আজীবন সৎ, ত্যাগী জননেতা মোঃ শাহজাহান মিয়া

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Manual7 Ad Code

সংগ্রাম দত্ত

সিলেট বিভাগের আপসহীন ত্যাগী সংগ্রামী নেতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মোঃ শাহজাহান মিয়া ১৯৩৮ সালে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানার কালাপুর ইউনিয়ন এর লামুয়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে শিক্ষা জীবনের ইতি টেনে এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর সংকল্প নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন।

Manual1 Ad Code

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা ঘোষণা করার দাবী তোলা হয়।
পাক সরকার নানা ইস্যুতে বাংলাকে কটাক্ষ করতে থাকে। এর প্রতিবাদে বুদ্ধিজীবি ও সচেতন রাজনীতিবদরা সারাদেশে আন্দোলন শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণার দাবীতে শ্রীমঙ্গলে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৫২ এর ২১ শে ফেব্রুয়ারী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে শ্রীমঙ্গলে তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলেন পশ্চিমা পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। তখন থেকেই পরিচিত হয়ে উঠেন জনতার সাথে।

১৯৫৭ সালে জননেতা মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী নেতৃত্বে ন্যাপ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি গরীব ও মেহনতী মানুষের মুক্তির জন্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে ন্যাপে যোগদেন। ন্যাপকে সামনে রেখে তিনি সকল অন্যায়-অত্যাচার-অনাচার-সাম্প্রদায়িকতা-সাম্রাজ্যবাদ ও শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আপসহীন ভাবে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ন্যাপকে সংগঠিত করতে থাকেন।

Manual6 Ad Code

১৯৬২ সালে পাক জেনারেল আইয়ুব খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শিক্ষা আন্দোলনে এলাকার ছাত্রদের উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়ে সচেতন করে তোলেন।
স্বাধিকার আন্দোলনে এলাকার জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করায় তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

’৬৩ সালে পাক আমলের ধনিক শ্রেণী শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা পাহাড় এর বিস্তীর্ণ এলাকার ১৬ হাজার ৬০ একর জমির ১২ হাজার একর ভূমি লিজ নিয়ে এলাকায় বসবাসকারী টিপরা, চা শ্রমিক বংশোদ্ভুত লোকজন, পাহাড় কামলা, বেকার, দিনমজুর, কর্মজীবি কৃষক ও শ্রমিককে উচ্ছেদ করতে চাচ্ছিলো। ধনী চা বাগান মালিক গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে পাক সরকারের
পুলিশ-ম্যাজিষ্ট্রেটকে লেলিয়ে দিলো তাদের বিরুদ্ধে। সেই চা বাগান বন্দোবস্তকারী তৎকালীন ধনাঢ্য ব্যক্তি এম.এল.এ কেরামত আলী, হামিদুর রহমান, এম আর খান, জহীরুল কাইয়ুম, মামুনুর রশীদ গনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অধিকার সংরক্ষনের জন্য বালিশিরা এলাকার মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন। তৎকালীন সময়ে দেশবরণ্য নেতারা প্রখ্যাত ন্যাপ নেতা শাহজাহান-এর নেতৃত্বেই বালিশিরা এলাকার মানুষকে সমবেত ও সংগঠিত করে পূর্ব পাকিস্তানে দুর্বার গণ আন্দোলন গড়ে তোলেন। বাধ্য হয় পাক সরকার নতি স্বীকার করতে। সেদিনকার আন্দোলনে যারা মোঃ শাহজাহানকে দেখেছেন তারা কখনোই ভুলতে পারবে না এই মহান নেতাকে। আন্দোলন এতই তীব্ররূপ ধারণ করেছিলো যে তৎকালীন প্রাদেশিক গভর্ণর জেনারেল আজম খানকে পর্যন্ত ঘটনাস্থলে আসতে হয়েছিল। তাঁর আশ্বাস অনুযায়ী স্থানীয় কৃষকদের পাহাড়ী জমি বন্দোবস্তের ব্যাপারে আংশিক সুরাহা হয়েছিল। এ ঘটনার পর থেকে প্রতিবছরই শ্রীমঙ্গলে ন্যাপনেতা মোঃ শাহজাহান ও রাসেন্দ্র দত্তের প্রচেষ্টায় বালিশিরার শহীদ দিবস ১৯ শে ফেব্রুয়ারী পালন করা হত।

Manual3 Ad Code

স্বাধীনতার পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণীর প্রভাব শালী নেতা কর্মী ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বালিশিরা ইউ এস এফ এর জমিতে কোটি কোটি টাকার বনাঞ্চল উজাড় করতে থাকে। এর প্রতিবাদে তিনি প্রতিবাদ, মিছিল ও মিটিং করেছেন প্রায় ২০ বছর। তাঁর শেষ জীবনে বয়স বাড়ার সাথে ও আর্থিক দৈনতার কারণে এ আন্দোলনের তীব্রতা কমে যায়। অনেকে আবার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হয়ে আন্দোলনকে ছুরিকাঘাত করেছে। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তান চা শ্রমিক সংঘ- এর নেতৃত্বে থেকে বিশাল চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রশ্নে আন্দোলন করেছেন দীর্ঘদিন। এর পাশাপাশি তৎকালীন সিলেট জেলার বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব ও তিনি দিয়েছেন।

১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহ এর সম্মিলিত বিরোধীদলের পক্ষে যে নির্বাচনী পরিচালনা কমিটি শ্রীমঙ্গলে হয় তিনি তার অন্যতম সদস্য ছিলেন। এসময়ে নির্বাচন পরিচলনা করতে গিয়ে শাসক গোষ্ঠীর হাতে তিনি আক্রমনের শিকার হন।
শ্রীমঙ্গল থানায় কমিউনিস্ট পার্টির সেলের তিনজনের যে কমিটি ছিল তিনি সেই কমিটির একজন। অপর দুজন হচ্ছেন প্রফেসর সৈয়দ মুয়ীজূর রহমান ও রাসেন্দ্র দত্ত। ওই সেলের আহ্বায়ক হিসেবে রাসেন্দ্র দত্ত নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

Manual3 Ad Code

’৬৯ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারীর ক’দিন পূর্বে যে কজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের প্রচেষ্টায় শ্রীমঙ্গল পৌর টাউন কমিটির মাঠে মুসলীম লীগের প্রবল বিরোধীতা সত্ত্বেও শ্রীমঙ্গলে প্রথম শহীদ মিনার গড়ে তুলেছিলেন তিনি তাদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি ছিলেন।

’৭০ সালের ৬ এপ্রিল পাকিস্তান সরকারের পুলিশ তাঁকে বিছিন্নতাবাদী আন্দোলন করা এবং পাকিস্তান ভাঙ্গার অভিযোগে জয়বাংলা মামলায় সিক্সটি এমএল আর ক্লজ এইট এ ৮ (ক) ধারা বলে গ্রেফতার করে। এসময় তিনি ছাড়াও এ অভিযোগে ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত, ছাত্রলীগনেতা এম.এ রহিম ও এস.এ মুজিবকে গ্রেফতার করে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় হাজার হাজার জনতা তাদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় ন্যাপ নেতা, ডাকসুর সাবেক ভিপি আহমেদুল কবীর ও যুগের অগ্নিকন্যা বলে কথিত ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ঐদিনই শ্রীমঙ্গল পৌর সভা মাঠে ন্যাপের জনসভায় তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবী করেন। পরদিন মৌলভীবাজার মহকুমাবাসীর তীব্র আন্দোলনের মুখে পাক সরকার তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

এছাড়া তিনি পাক আমলে সিলেটকে প্রদেশ ঘোষণা ও সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবীতে আন্দোলন করার দায়ে পাক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে দেয়।

’৭১ এর ১লা মার্চ পাক সরকারের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান সারাদেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন। এ ভাষণ শেষ হবার পরই শ্রীমঙ্গল পৌরসভা প্রাঙ্গন থেকে ন্যাপ নেতা মোঃ শাহজাহান সহ অপর দুজন জাদরেল ন্যাপ নেতা যথাক্রমে রাসেন্দ্র দত্ত ও সৈয়দ মুয়ীজুর রহমান মিলে প্রথমে শহরে মিছিল বের করেন। এরপরই আওয়ামীলীগ ও ন্যাপের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেয়। এভাবেই তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে বিশেষ অবদান রাখেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  • আজীবন সৎ
  • ত্যাগী জননেতা মোঃ শাহজাহান মিয়া
  • Manual1 Ad Code
    Manual2 Ad Code