সিলেটে বন্যার ৮ দিন, কোথাও উন্নতি কোথাও অবনতি

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৪ years ago

Manual6 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট : সিলেটে বন্যার ৮দিন পেরিয়ে গেলেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। বরং ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। টানা ৮ দিন ধরে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট নগরসহ জেলার ১৩টি উপজেলায় প্লাবিত হওয়া হাজার হাজার গ্রাম পানিতে থৈ থৈ করছে। এতে হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে ঘরে মজুত করা খাবারও শেষ হয়ে গেছে। এমন হাহাকারের মাঝে বন্যাদুর্গত মানুষ পর্যাপ্ত ত্রাণ পাচ্ছেন না বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন। এতে দূর্গত এলাকাগুলোতে নানামুখী বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাতে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শুক্রবার ভোর থেকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ পানিবন্দী আছেন।

Manual8 Ad Code

বানভাসিরা বলছেন, অনেক ঘরবাড়িতে এখনো বুক ও গলা সমান পানি। অনেকে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ ঘরের ভেতরে মাচা বানিয়ে থাকছেন।

সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ উপজেলাসহ প্রত্যন্ত এলাাকার বানভাসি মানুষ বলেন, চাল, ডাল ও তেল না থাকায় অনেকের বাড়িতে রান্না বন্ধ হয়ে আছে। ইঞ্জিন নৌকার শব্দ শুনলেই তাঁরা ত্রাণের আশায় ছুটে আসছেন। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সাপ, পোকামাকড় ও জোঁকের উপদ্রব বেড়েছে। শৌচাগার ডুবে যাওয়ায়ও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সরকারিভাবে ত্রাণ দেওয়ার কথা বলা হলেও অনেকে ত্রাণ পায়নি। উপজেলা সদরের সঙ্গে অধিকাংশ এলাকার মানুষের সড়কপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মানুষ নৌকা ও কলাগাছ দিয়ে তৈরি ভেলা ব্যবহার করছে।

সিলেট নগরের বন্যাক্রান্তরাও খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সংকটে পড়েছেন বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। নগরের আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া অনেকে বলছেন, তারা প্রয়োজনীয় খাবার সহায়তা পাচ্ছেননা। খাবার সংকটে তাদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ বরাদ্দ একেবারেই কম। এ অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন তারা। একইসাথে বিশুদ্ধ পানিও পাচ্ছেননা তারা। বৃষ্টির পানি জমিয়ে খাবার চাহিদা মেটাচ্ছেন। তাদের প্রশ্ন এভাবে আর কতদিন চলবে?

সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, আগামী রোববার পর্যন্ত সিলেটে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস আছে। রোববার দিবাগত রাত থেকে বৃষ্টিপাত কমে পরের দিন সোম ও মঙ্গলবার আকাশ পরিষ্কার হবে। এরপর ফের বৃষ্টিপাত হতে পারে।

Manual1 Ad Code

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত বুধবার কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিপদসীমার ১ দশমিক ৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় ওই পয়েন্টে পানি ছিল ১৩ দশমিক ৮৫ সেন্টিমিটার। ওই পয়েন্টে বিপদসীমা ছিল ১২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার।

এদিকে বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় সুরমা নদীর সিলেট পয়েন্টে পানি ছিল ১১ দশমিক ২৭ সেন্টিমিটার, যা বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ছিল ১১ দশমিক ২৮ সেন্টিমিটার। নদীর সিলেট পয়েন্টে বিপদসীমা ১০ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার।

Manual7 Ad Code

কুশিয়ারা নদীর পানি বুধবার বেলা তিনটা পর্যন্ত বিপদসীমার ১ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে বেলা তিনটা পর্যন্ত পানি ছিল ১৭ দশমিক ১৭ সেন্টিমিটার। শেওলা পয়েন্টে ছিল ১৩ দশমিক ৬২ সেন্টিমিটার। সেখানে বিপদসীমা ১৩ দশমিক শূন্য ৫ সেন্টিমিটার।

সারি নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম না করলেও বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। বৃহস্পতিবার বেল তিনটা পর্যন্ত নদীতে পানি ছিল ১১ দশমিক ৪৮ সেন্টিমিটার। ওই নদীর বিপদসীমা ১২ দশমিক ৩৫ সেন্টিমিটার।

জানা গেছে, ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে গত ৮ দিনে ২ হাজার ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেখান থেকে নেমে আসা ঢলেই বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে নগরের কালীঘাট, মহাজনপট্টি এলাকায় দেখা গেছে, সুরমা নদীসংলগ্ন কালীঘাটের খেয়াঘাট এলাকার অন্তত: ৩ শতাধিক দোকানপাটে পানি ঢুকেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বুকসমান পানি। সেসব দোকানের মালামাল সরিয়ে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর আগে পানিতে বেশ কিছু মালামালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

খেয়াঘাটসংলগ্ন হাজী আলকাছ মিয়ার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চারদিকে পানি। দোকানটি নিচু স্থানে ছিল। তবে দোকানের চারদিকে ইট-সিমেন্ট দিয়ে দেয়াল তুলে পানির প্রবেশপথ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এরপরও ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছিল পানি। সেগুলো বালতিতে করে বাইরে ফেলতে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের।

ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান বলেন, ‘পানি ঠেকাতে দিনরাত কষ্ট করছি। কিন্তু এরপরও ঠেকাতে পারছি না। বেচা-কেনার কথা বাদ দিলাম। এখন দোকানে থাকা মালগুলো রক্ষা করাই বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দোকানের পাশেই গুদাম। গুদাম আর দোকানের চারদিকে পানি। মালগুলো সরিয়ে নেব, এ উপায়ও নেই। পানি বাড়লে মালামাল রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। ক্ষয়ক্ষতি হলে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।’

নগেন্দ্র স্টোর নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী নগেন্দ্র দের দোকানে কোমরপানি। দোকানের ভেতরে থাকা পেঁয়াজে পানি লাগায় অনেকটা পচে গেছে। সেগুলো তিনি বাছাই করতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি বলেন, পেঁয়াজে পানি লেগে যাওয়ায় অনেকগুলো নষ্ট হয়েছে। ছোট ব্যবসায়ী হওয়ায় এ ক্ষতি পোষাতে অনেক কষ্ট হবে।

কালীঘাট এলাকায় মালামাল কিনতে এসেছিলেন নগরের বাগবাড়ি এলাকার ব্যবসায়ী সালাম মিয়া। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা করছি প্রায় ১৭ বছর ধরে। এর মধ্যে বলতে গেলে সপ্তাহে একবার কালীঘাটে আসি। কিন্তু এমন অবস্থা কখনো দেখিনি। পানির মধ্যে বেশ কয়েকটি দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। খোলা থাকা দোকানগুলোতে মালামালের বেশি দাম চাচ্ছে।’

কালীঘাটের অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, সুরমা নদীর পানি উপচে কালীঘাট এলাকার ৩ শতাধিক দোকানে ঢুকেছে।

সিলেটে ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে বোরো ধান। বোরোর পর এবার আউশেও আঘাত হানলো বন্যা। জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অফিসের হিসেবে, চলমান বন্যায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আউশ ধানের বীজতলা এক হাজার ৩০১ হেক্টর, বোরো ধান এক হাজার ৭০৪ হেক্টর এবং গ্রীষ্মকালীন সবজি এক হাজার ৪ হেক্টর পানিতে তলিয়ে গেছে।

শুক্রবার সকাল ১১টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সিলেট নগরীতে বৃস্টিপাত অব্যাহত ছিল। এরআগে বৃহস্পতিবার রাতেও ভারি বৃস্টিপাত হয়েছে।

Manual5 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code