আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মৌলভীবাজার জেলার চারটি আসনের মনোনয়ন ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে মৌলভীবাজার–২ (কুলাউড়া) আসন। এখানে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শওকতুল ইসলাম শকু। তবে দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে সংগ্রাম করা তৃণমূলের ভরসা, কুলাউড়ার সুপরিচিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ এন এম আবেদ রাজাকে মনোনয়ন না দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (৩ নভেম্বর) রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে শওকতুল ইসলাম শকুর নাম ঘোষণা করেন। নাম ঘোষণার পর শওকতুল ইসলাম শকু বলেন, “দলের ঐক্যই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সবাই মিলে কাজ করলে কুলাউড়া আসন পুনরুদ্ধার সম্ভব।”
মনোনয়ন ঘোষণার পর কুলাউড়া শহরে উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একটি অংশ আনন্দ মিছিল বের করে। মিছিল শেষে চৌমুহনী এলাকায় পথসভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল, সাবেক আহ্বায়ক রেদওয়ান খান ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ চৌধুরী।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে তৃণমূলের জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতা অ্যাডভোকেট এ এন এম আবেদ রাজাকে মনোনয়ন না দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ও হতাশার স্রোত। উপজেলা সদর থেকে ১৩টি ইউনিয়ন পর্যন্ত স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া—এটি ত্যাগী নেতার প্রতি অবমূল্যায়ন এবং তৃণমূলকে উপেক্ষার সিদ্ধান্ত।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকে বিএনপির রাজপথের আন্দোলনে অন্যতম সামনের সারির নেতা ছিলেন অ্যাডভোকেট আবেদ রাজা। ২০১৩–১৪ আন্দোলনে তিনি একাধিক মামলার শিকার হন এবং কারাবরণ করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনী দমন–পীড়নের সময় শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হলে তিনি আইনি সহায়তার মাধ্যমে সবার পাশে দাঁড়ান। ২০২২–২৪ সালের আন্দোলনে—বিশেষ করে বিদ্যুৎ–গ্যাস সংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও কুলাউড়া রেলপথ আন্দোলনে—তার নেতৃত্ব সবচেয়ে দৃশ্যমান ছিল।
তৃণমূল নেতারা অভিযোগ করছেন, “যে নেতা দুঃসময়ে সবসময় মাঠে ছিলেন, তাকে বাদ দেওয়া বড় ভুল।” তাদের ভাষায়, “ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না হলে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়বে।” তাদের মতে, কুলাউড়ার জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী ছিলেন অ্যাডভোকেট আবেদ রাজা।
মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে অনেকেই লিখছেন—“১৭ বছরের রাজপথের সংগ্রামী নেতাকে বঞ্চিত করা তৃণমূল মেনে নেবে না।” তাদের দাবি—এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনী মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মনোনয়ন ঘোষণার পর মৌলভীবাজার–২ আসনে বিএনপির ভেতরে বিভেদ আরও গভীর হয়েছে। শওকতুল ইসলাম শকুকে কেন্দ্র করে আনন্দ মিছিল বের হলেও মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে অ্যাডভোকেট আবেদ রাজাকে কেন্দ্র করে। বিশ্লেষকদের মতে, ত্যাগী নেতার বঞ্চনার ক্ষোভ সামলাতে না পারলে দলের নির্বাচনী সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যদিও শওকতুল ইসলাম শকু আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন পেয়েছেন, তবুও কুলাউড়ার রাজনৈতিক আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও রয়েছেন অ্যাডভোকেট এ এন এম আবেদ রাজা। তৃণমূলের একটাই দাবি—ত্যাগী নেতার যথাযথ মূল্যায়ন এবং তার ১৭ বছরের সংগ্রামের প্রতি সম্মান।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।