কেমন হবে ভবিষ্যৎ পৃথিবী

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual7 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ  জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দাবদাহ, বন্যা, দাবানল, খরাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিজ্ঞানীদের শঙ্কা—যুগে যুগে প্রকৃতি ধ্বংস করে সভ্যতার যে দেয়াল মানুষ তৈরি করেছে, তার প্রভাব আরও বেশি দৃশ্যমান হতে শুরু করবে আগামী দশকগুলোতে। জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কেমন হতে পারে আগামীর পৃথিবী, সম্প্রতি সেসব তথ্য উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে।

দাবদাহ
পৃথিবীতে এখন যে তাপমাত্রা অনুভূত হয় সর্বশেষ এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা ছিল অন্তত ১ লাখ ২৫ বছর আগে। আর বায়ুমণ্ডলে এখন যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড রয়েছে, তা গত ২০ লাখ বছরের মধ্যে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ১৯৭০ সাল থেকে পৃথিবীর তাপমাত্রা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে এবং মহাসাগরগুলো যে হারে উত্তপ্ত হয়েছে, অন্তত ১১ হাজার বছরের মধ্যে তা দেখা যায়নি।

লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অ্যামান্ডা মেককের মতে, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কোনো মাত্রাই নিরাপদ বলে বিবেচিত হতে পারে না এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ এরই মধ্যে মারা যাচ্ছে।’

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী জোয়েরি রোজেলজ জানান, আগামী দশকেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি বাড়তে পারে। ফলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ প্রতি ৫ বছরে একবার তীব্র দাবদাহের শিকার হবে। আর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি বাড়লে এর ভুক্তভোগী হবে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ। বিশ্বজুড়ে হিটস্ট্রোকে মৃত্যু হতে পারে অন্তত ৫০ লাখ মানুষের। এ ছাড়া হারিয়ে যেতে পারে বিশ্বের ৯৯ শতাংশ প্রবাল, বিলীন হতে পারে ১০টি মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে একটি।

Manual5 Ad Code

বন্যা
বিশ্বব্যাংকের অনুমান অনুযায়ী, জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের কারণে বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশের মানুষ নিজ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে, যার মধ্যে বন্যা অন্যতম।

প্রায়ই অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু জার্মানি ও চীনেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতিও একই। যেখানে মিসিসিপি অঞ্চল ২০১৯ সালের বেশির ভাগ সময়ই বন্যার মধ্যে কাটিয়েছে। ২০২০ সালে বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় যুক্তরাজ্য, যেখানে একটি ঘূর্ণিঝড়ের পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এক মাসের সমান বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে সুদানে বন্যায় ১ লাখের বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বন্যার কথাও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে বন্যায় দেশের বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াটা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

Manual6 Ad Code

এদিকে গত ২০ বছরে মানবজাতির জন্য উপলব্ধ স্থলজ পানির সমষ্টিগত স্তর প্রতি বছর ১ সেন্টিমিটার হারে হ্রাস পেয়েছে। ফলে বিশ্বের ৫০০ কোটির বেশি মানুষ আগামী তিন দশকের মধ্যে পানি সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।

Manual1 Ad Code

তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে হিমবাহ গলে সমুদ্রের পানির স্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন উপকূলীয় শহরগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়তে পারে পানির প্রবাহ। এর ফলে সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে মায়ামি, সাংহাই এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অনেক অঞ্চল।

Manual1 Ad Code

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে। এরই মধ্যে তাপ, খরা ও দাবানলের এক ভয়াবহ চক্রের মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া ও স্পেনের মতো জায়গাগুলো।

অস্ট্রেলিয়ার ২০১৯-২০ সালের বিপর্যয়কর ‘ব্ল্যাক সামার’ খ্যাত দাবানল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিতে চারগুণ বেশি হবে এবং ৩ ডিগ্রিতে তা মোটামুটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা প্রকৃতির নিয়মের ধারাবাহিক পরিবর্তন এখন জলবায়ু বিজ্ঞানীদের জন্য অজানা এক উদ্বেগের কারণ। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর ক্যালিফোর্নিয়ায় রেকর্ড দাবানলের কারণে ১০ লাখের বেশি শিশু স্কুলে উপস্থিত হতে পারেনি। কী হবে যদি শক্তিশালী কোনো ঝড় যদি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কম্পিউটার চিপ কারখানাকে ধ্বংস করে দেয়? কী হবে যদি বিশ্বের অর্ধেক মানুষ রোগ-বহনকারী মশার সংস্পর্শে আসে?

এর জবাবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘আমরা এত দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন আগে দেখিনি। তাই আমরা এর অজানা প্রভাবগুলো সম্পর্কেও তেমন কোনো ধারণা দিতে পারছি না। এর পেছনে মানবসৃষ্ট কারণই বেশি দায়ী, যা করার আগে আমরা চিন্তা করি না। বেশি কার্বন মানে আরও বেশি খারাপ প্রভাব, যার অর্থ আরও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে পড়া।’

যুগে যুগে নানা দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছে বিশ্ব। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে আফ্রিকা অঞ্চলে খরার প্রকোপ আরও বেড়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে খাদ্য উৎপাদনে।

বিশ্বব্যাপী চরম ফসল খরার ঘটনা এর আগে গড়ে দশকে একবার দেখা যেত। তবে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে খরা বাড়বে দ্বিগুণেরও বেশি। বর্তমান সময়ের চেয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেই চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ ঝুঁকিতে পড়বে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনগত নানা প্রভাব খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, বিপর্যয় এড়াতে হলে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণের আগে এই দশকেই তা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অ্যামান্ডা মেকক বলেছেন, ‘তাপমাত্রা ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেই এখনকার তুলনায় ভারী বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এক-চতুর্থাংশ বাড়বে এবং অনেক দেশে ৬ ডিগ্রি পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপ অনুভূত হবে। এ ধরনের গরমে পৃথিবীর বেশির ভাগ অংশই বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে, আর সেই পৃথিবীতে আমরা থাকতে চাইব না।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code