একুশ শতকের উচ্চশিক্ষা ও বাংলাদেশ

লেখক:
প্রকাশ: ৮ years ago

Manual4 Ad Code
বিশ শতকের শেষ এবং একুশ শতকের শুরুর বছরে ইতালির বলাইনা শহরে ‘বলাইনা ঘোষণার’ মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষার যুগান্তকারী এক রূপরেখা প্রবর্তিত হয়। সরকারি কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক-ছাত্রসহ সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে নতুন সহস্রাব্দের সূচনায় পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এক কার্যকর সময়োপযোগী উচ্চশিক্ষা পলিসির উন্মেষ ঘটান। তাদের লক্ষ্য ছিলো পরিবর্তনশীল শ্রম বাজারের চাহিদা মেটানোর উপযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতির আধুনিকায়ন। প্রবল প্রতিযোগিতা মুখর কর্পোরেট বিশ্বে চাকরির জন্য দরকারি  উচ্চতর দক্ষতার মাত্রা বাড়ার সাথে সাথে উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তার চাহিদা বাড়তে থাকলে উচ্চ শিক্ষার এই সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বলাইনা প্রক্রিয়ার মূল ফোকাস ছিলো: উচ্চ শিক্ষার তিনচক্র পদ্ধতির (ব্যাচেলার/ মাস্টার্স/ ডক্টরেট) প্রবর্তন; কোয়ালিটি এসিওরেন্স প্রক্রিয়ার প্রবর্তন; সমন্বিত এবং সমকেন্দ্রমুখী শিক্ষা পদ্ধতির প্রবর্তন; পদ্ধতিসমূহকে অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক করা এবং স্নাতকদের নিয়োগযোগ্যতা বাড়ানো। বিশ শতকের বৈচিত্র্যপূর্ণ ঐতিহ্যিক ইউরোপীয় উচ্চশিক্ষা পদ্ধতির কারণে যখন এক দেশের অর্জিত ডিগ্রি অন্য দেশে নিয়োগ প্রাপ্তির জন্য কঠিন হতে শুরু করে কিংবা এক দেশে অর্জিত কোর্স ক্রেডিট অন্য দেশে স্থানান্তর করা কঠিন হয়, তখন এই সমন্বিত প্রক্রিয়া শিক্ষার্থী এবং চাকরিপ্রার্থী উভয়ের জন্যেই দরকারি হয়ে পড়ে।
একুশ শতকের শিক্ষা ব্যবস্থা সেই পদ্ধতি প্রয়োগের পরামর্শ দেয় যা উপাদানের (content) সাথে দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারে। দক্ষতা অর্জন ছাড়া শিক্ষার্থীরা বস্তুত নিষ্ক্রিয় মুখস্থ যন্ত্রে পরিণত হয় এবং দিনশেষে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অসার প্রমাণিত হয়। আবার যথাযথ আধেয় (content)  জ্ঞান ছাড়া সমস্যা সমাধানমূলক কিংবা যূথবদ্ধ কর্মসম্পাদন সম্ভব নয়। একুশ শতকের উচ্চশিক্ষা প্যারাডাইম যথাযথভাবে অধীত বিষয়ের উপকরণ এবং দক্ষতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল ও উদ্ভাবনক্ষম হয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। একুশ শতকের শিক্ষাব্যবস্থাকে অধিকতর উপযোগী এবং কার্যকর করতে নিত্যনতুন কলাকৌশল উদ্ভাবিত হচ্ছে এবং বর্ধিষ্ণু প্রযুক্তির হাত ধরে সেগুলো আরো শানিত হচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল, নিবিড়ভাবে আন্তঃসম্পর্কিত প্রতিযোগিতাময় এই জটিল বিশ্বে নির্বিঘ্নে অভিযোজনের জন্য শক্ত বিচারবোধ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। এসব বিবেচনায় রেখে সাম্প্রতিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এখন সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নৈতিক ও পেশাগত দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তি তথ্যাধিকার নিশ্চিত করছে, সার্বক্ষণিক সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। যৌথ ডিজিটাল প্রকরণ ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাবিদেরা বর্তমান প্রজন্মের জন্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেন। অধিকন্তু, ছাত্রদের জীবন-শিক্ষার্থী বানাতেও একুশ শতকের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবনা-পুনর্ভাবনা হচ্ছে।
একুশ শতকের শিক্ষা ব্যবস্থার সারকথা হলো: আধুনিক প্রযুক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আধুনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। কোনো বিশেষ বিষয়ে জ্ঞানার্জন করে ক্ষান্ত থাকা একুশ শতকের শিক্ষানীতির পরিপন্থি। অধীত বিষয় বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক করে তোলা এবং সমালোচনা জ্ঞান ও সহযোগিতার দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাকে নতুন করে বিন্যস্ত করাই এ সময়ের চাহিদা। জীবনভর চলমানভাবে অনুসন্ধিত্সু থাকা এবং জ্ঞানান্বেষণ চালিয়ে যাওয়ার ওপর আধুনিক উচ্চশিক্ষা নীতি গুরুত্ব দেয়। চূড়ান্ত বিচারে একুশ শতকের উচ্চশিক্ষা শিক্ষার্থী-পরিচালিত। অতীতের সকল শিক্ষা পদ্ধতির গল্পগুলো আজ পুরনো হয়ে যাচ্ছে। স্থান-কাল এবং পাত্রের নিরন্তর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যক্তিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক এবং বৈশ্বিক প্রয়োজনের নিরিখেই উদ্ভাবিত হচ্ছে নিত্যনতুন প্রকৌশল। সেসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকাই বুদ্ধিমানের লক্ষণ।
ইউরোপের ‘বলাইনা প্রসেসের’ প্রভাব বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায়ও পড়েছে। বস্তুত উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের এই বৈশ্বিক অভিযাত্রায় বাংলাদেশও পিছিয়ে থাকতে চায়নি। আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের পঠন-পাঠন গবেষণা ও সম্প্রসারণের গুণগত উত্কর্ষ সাধনের জন্য ইউজিসির নেতৃত্বে ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কোয়ালিটি এসিউরেন্স ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে।
উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণে বাংলাদেশেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৫০ হাজারের নিচেই সীমাবদ্ধ ছিলো, বর্তমানে তা পঁয়ত্রিশ লাখ ছড়িয়ে গেছে। ৪২টি সরকারি এবং ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য HEQEP (Higher Education Quality Enhancement Project)-এর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তত্ত্বাবধানে কোয়ালিটি এসিউরেন্স কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে Institutional Quality Assurance Cell (IQAC)-গঠনের মধ্য দিয়ে স্নাতক উত্পাদনকারী বিভাগসমূহের শিক্ষা গবেষণার মান নিরূপণের জন্য সমন্বিত সার্ভে টুলসের মাধ্যমে প্রধান পাঁচটি স্টেকহোল্ডার— ছাত্র, শিক্ষক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী অ্যালামনাই এবং তাদের নিয়োগকর্তাদের ভেতর জরিপ চালানো হচ্ছে। তার ওপর ভিত্তি করে সেলফ এসেসমেন্ট রিপোর্ট প্রস্তুত করার পর পুরো প্রক্রিয়া এক্সটারনাল পিয়ার রিভিউ করার জন্য একজন বিদেশি কোয়ালিটি এসিওরেন্স বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি টিম ৩ দিন ধরে উক্ত বিভাগে রিভিউ কাজ চালাচ্ছেন। সেলফ এসেসমেন্ট রিপোর্ট-এর ফাইন্ডিংস এবং এক্সটারনাল পিয়ার রিভিউ টিমের প্রতিবেদনের নিরিখে পরে উক্ত বিভাগের পঠন পাঠন ও গবেষণায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হবে। এবং নিয়মিত ভিত্তিতে এ ধরনের সেলফ এসেসমেন্ট এবং তত্-পরবর্তী রিভিউ ক্রমাগত বিভাগটি কর্তৃক প্রদেয় ডিগ্রিসমূহের গুণগত মান বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের চাকরিযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে। তাছাড়া পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে যে মিথস্ক্রিয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় তা ডিগ্রিসমূহকে এবং ডিগ্রিধারীদের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় সংসদে বিল পাস করা এদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি মাইলফলক। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন, বৈরী পরিবেশ ও প্রতিবেশে টেকসই অস্তিত্ব সংরক্ষণ ও দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে জাতির সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার উচ্চশিক্ষায় কোয়ালিটি এসিওরেন্স মেকানিজম নিশ্চিত করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। জাতীয় বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণা খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া এবং প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ তাকে একুশ শতকের উচ্চশিক্ষায় এক বিশ্ব সারথির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় ও গবেষণায় যে কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে, তাতে এর সার্বিক সাফল্য এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code