বিরোধীতা বেশি করি, একজন একটা কিছু করছে সেটাকে ইতিবাচক না ভেবে নেতিবাচক বেশি মনে করি যেটা কোন না কোনভাবে নিজেদের জন্যই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে।তাই এ ধরণের মনোভাব থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।

আমি ব্যাক্তিগত ভাবে ‘লীলাবতি’ নামে একটি অনলাইন বিজনেস এর সাথে জড়িত। নিজের বাল্যকালের বন্ধুর সাথে মিলে বিজনেস করছি আজ ৩ থেকে সাড়ে ৩ বছর হলো। শুধুমাত্র শখ থেকেই লীলাবতী কিংবা আমাদের উদ্যক্তা হওয়ার গল্প। শখের বসে যে কাজগুলা করতাম সেগুলো থেকে যখন নিজের হাত খরচ চালাতে পারি তখন সেই কাজের আনন্দ আরো দ্বিগুণ মাত্রায় বেড়ে যায়।
আমি মনে করি শখটাকে যখন পেশা হিসেবে নেয়া তখন মানুষ বেশি সফল হয়। লীলাবতী আমাদেরকে বানিয়েছে সফল উদ্যক্তা। আর আমাদের সখ্যতা, পরস্পর প্রীতি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। লীলাবতী যখন শুরু করি তখন দুজন শুধুমাত্র বন্ধু ই ছিলাম। এখন আমরা বন্ধু ও বিজনেস পার্টনার। এক্ষেত্রে চাইলেই দুজন আলাদাভাবে বিজনেস টাকে রিপ্রেসেন্ট করতে পারতাম। কিন্তু লীলাবতীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি আমরা একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। এভাবেই যেন হয় প্রতিটা নারীর ক্ষমতায়ন। মনে রাখতে হবে আমরা বদলালে তবেই না বদলাবে সমাজ।
এছাড়াও “সিলেট এর শেহজাদিজ” নামে আমাদের একটি ফেসবুক গ্রুপ ও আছে যেখানে আমরা চারজন ছাড়াও আরো ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেয়েরা এ গ্রুপে আছেন। যারা প্রতিনয়ত নিজেদের গল্প, ভালোলাগা, খারাপ লাগা শেয়ার করছেন। অন্যসব মেয়েদের সাথে যে কারণে গ্রুপের সবার মধ্যেও একধরনের সখ্যতা দেখা যায়। গ্রুপে অনেকে অনলাইন বিজনেসের সাথে জড়িত। যারা বিভিন্ন সেল পোস্ট দিয়ে নিজেদের বিজনেসের প্রচারণার সুযোগ পান।
এভাবেই কালচক্রে প্রতিটি নারীই একে অন্যের সাথে জড়িয়ে আছেন।