BengaliEnglishFrenchSpanish
চাই শিক্ষিত মানুষ, সনদধারী নয় - BANGLANEWSUS.COM
  • ৬ই ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ


 

চাই শিক্ষিত মানুষ, সনদধারী নয়

banglanewsus.com
প্রকাশিত নভেম্বর ১৪, ২০২২
চাই শিক্ষিত মানুষ, সনদধারী নয়

আবুল কাশেম উজ্জ্বল :: শিক্ষা কেবল মৌলিক অধিকার নয়, এটা মানুষের মানবীয় গুণাবলী বিকাশের মাধ্যমও। যে কারনে শিক্ষার কোন বিকল্প আজো বের হয়নি এবং সেরকম কিছু হওয়ার সুযোগও নেই। সময়ের সাথে শিক্ষার বিস্থার হয়েছে, সুযোগ বেড়েছে এবং বাড়ছে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। জনসংখ্যা বাড়ছে বলে বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাহিদাও বাড়ছে এবং এ সুযোগে পাড়ায় পাড়ায় বিদ্যালয় আর কোচিং সেন্টার গিজ গিজ করছে। বাহারি বিদেশি নাম আর চাকচিক্যের জোরে বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা এখন তুঙ্গে, সরকারী বিদ্যালয়গুলো যেন অনেকটা ন্ম্নি ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ঠিকানা। অনেক অভিভাবকও সামাজিক দিক বিবেচনা করে সরকারী বিদ্যালয়ের প্রতি দুর্বল। সরকারী বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নিয়ে অনেকের অনেক প্রশ্ন আছে কিন্তু বেসরকারী দ্যালয়গুলোও যে প্রশ্নের উর্ধ্বে তাও বলা যাবেনা। সন্তান কোন ধরনের বিদ্যালয়ে পড়ল সেটা মূখ্য নয়, সে সঠিক শিক্ষাটা পেল কি-না তাই বিবেচ্য হওয়া উচিৎ।
শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করা যার মাধ্যমে সে নিজের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুটি ফল-সনদ অর্জন এবং মানবীয় যোগ্যতা অর্জন। সনদ দিয়ে আমরা কেবল শিক্ষার বাহ্যিক ফল অনুধাবন করতে পারি। এটা ব্যক্তির ভবিষ্যৎ জীবনে চাকুরী বা কর্মসংস্থানের ভাগ্য ঠিক করে দিতে পারে। এটা শিক্ষার ছোট দিক মাত্র যা দিয়ে কোন ব্যক্তিকে বাজারের চাহিদার নিরিখে যাচাই করা যায়, কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য যাচাই করা সম্ভব নয়। ব্যক্তির মানবিক উন্নয়ন, আচরণের পরিবর্তন কিংবা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তার দায় ও দায়িত্ব কতটা উপলব্ধি করতে পারলো- সনদ দিয়ে তা যাচাই করা সম্ভব নয়। অথচ শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে
ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করা নয়, বরং দায়িত্বশীল করা যা আমরা খুব কমই ভাবি। দুর্ভাগ্য যে আজ আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে ব্যক্তির সনদ হচ্ছে তার যোগ্যতার মাপকাঠি। যে কারনে আজ সবাই আমরা সনদ আর তকমা অর্জনে ব্যস্থ, মানুষ হতে নয়। কেবল শিক্ষার্থী নয়, তাদের অভিভাবকরাও সন্তানদের একইভাবে প্রস্তুত করেন এবং বাহ্যিক অর্জনের দিকটিই সর্ব্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। এভাবেই আজ অন্যায়ের কাছে ন্যায়, দুর্নীতির কাছে নীতি, অমানবিকতার কাছে মানবিকতা পরাজিত, অসহায় ও অনেকটা বিবর্জিতও বটে। আজ আমরা সনদকেই শিক্ষার প্রকৃত মানদন্ডে পরিণত করেছি এবং সনদধারীদের শিক্ষিত বলে গণ্য করি। উদ্দেশ্যের সাথে বাস্তবতার এমন অসম ব্যবধান সমাজে বিদ্যমান অপরাধ ও অনাচারের অন্যতম কারন এবং তা কেবল বাড়ছেই।

আমরা শিক্ষিত হতে পারছিনা বলেই মানবিকতা বিসর্জন দিচ্ছি। যে কারনে কোন অপরাধ চাক্ষুষ করার পরও আমরা অনায়াসে নির্লিপ্ত থাকি, যখন একজন ধর্ষন করে তখন অন্যরা মজা করে মোবাইলে ভিডিও ধারন করে। যখন কেউ বিপদে পড়ে সাহায্যের আকুতি জানায় তখন আমরা তা ফেইসবুকে প্রচার করি কিন্তু সাহায্য করিনা। এমনও দেখা গেছে যে দুর্ঘটনায় আহত মানুষকে সেবা দেয়ার চেয়ে ঘটনার ছবি তুলতে আমাদের আগ্রহ বেশী থাকে। এক্ষেত্রে আমাদের মিডিয়ার কোন কোন ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সরাসরি সম্প্রচারের জন্য আহত-রক্তাক্ত মানুষের নিকট ঘটনার বিবরণ জানার প্রয়াসও এক ধরণের অমানবিক আচরণ। বাণিজ্যিক যুগে আমাদের আবেগ ও মূল্যবোধও বাণিজ্যিক হয়ে যাচ্ছে। দান গ্রহীতার সম্মানের বিষয়টা বিবেচনা না করে সামান্য কিছু দান করে তা ফলাও করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করতে আমাদের বিবেকে একটুও বাধেনা।
এখন বিসিএসে প্রশাসন, পুলিশসহ কিছু ক্যাডারে চাকুরী পেতে অনেকেই মরিয়া। কিন্তু যখন দেখি চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ কারিগরি পেশার অনেকেই সাধারণ ক্যাডারে চাকুরী করছেন তখন মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। এদেশে একজন চিকিৎসক বৈধভাবে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করতে পারেন, কিন্তু তিনি যখন নিজের পেশা ছেড়ে প্রশাসন ক্যাডারে যান তখন ভাবতেই হয়, শিক্ষাটা যেন উদ্দেশ্যহীন হয়ে গেছে।
একই কথা অন্যান্য কারিগরি যোগ্যতা সম্পন্নদের বেলায়। যদি দেশ ও দশের সেবা করার মানসিকতা তৈরী হয়, তাহলে একজন চিকিৎসকের মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেয়ার কথা; কৃষিবিদের দেশের কৃষির উন্নয়নে কাজ করার কথা-পুলিশ বা প্রশাসনে কাজ করার কথা নয়।
প্রতি বছর কত টাকা দেশ থেকে অবৈধভাবে বিদেশ যায় এর সঠিক তথ্য জানা কঠিন কিন্তু সময় সময় অনেক কিছু জানা যায়। আমাদের শিক্ষা আমাদের শিখেয়েছে কিভাবে দেশের টাকা দিয়ে বিদেশে বাড়ি করতে। দুর্নীতি, অর্থ পাচারের সাথে নিশ্চয় দেশের অশিক্ষিত-স্বল্প শিক্ষিত কৃষক, মজুর জড়িত নয়।
বরং তারা পরিশ্রম করে, কর দেয় এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে। আমি আজো ভেবে পাই না, প্রজাতন্ত্রের সর্ব্বোচ্চ পদের একজন কর্মচারী যে বেতন পান, তা দিয়ে কিভাবে এত বিলাসী জীবন-যাপন করেন। নিশ্চয়, শিক্ষা তাদের আলাদিনের চেরাগের গোপন রহস্য শিখতে সাহায্য করেছে। আর আমার মত যারা আছেন, তাদের শিক্ষা বৃথা।
ক’জন বাবা-মা তাদের সন্তানদের নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রাধান্য দেন? বরং বিদ্যালয়ের ফলাফল নিয়ে আমাদের ব্যস্থতা এত বেশী যে আমরা ভুলেই যাই নৈতিকতার কথা। আমরা শিক্ষাকে কেবল একটি বস্তুগত অর্জন হিসেবে দেখছি বলে এর গভীরতা উপলব্ধি করিনা। ফলে শিক্ষা আমাদের চেতনা জাগ্রত করতে পারছে না। বরং আমরা আরো হীন, পরশ্রীকাতর ও আত্নকেন্দ্রীক হচ্ছি। আমরা কেবল আমাদের নিয়েই ভাবতে শিখছি বলেই দেশ, সমাজ ও এমনকি নিজের বাবা-মাকে অবহেলা করি। এ জন্যই অনেক শিক্ষিত ও পদস্থ সন্তানের বাবা-মা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন।
সরকারী রাস্তার নির্মাণ কাজ শেষ হতে না হতেই ভেঙ্গে যায়, রডের বদলে বাঁশ দেয়া হয়, নিম্ন মানের কাজের জন্য হাওড়ে বছর বছর বাঁধ ভেঙ্গে গরীব কৃষকের কান্নার রোল পড়ে। এসব কাজ তদারক করার জন্য আছেন উচ্চ শিক্ষিত প্রকৌশলী, কর্মকর্তা কিন্তু দায় নেয়ার লোক নেই। যখন লাইসেন্স ও পিটনেস বিহীন গাড়ি দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ যায়, তখন সব দোষ ঐ চালকের। অথচ তা দেখার কথা ছিল তথাকথিত শিক্ষিত ও দায়িত্বশীলদের। যখন আবরারেরমত মেধাবীর নিথর দেহ পড়ে থাকে আমরা বলি ছাত্র রাজনীতি। যখন নতুন ছাত্রদের সাথে র‌্যাগিং-এর নামে যাচ্ছেতাই আচরণ করা হয়, তখন সেটা হয়ে যায় ভদ্রতা শেখানো। হায়রে মানুষ, একই অঙ্গে কতরুপ! এ যদি হয় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মনোভাব, তাহলে তাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে কি আশা করতে পারি?

জাফলং-এর পাথর কোয়ারিতে অভিযান হলে ধরা পড়ে কিছু শ্রমিক আর যন্ত্র। বছরের পর বছর তাই দেখছি কিন্তু বন্ধ হয়না পরিবেশ বিনাশী কাজ। নিশ্চয় যন্ত্রগুলো অভুক্ত-অর্ধভুক্ত গরীব শ্রমিকের নয়।
পিকে হালদার, সাহেদ, রফিকরাতো শিক্ষিত, সনদধারী। তবে তারাই একমাত্র খলনায়ক নন, নিশ্চয় তাদেরও গুরু আছেন। হয়ত গুরুরও গুরু আছেন, সবাই শিক্ষিত কিন্তু নিরাপদে। যখন শেয়ার বাজারে ধ্বস নামে তখন বলা হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ভুল কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করায় এমন অবস্থা। অথচ অস্থিত্বহীন কোম্পানির শেয়ার বছরের পর বছর মার্কেটে সচল থাকে, তা দেখার দায়িত্ব কার?
এ রকম উদাহরণ হাজার হাজার, বলে শেষ করা যাবেনা। যারা এ কাজগুলো করেন তাদের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত, কেউ কেউ উচ্চ ডিগ্রীধারীও। তাহলে বুঝা যাচ্ছে আমাদের শিক্ষা আমাদের বাণিজ্যিক যোগ্যতা তৈরী করলেও মানবিকগুণ বিকাশ করতে পারছেনা। শিক্ষার হার বাড়লেও বাড়ছে না শিক্ষিতের প্রকৃত সংখ্যা। বরং বিপরীতমূখী প্রবণতা আমাদের নৈতিক চরিত্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর জন্য কেবল ব্যক্তি নয়, আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থার দায় আছে। তাই আমাদের দরকার শিক্ষিত কিন্তু মানবীয়গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ, সনদধারী নয়। দরকার শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন, নৈতিকতার উন্নয়ন।

লেখক : শিক্ষক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট

এই সংবাদটি 1,252 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।