অত্যাধিক বন্দির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ১ মাস আগে

Manual8 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: কারাগারগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। অতিরিক্ত বন্দিতে ঠাসা। দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি সামাল দিতে কারা কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেশে মোট ৭৫টি কারাগারে ৪৫ হাজার ২৮৬ বন্দি ধারণক্ষমতা থাকলেও বন্দি রয়েছে ৯০ লাখেরও বেশি। মূলত নির্ধারিত সময়ে বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান এবং নানা কারণে আটক-গ্রেপ্তার বেড়ে গেলে কারাগারে বেড়ে যায় বন্দির সংখ্যাও। জুলাই আন্দোলনের পর দেশে মামলা ও আসামির সংখ্যা বাড়ায় কারাগারে বেড়েছে বন্দির সংখ্যাও। কারা অধিদপ্তর এবং মানবাধিকার সংগঠন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতিদিন দেশের কারাগারগুলোতে আনা হয় গড়ে দুই হাজার ৭০০ নতুন বন্দি। আর জামিনে বা সাজা খেটে প্রতিদিনই যে পরিমাণ বন্দি বেরিয়ে যায় তার পরিমাণ কম। প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ৬৮৭ জন বন্দি রিলিজ হয়। ঢাকা বিভাগে কেরানীগঞ্জ এবং গাজীপুরের কাশিমপুর মিলিয়ে ৬টি কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশে ঘোষিত মোট ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার রয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় সব কারাগারেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি সংখ্যক বন্দি রয়েছে। ঢাকা কেরানিগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ধারণক্ষমতা চার হাজার ৫৯০ জন হলেও গত জুলাই পর্যন্ত ওই কারাগারে ১২ হাজার ৫৯ জন বন্দি ছিলো। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ ধারণক্ষমতা-৫৪৮ জনের জায়গায় বন্দি ছিলো এক হাজার ৭৬৩ জন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ ধারণক্ষমতা-২ হাজারের মতো হলেও বর্তমানে বন্দির সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের ধারণক্ষমতা ১০০০ জনের হলেও সেখানে বন্দি রয়েছেন প্রায় ৩ হাজার।

Manual7 Ad Code

সূত্র জানায়, বর্তমানে কারাগারে মাদক মামলার বন্দিই সবচেয়ে বেশি। কারাগারগুলোতে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত মাদক মামলায় অন্তত ১৮ হাজারের মতো বন্দি ছিলো। আর জুলাই আন্দোলনেকালে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে কারাগারগুলোতে প্রায় ৮৮ হাজার বন্দি ছিলো। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে বন্দির সংখ্যা কমে ৪৯ হাজারে দাঁড়ায়। তবে বছর শেষে তা বেড়ে ৬০ হাজারের মতো হয়। আর গত বছরের জুলাই পর্যন্ত ওই বন্দির সংখ্যা ছিল ৭৭ হাজার ২৯১ জন। আর চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বন্দির সংখ্যা ৯৩ হাজার ৪৪০ জনে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বিগত ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়ের হত্যা মামলায় ৪৬৫ জন এবং হত্যাচেষ্টা মামলায় ৩৭১ জন বন্দি রয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ৪১৪ জন এবং রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ৬৮ জন বন্দি রয়েছে।

Manual5 Ad Code

সূত্র আরো জানায়, দেশের কারাগারগুলোর ধারণ ক্ষমতার মোট ৪৫ হাজার ২৮৬ জন বন্দির মধ্যে পুরুষ বন্দির ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ২৫৭ জন এবং মহিলা বন্দির ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯ জন। কিন্তু জুলাই পর্যন্ত কারাগারে ৮৯ হাজার ৯২৯ জন পুরুষ ও ৩ হাজার ৫১১ জন নারী বন্দিসহ মোট ৯৩ হাজার ৪৪০ জন বন্দি ছিলো। ওই মোট বন্দিদের মধ্যে কয়েদি বা দন্ডপ্রাপ্ত বন্দি মাত্র ৩০ হাজার ৩৮৫ জন। তাছাড়া ফাঁসির দণ্ড পাওয়া বন্দি দুই হাজার ৫৮০ জন, যাদের মধ্যে ৭৬ জন নারী। আর বিগত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত বিগত আওয়ামী লীগ আমলের ৪৫ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ৭৬ এমপি, ৫৩ পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৮ আমলা বন্দি রয়েছে।

এদিকে কারাগারগুলোতে কয়েদির চেয়ে হাজতি বন্দিই বেশি থাকে। বন্দিদের মধ্যে যাদের মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হয়ে আদালতের মাধ্যমে দণ্ড পায়, তাদের কয়েদি বলা হয়। আর যেসব মামলার আসামিদের বিচার কার্যক্রম চলমান থাকে তারা হাজতি হিসেবে পরিচিত। কারাগারের ৯৩ হাজার ৪৪০ বন্দির মধ্যে এখন কয়েদি রয়েছে ৩০ হাজার ৩৮৫ জন। বাকি ৬৩ হাজারের মতো বন্দির বিচার কার্যক্রম চলমান। গত ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে থাকা প্রায় ৮০ হাজার বন্দির মধ্যে ৭৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ ছিল হাজতি। তার আগের বছর কারাগারগুলোতে বিচারাধীন বন্দি (হাজতি) ছিলেন অন্তত ৫৫ হাজার। আর ২০২৩ সালে দেশের কারাগারগুলোতে অন্তত ৫৭ হাজার হাজতি ছিলো, যা ওই বছরের মোট বন্দির ৭৪ শতাংশ। কোনো কারাগারের অন্তত ৩০ ভাগ কয়েদি থাকলে ওই কারাগারের পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা ভালো থাকে। কারণ দন্ডপ্রাপ্ত ওই বন্দিরাই কারাগারে পরিচ্ছন্নতাসহ নানা ধরনের কাজ করে থাকে। কিন্তু কয়েদির চেয়ে হাজতি বন্দি বেশি হয়ে গেলে কারাগারের কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন।

অন্যদিকে মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বা দ্বিগুণ বন্দির কারণে স্বাভাবিকভাবেই বন্দিদের স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, চিকিৎসা ও বাসস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বছরের পর বছর ধরে এ অবস্থা চললেও পরিস্থিতি জটিল আকার নেবে। তাছাড়া তাতে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বন্দিদের জন্য ঘোষিত অধিকারও। দেশের কারাগারগুলোতে সবসময়ই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি থাকছে। সেজন্য প্রয়োজনে আরো বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কারাগার তৈরি করা যেতে পারে। যদিও গত কয়েক বছরে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে আসামি এবং বন্দির সংখ্যাও বেড়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক মামলা এবং গ্রেপ্তার বেড়ে যাওয়ার কারণেও বন্দির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আর কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি থাকলে মানসম্পন্ন খাবারে চাপ পড়বে, বন্দির চলাফেরা সংকুচিত হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। তার প্রভাব পড়ে শরীরে। ফলে বন্দিরা পেটের পীড়া, চুলকানি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো রোগে ভোগে।

Manual3 Ad Code

এ প্রসঙ্গে কারা অধিদপ্তরের সাবেক ডিআইজি মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী জানান, সব সময়ই কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি ছিলো। তবে কারা কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা থাকলে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি ব্যবস্থাপনা করা সমস্যা নয়। বর্তমান আইজি প্রিজন্স আন্তরিকভাবেই তা করছেন। মূলত বিচার কার্যক্রম দ্রুতত শেষ না হওয়ায় কারাগারে কয়েদির চেয়ে হাজতি বন্দি বেশি থাকে। সেজন্য বিচারের গতি বাড়ানো জরুরি। তানা হলে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

Manual7 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code