শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল গতকাল 

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual3 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার :  অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের ৫৮তম মৃত্যু বার্ষিকী ছিল গতকাল । ১৯৬২ সালের এদিন তিনি ঢাকায় ইন্তিকাল করেন। এ.কে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২) রাজনীতিবিদ ও জননেতা। তিনি কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী (১৯৩৭-১৯৪৩) এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৫) এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের পদ (১৯৫৬-১৯৫৮)সহ বহু উঁচু রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। একজন বাঙালী রাজনীতিবিদ হিসেবে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কূটনীতিক ও রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের কাছে তিনি বাংলার বাঘ এবং হক সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন।

আবুল কাশেম ফজলুল হক বাকেরগঞ্জ জেলার দক্ষিণাঞ্চলের বর্ধিষ্ণু গ্রাম সাটুরিয়ায় ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল বরিশাল শহর থেকে চৌদ্দ মাইল দূরে চাখার গ্রামে। তিনি ছিলেন মুহম্মদ ওয়াজিদ ও সায়িদুন্নিসা খাতুনের একমাত্র পুত্র।
১৮৯৭ সালে কলকাতার ‘ইউনিভার্সিটি ল কলেজ’ থেকে বি.এল ড়িগ্রি লাভ করে ফজলুল হক স্যার আশুতোষ মুখার্জীর অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর পর হক বরিশাল শহরে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯০৩-১৯০৪ সময়কালে তিনি এ শহরের রাজচন্দ্র কলেজে খন্ডকালীন প্রভাষক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ১৯০৬ সালে ড়েপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে হক সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯০৬ সালের ৩০ ড়িসেম্বর ঢাকায় সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতেও তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন।
স্যার খাজা সলিমুল্লাহ ও নওয়াব  নওয়াব আলী চৌধুরীর কাছে রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয়। তাঁদের সহযোগিতায় ১৯১৩ সালে তিনি তাঁর শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী রায় বাহাদুর কুমার মহেন্দ্রনাথ মিত্রকে পরাজিত করে ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মাঝখানে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে দুবছর সময়কাল (১৯৩৪-১৯৩৬) ছাড়া ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ পর্যন্ত তিনি বঙ্গীয় আইন সভার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯১৩ সালে হক বাংলার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক হন এবং ১৯১৬ সাল পর্যন্ত এ পদে বহাল থাকেন। সর্বভারতীয়  মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক রূপেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত হক ছিলেন সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সভাপতি। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য রূপে তিনি সে সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। হক ছিলেন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ১৯১৬ সালে লক্ষ্মৌ চুক্তি প্রণয়নে সহায়কদের অন্যতম। ১৯১৭ সালে হক ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের যুগ্ম সম্পাদক এবং ১৯১৮-১৯১৯ সালে তিনি এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রূপে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৮ সালে ফজলুল হক সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের দিল্লি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯১৯ সালে ফজলুল হক জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের তদন্তের জন্য মতিলাল নেহরু,  চিত্তরঞ্জন দাস ও অন্যান্য বিশিষ্ট নেতাদের নিয়ে  ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কর্তৃক গঠিত পাঞ্জাব তদন্ত কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯২০ সালে হক বাংলা প্রাদেশিক সম্মেলনের মেদিনীপুর অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন।
১৯১৯ সালে হক খিলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন। কিন্তু অসহযোগের প্রশ্নে কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। ১৯২০ সালে কংগ্রেস-গৃহীত অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্রিটিশ পণ্য ও উপাধি বর্জনের তিনি সমর্থন করেন। কিন্তু মুসলমান সম্প্রদায়ের পশ্চাৎপদ অবস্থার কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করে তিনি স্কুল ও কলেজ বর্জনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। বর্জনের সিদ্ধান্ত মুসলমান ছেলেমেয়েদের অগ্রগতিতে বাধার সৃষ্টি করবে এটা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। সুতরাং তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন।
১৯২০ সালে হক,  কাজী নজরুল ইসলাম ও  মুজাফ্ফর আহমদ মিলে  নবযুগ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর সরকারবিরোধী নীতির কারণে এ পত্রিকার জামানত বহুবারই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিনব্যাপী এ দৈনিক পত্রিকা চালানো তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নি। মুসলমানদের শিক্ষার জন্য তিনি তাঁর যথেষ্ট সময় ব্যয় করেন এবং মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। বাংলায় দ্বৈতশাসনামলে ১৯২৪ সালে প্রায় ছয়মাসের জন্য হক শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দেশে শিক্ষা সংক্রান্ত অবকাঠামো সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম এড়ুকেশনাল ফান্ড গঠন করে তিনি যোগ্য মুসলমান ছাত্রদের সাহায্য করেন। মুসলমান ছাত্রদের ফারসি ও আরবি শিক্ষাদানের জন্য তিনি বাংলায় একটি পৃথক মুসলমান শিক্ষা পরিদপ্তরও গঠন করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সকল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলমান ছাত্রদের জন্য আসন সংরক্ষণেরও তিনি ব্যবস্থা করেছিলেন। বাংলায় মাদ্রাসা শিক্ষার নতুন কাঠামো তৈরিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও প্রজা পার্টি জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন, সকল দমনমূলক আইন বাতিল এবং সকল রাজবন্দি ও বিনা বিচারে আটক ব্যক্তিদের মুক্তিসহ বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য চাপ দিয়েছিল।
মুসলমান সম্প্রদায়ের পশ্চাৎপদতা দূর করার উদ্দেশ্যে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী রূপে হক মুসলমানদের জন্য চাকরির ৫০% সংরক্ষিত রাখার নির্দেশ দান করেন এবং বাংলা সরকারের অফিসগুলিতে এ অনুপাত কঠোরভাবে কার্যকর করেন। সরকার এ নীতি মেনে নেয় যে, যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী পাওয়া গেলে সরাসরিভাবে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫% চাকরি তফশীলী সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত রাখা হবে, তবে এ সংরক্ষণ সরাসরিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত অমুসলমানদের ৩০% এর বেশি হবে না।
তাঁর প্রথম মন্ত্রিত্বের সময়ের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে হক মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের গতি ত্বরান্তিত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য প্রদেশে বসবাসকারী সকল সম্প্রদায়ের মধ্যেই শিক্ষার বিস্তার করাকে তিনি তাঁর দায়িত্বরূপে বিবেচনা করেছিলেন। এ লক্ষ্য নিয়ে তিনি বঙ্গীয় আইন সভায় ‘প্রাথমিক শিক্ষা বিল’ পেশ করেন যা প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করে আইন হিসেবে পাস করা হয়েছিল। কিন্তু ফজলুল হক বঙ্গীয় আইন সভায় ‘মাধ্যমিক শিক্ষা বিল’ পেশ করলে এতে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের নীতি সংযুক্ত থাকায় বিরোধী দলীয় সদস্যবৃন্দের মধ্যে ও সংবাদপত্রগুলিতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। হক ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) কলকাতা,  লেড়ি ব্র্যাবোর্ন কলেজ, ওয়াজিদ মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল এবং চাখার কলেজের মতো বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। সে সময় হক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধার করতে এবং কলকাতার পার্ক সার্কাসে তাঁর হিন্দু প্রতিবেশীদের রক্ষা করতে চেষ্টা করেন। নগরীতে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি দেখে তিনি অত্যন্ত হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলেন। লীগ-নেতৃবৃন্দের অনুরোধে হক ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বরে মুসলিম লীগে যোগদান করেন।
১৯৪৭ সালে দেশ-বিভক্তির ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি লক্ষ করে হক অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছিলেন। তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করতে শুরু করেন এবং ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সালে পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাড়ভোকেট জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী ছাত্রদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করলে ফজলুল হক আহত হন। হক মুসলিম লীগবিরোধী আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট নেতারূপে আবির্ভুত হন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি  ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গণ অভ্যুত্থান পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিকে এক নতুন দিকনির্দেশনা দান করে। ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই ফজলুল হক ‘শ্রমিক-কৃষক দল’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য হক, মওলানা  আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সোহ্রাওয়ার্দী  যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। হক এ জোটের নেতা নির্বাচিত হন। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারণার পক্ষে জনগণকে সমবেত করতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। শেরে বাংলার ভক্তি ও উৎসাহ সঞ্চয়ের ক্ষমতা বিপুল ভোটে ফ্রন্টের জয়লাভের একটি প্রধান কারণ ছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর এ.কে ফজলুল হক পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন যদিও আইনসভায় তাঁর দল আওয়ামী মুসলিম লীগের চেয়ে অনেক কম আসন লাভ করেছিল। রাজনৈতিকভাবে এটা কৌতূহলোদ্দীপক যে, আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা না হয়েও হক দুবার বাংলার এবং আরও একবার পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন। এটা তাঁর রাষ্ট্রপরিচালনায় দক্ষতা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার নির্দেশক। তিনি সব সময়ই আন্তঃদলীয় আচার-আচরণ বজায় রাখতে পারতেন। অবশ্য হকের মন্ত্রিসভা ছিল স্বল্পস্থায়ী।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code