ডেস্ক রিপোর্ট : রয়টার্সের গণনায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক শত্রুদের একটি হিসাব পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে রয়েছে কমপক্ষে ৪৭০ ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের শাস্তি দেওয়ার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিকে সরকার পরিচালনার কৌশলগত নীতিতে রূপ দিয়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প।
রিপাবলিকান এ রাজনীতিক ২০২৩ সালের মার্চে ‘আমিই তোমার প্রতিশোধ’ নামে উসকানিমূলক যে ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তোলার চেষ্টা শুরু করেন, সেটিই শক্তিশালী হয়ে এখন রূপ নিয়েছে ধরে নেওয়া শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ অভিযানে। এর অংশ হিসেবে ঢেলে সাজানো হচ্ছে ফেডারেল নীতি, কর্মীর সংখ্যা ও আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগের মতো বিষয়গুলোকে।
লক্ষ্যবস্তু কারা
রয়টার্সের গণনায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক শত্রুদের একটি হিসাব পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে রয়েছে কমপক্ষে ৪৭০ ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতিশোধের জন্য তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। সে হিসাবে গড়ে এক দিনে প্রতিশোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয় একাধিক ব্যক্তি বা সত্তাকে।
শত্রু মনে হওয়া কাউকে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদের বিষয়ে নেওয়া হয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থা। রয়টার্সের হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারগুলোকে। একই সঙ্গে ফেডারেল সংস্থাগুলোতে জনবল কমানোর অংশ হিসেবে যেসব কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে, তাদেরও ধরা হয়নি গণনায়।
কেন এ প্রতিশোধ
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রতিশোধ অভিযানে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাকে কাজে লাগানো হচ্ছে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায়।
তার প্রশাসন শত্রু গণ্য করা লোকজনকে শাস্তি দিতে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। এর একটি উদাহরণ হলো অ্যামেরিকায় ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল উল্টে দিতে ট্রাম্পের চেষ্টার বিষয়ে তদন্তকারী প্রসিকিউটরদের বরখাস্ত, বিরোধী মনে হওয়া সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শাস্তির আদেশ, বিরোধীদের সঙ্গে যুক্ত আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শাস্তি দেওয়া এবং নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা বেসামরিক কর্মীদের একঘরে করে রাখা।
ট্রাম্প ও তার নিয়োগপ্রাপ্তরা একই সঙ্গে সরকারকে মতাদর্শ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর অংশ হিসেবে এমন সামরিক নেতাদের বরখাস্ত করা হয়েছে, ট্রাম্প ও তার অনুগতরা যাদের ‘ওক’ (বর্ণবাদ ও অসাম্যের মতো সামাজিক সমস্যা সমন্ধে সচতেন) মনে করেছেন।
এর বাইরে ট্রাম্প ও তার নিয়োগপ্রাপ্তদের বিবেচনায় যেসব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে বিভেদ সৃষ্টিকারী মনে হয়েছে, সেগুলোর তহবিল কর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রমে বৈচিত্র্য বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা অনুদান আটকে দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে যে ফল পেল রয়টার্স
ট্রাম্প কিংবা তার অধীনস্তরা প্রতিশোধের জন্য প্রকাশ্যে বাছাই করেছে, এমন প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে রয়টার্স। এ ছাড়া বার্তা সংস্থাটি শত শত সরকারি আদেশ, নির্দেশনা ও নথিপত্র পর্যালোচনা করেছে। এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ট্রাম্পের সমুচিত প্রতিশোধের এ যাবতকালের সবচেয়ে সমন্বিত হিসাব পাওয়া গেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে মোটাদাগে দুই ধরনের ব্যক্তি ও সংগঠন পাওয়া গেছে, যাদের প্রতিশোধের জন্য লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে।
প্রথম গ্রুপ
এ ধরনের গ্রুপের আওতায় কমপক্ষে ২৪৭ ব্যক্তি ও সত্তা রয়েছে, যাদের সরাসরি নাম ধরে আলাদা করা হয়েছে। এ কাজটি হয় ট্রাম্প বা তার নিয়োগপ্রাপ্তরা প্রকাশ্যে করেছেন নতুবা তার নিয়োগপ্রাপ্তরা সরকারি মেমো, আদালতে জমা দেওয়া নথি অথবা অন্য নথিপত্রে করেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদকরা এমন দেড় শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কিংবা তাদের সঙ্গে অন্যভাবে যোগাযোগ করেছেন।
দ্বিতীয় গ্রুপ
বৃহত্তর প্রতিশোধচেষ্টার শিকার হওয়া আরও ২২৪ জন ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের সরাসরি নাম ধরে ডাকা হয়নি, তবে শত্রু মনে হওয়া লোকজনের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থার শিকার হন তারা। তাদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন প্রসিকিউটর ও ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-এফবিআইয়ের এজেন্ট। তাদের চাকরিচ্যুতিতে বা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এসব ব্যক্তি ট্রাম্প বা মিত্রদের মামলা নিয়ে কাজ করছিলেন অথবা তাদের ‘ওক’ মনে করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওক মনে হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৬ জন রয়েছেন এফবিআই এজেন্ট, যারা ২০২০ সালে হওয়া ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার বিক্ষোভে হাঁটু গেড়ে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন। এ গ্রুপের বাকিরা সরকারি কর্মী, যাদের বেশির ভাগকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রকাশ্য বিরোধিতা কিংবা স্বাস্থ্য, পরিবেশ বা বিজ্ঞান বিষয়ে প্রশাসনের নির্দেশনার বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। ট্রাম্প বা তার প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত, চ্যালেঞ্জ কিংবা অন্য কোনোভাবে বিরোধিতা করা কমপক্ষে ১২৮ ফেডারেল কর্মী বা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত কমপক্ষে ৪৬২টি ঘটনা পেয়েছে রয়টার্স।
তদন্ত বা সাজার হুমকি
ট্রাম্প ও তার টিমের প্রতিশোধের আরেকটি ধরন হলো তদন্ত বা সাজার হুমকি। প্রশাসন কমপক্ষে ৪৬ ব্যক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্য সত্তার বিরুদ্ধে তদন্ত বা সাজার হুমকি দিয়েছে। এসব হুমকির মধ্যে নিউ ইয়র্ক ও শিকাগোর মতো ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন শহরগুলোতে ফেডারেল তহবিল আটকে দেওয়া।সুদের হার কর্তন ঠেকানো ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ার জেরোম পাওয়েলকে বরখাস্তের বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করছেন ট্রাম্প। গত সপ্তাহে কংগ্রেসের ছয় ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করার হুমকি দেন প্রেসিডেন্ট। তার ভাষ্য, এ অপরাধের সাজা মৃত্যুদণ্ড। সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যে ‘অবৈধ আদেশ’ অমান্য করতে পারেন, সেটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন ওই ছয় আইনপ্রণেতা।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।