গত ১০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল উন্নয়নশীল বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থানীয়। ৭ শতাংশের অধিক হারে অর্থনীতির সেই প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ১০ বছরেরও কম সময়ে বাংলাদেশের আর্থিক কলেবর দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রতি প্রজন্মান্তরে ক্লিষ্ট জনগণের ভঙ্গুর জীবনযাত্রার চেহারা পূর্ণাঙ্গ দোহারায় পরিণত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল!
নিয়তির নির্মম পরিহাস! এ বছরের প্রথমার্ধে পৃথিবীব্যাপী করোনাক্রান্ত মহামারীর যে ভয়াবহ আবির্ভাব হয়েছিল, পূর্ব এশিয়ায় তার ভয়ানক প্রকোপের নির্মমতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংহতি এখন নিদারুণ অনিশ্চিতি এবং অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন। গত বছরের প্রায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার এখন ২ শতাংশের রসাতলে নিমজ্জিত।
আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের আলোকে বাংলাদেশ অর্থনীতির এই অপ্রত্যাশিত অবক্ষয়ের আর্থিক তাত্পর্য ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী সমষ্টিগত চাহিদা ও সরবরাহের করোনাবদ্ধ বন্ধ্যত্বের কারণে বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রাক্কলিত চলমান প্রবৃদ্ধির হার ২০২০ সালে ৬ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক বছরে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এই ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের জিডিপির ৬ শতাংশ।
করোনার ভয়াবহ সন্ত্রাসের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে অভূতপূর্ব সংকোচনের মুখোমুখি হয়েছে, ক্রমসঞ্চিত এই আর্থিক অবক্ষয়ের আকার চট্টগ্রাম মহানাগরিক সমষ্টিগত অর্থনীতির অর্ধাংশ। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম মহানগরের জিডিপির পরিমাণ হচ্ছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। করোনার কারণে এই মহানগরের অর্ধেক অর্থকরী সম্পদ কর্ণফুলী নদীর জলে এখন জলাঞ্জলিত। বিষয়টি এভাবেও চিন্তা করা যেতে পারে যে করোনা মহামারীর বিষাক্ত আক্রমণে মহামন্দাক্রান্ত বাংলাদেশ থেকে চট্টগ্রাম শহরের অর্থনৈতিক অর্ধাংশ কর্ণফুলীতে ভেসে বঙ্গোপসাগরের অতলে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সামষ্টিক অর্থনীতির কী ভয়ানক আর্থিক ক্ষতি, যা এ বছরের প্রথম দিকেও ধারণা করা যায়নি!
দেশব্যাপী করোনাক্রান্ত এই ক্ষয়ক্ষতির ব্যক্তিগত দিকটাও নিদারুণ মর্মান্তিক।
করোনাজনিত ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বার্ষিক এই দেশজ সামগ্রিক ক্ষতির মাথাপিছু পরিমাণ বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার জনপ্রতি ১১ হাজার ৩৪৩ টাকা। অর্থাৎ গত কয়েক মাসের গৃহবন্দিত্ব এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন অচলাবস্থার ফলে করোনাভীত বাংলাদেশের আবালবৃদ্ধবনিতাসহ সব নাগরিক যে ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তার পরিমাণ ১১ হাজার ৩৪৩ টাকা; যা দিয়ে বাংলাদেশের একটি পরিবার ন্যূনতম যেসব খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতে পারত, তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৪০ কেজি চাল, ৩০ কেজি আলু, ২০ কেজি মুরগি, ৪ কেজি গো-মাংস, ৫ ডজন ডিম, ১০ কেজি পেঁয়াজ, ৩ কেজি টমেটো, ৪ লিটার দুধ, ৪ লিটার পানি, ২ লিটার কোক, ৫টি পাউরুটি, ৩ কেজি কলা এবং ১ কেজি কমলা।
ধারণা করা যায় যে করোনায় ক্ষয়ে যাওয়া জনপ্রতি ১১ হাজার ৩৪৩ টাকায় যেসব আহার্য সামগ্রী ক্রয়যোগ্য, তা দিয়ে একজন সুস্থ বঙ্গবাসী দুই মাসেরও বেশি সময় জীবনধারণ করতে সক্ষম। এই অর্থের অভাবে অনেক প্রান্তিক আয়ের জনগণ বাংলাদেশে এখন অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে!
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ছাড়াও মানব উন্নয়নের মৌলিক সূচকের ক্রমোন্নতির কারণে বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য-ব্যাধির উল্লেখযোগ্য উপশম হয়েছিল গত দুই দশকে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুসারে, ২০০০ সালে বাংলাদেশের গণদারিদ্র্যের হার ছিল ৩৫ শতাংশ, যেটা ২০১৮ সালে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছিল। গত দুই দশকের ব্যাপ্ত পরিসরে বাংলাদেশের ২ কোটি ৮০ লাখ জনগণ চরম দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছে। সম্প্রতি করোনার অনাহূত উপদ্রবে দারিদ্র্য বিমোচনের এ ধারা ব্যাহত হবে এবং মহামারী ব্যাধির তীব্রতা দরিদ্র জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক আকারে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গণমহামারীর এই মারাত্মক দুর্গতির অতল গর্ত থেকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং প্রান্তিক জনগণের চরম দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের বিকল্পহীন কার্যকর ভূমিকার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার করোনাকালে সুদূরপ্রসারী উদার রাজস্ব এবং নমনীয় মুদ্রানীতির আওতায় এ পর্যন্ত ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রণোদনা সহায়তা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সামগ্রিক দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশ পরিমাণ এই গণ অর্থসহায়তা করোনার কৃষ্ণগহ্বর কিঞ্চিৎ আলোকিত করতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির অদূরদিগন্ত সম্পূর্ণ সৌরোজ্বল হয়ে আগের প্রবৃদ্ধির হারে প্রত্যাবর্তন করতে আরো সময়ের প্রয়োজন হবে বলে অর্থ বিশেষজ্ঞদের অভিমত!
চাহিদা ও সরবরাহের অপূরণীয় সংকোচনজাত বর্তমান অর্থনৈতিক মহামন্দায় সরকারের সময়োচিত নীতিমালা গ্রহণের অর্থনৈতিক ভিত্তি অনেকটা অবিতর্কিত এবং সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য। অর্থনীতিতে মন্দাজনিত স্থবিরতার কারণে যে অমোচনীয় ক্ষয়ের সৃষ্টি হয়, সেই শূন্য গর্ত পূরণে অর্থনীতির অন্যান্য কুশীলব যথা ব্যক্তিগত, ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং বহির্বাণিজ্য খাত কোনোটাই কার্যকর হয় না। কারণ এই নিযুক্তকদের কারো শূন্য থেকে অর্থ সৃজনের ক্ষমতা নেই। যে ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রেরই প্রাধিকার। রাষ্ট্রীয় প্রাধিকারের আস্থাভিত্তিক আপত্কালীন অর্থসংস্থান করে সরকার মুমূর্ষু অর্থনীতির অচল শিরা-উপশিরায় প্রয়োজনীয় রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে তার প্রাণ সংরক্ষণ করে।
ম্রিয়মাণ অর্থনীতিতে অন্তর্বর্তীকালীন এই সঞ্জীবনী সহায়তায় রাষ্ট্রের অবদান অপরিসীম। উদার রাজস্ব নীতি জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সমষ্টিগত চাহিদা আর সরবরাহ বৃদ্ধি এবং নমনীয় মুদ্রানীতি সৃষ্ট অতি অর্থ তারল্য দেশের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় বাণিজ্য ভরসা তৈরি করে করোনাক্রান্ত ম্রিয়মাণ অর্থনীতিকে পুনরায় সুস্থ ও স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার যে অর্থনৈতিক নিদান সরকার প্রণয়ন করেছে, বিলাতি অর্থনীতিবিদ জন কেইন্স প্রস্তাবিত এই অর্থ ব্যবস্থাপনার তাত্ত্বিক শানেনজুল বেশ প্রাচীন। এই সূত্র প্রয়োগ করেই বিশ্ব অর্থনীতি গত শতাব্দীর প্রথম দিককার প্রাণান্তকর মহামন্দা কাটাতে সক্ষম হয়েছিল।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক প্রণোদনা উদ্যোগ অর্থনৈতিক তত্ত্বানুসারে যথাযথ এবং যৌক্তিক। সময়োচিত এই সরকারি হস্তক্ষেপ করোনাক্রান্ত বর্তমান দুর্বিপাকের অন্ধকার ভবিষ্যতে কিছুটা হলেও দূর করতে সক্ষম হবে।
তবে বাংলাদেশ অর্থনীতির সেই আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ করোনার কার্যকর নিয়ন্ত্রণে নির্ভরযোগ্য টিকা এবং পর্যাপ্ত নিদানযোগ্য ওষুধ আবিষ্কারের ওপরই নির্ভরশীল! এই সদর্থক শর্তসাপেক্ষে দেশের অর্থ স্বাস্থ্যের সচল চাকা সম্পূর্ণরূপে স্থবিরতামুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা অদূরভবিষ্যতে ক্ষীণ বলে অর্থনীতিবিদরা সংশয় প্রকাশ করছেন। তবে মহামারীর প্রকোপ স্বাভাবিক হওয়াসাপেক্ষে বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের সম্পূর্ণ সংশোধন সময় অন্তত এক থেকে দেড় বছর বলে অনুমিত হয়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামে লক্ষ কোটি টাকার বিশাল অর্থক্ষরণ এবং একই সঙ্গে অর্থনীতির দিগন্তসীমা দেড় বছরের দূরত্বে ক্রমঃঅপসারণ একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় বিশাল প্রতিবন্ধক।
মর্মান্তিক করোনা শুধু প্রাণনাশক সংক্রামক ব্যাধি নয়, বরং বাংলাদেশের মতো উন্নয়ন প্রয়াসী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সঞ্জীবনী শক্তিসংহারক!
ড. ওসমান রহমান: কানাডার প্রাদেশিক সরকারের জনপ্রশাসনে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও নীতিনির্ধারক