গোলাম মওলা রনি :
ফরিদপুর জেলার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন গোলাম মওলা রনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং একই বিষয়ে অধ্যয়ন করেছেন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা হলেও ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। টিভি মিডিয়ার টকশোতে এবং প্রিন্ট মিডিয়ার লেখনীতে স্বকীয় একটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং লেখার মান ও বক্তৃতার জাদুময়তায় আলোচিত হয়েছেন দেশে-বিদেশে। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আসিফ সোহান
রাজনীতিতে জড়ালেন কীভাবে?
গোলাম মওলা রনি : আসলে রাজনীতিটা আমাদের পারিবারিক ব্লাডেই আছে। আমরা মূলত হাজী শরিয়তউল্লাহর বংশধর। আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও ধর্মবোধ এটাও আজকের নয়। যার কারণে আমি আমার জন্মের পর থেকেই রাজনীতি, ধর্ম এবং সংস্কৃতির বিষয়গুলো পরিবারের কাছ থেকে শুনে ও শিখে এসেছি। ফলে সেই বোধ থেকেই রাজনীতিতে আসা। আমাদের আত্মীয় আবদুল হামিদ চৌধুরী ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ক্লাসমেট ছিলেন। উনার পর যিনি ফরিদপুরে ৩৫ বছর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের চারবারের এমপি ছিলেন, তিনিও আমাদের আত্মীয়। তিনি মারা যাওয়ার পরে আমার চাচা এমপি হন। তার পরে আমার চাচি এবং তারপরের সিরিয়ালে আমি এমপি হই। সুতরাং রাজনীতির বিষয়টা হচ্ছে পারিবারিক ঐতিহ্য।
দশম সংসদ নির্বাচনে আপনি দলের মনোনয়ন চাননি। তখন অবশ্য আপনার একটা ভিন্ন অবস্থা তৈরি হয়েছিল। আপনি কি আপনার এই পরিস্থিতি তৈরির জন্য কাউকে দায়ী করবেন?
গোলাম মওলা রনি : আমি খুব অল্প বয়সে সংসদ সদস্য হয়েছি। আমার ছেলেমেয়ে ভালো ছাত্র ছিল। আমার এমপি হওয়ার পর বাইরের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় পরিবারকে সময় দিতে সক্ষম ছিলাম না। এতে আমার পরিবারের মধ্যে অসন্তুষ্টি দেখা দিল। তখন আমার মনে হলো, যদি আমার পরিবার ঠিক না থাকে তাহলে রাজনীতি করে লাভটা কী? এছাড়া ব্যবসায় কিছুটা মন্দা শুরু হলো। সবকিছু ম্যানেজ করে আমার জন্য একটা ব্রেকআপ দরকার ছিল। এটা হচ্ছে প্রথম কারণ। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, আমি দীর্ঘদিন থেকে টকশোতে গণতন্ত্রের কথা বলে আসছিলাম। মানুষও আমার কথা বিশ্বাস করছিল এবং মানুষজন আমাকে সম্মানও দিয়ে আসছিল। সেই আমি ভাবলাম, বিনা ভোটে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা আমার জন্য ঠিক হবে না। এ কারণে আমি আর নমিনেশন চাইনি। কিন্তু দলের সঙ্গে আমার আগেও ভালো সম্পর্ক ছিল, যখন জেলে গিয়েছি তখনো ভালো সম্পর্ক ছিল এবং এখনো ভালো সম্পর্ক আছে।
আপনার একটি লেখায় বলেছেন, ৫০ দিন জেল খেটেছি। তখন কাছের বন্ধুরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং আপনার স্ত্রী পরপর ১৭দিন বঙ্গভবনের গেট থেকে ফিরে এসেছে। ভেতরের যেতে পারেনি। এটা কোন উপলব্ধি থেকে লিখেছেন?
গোলাম মওলা রনি : আসলে তখন আমার বন্ধুরা যেটা করেছে, সেটা ঠিকই করেছে। আমিও যদি আমার বন্ধুদের থেকে শিক্ষাটা না নিতাম, তাহলে সেই ভুলটাই করতাম। বস ইজ অলওয়েজ রাইট- এটা রাজনীতির ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য। আপনি যতক্ষণ না বস হবেন, ততক্ষণ তাকে কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারবেন না। আর দ্বিতীয় বিষয়টা হচ্ছে, বসের মন-মেজাজ না বুঝে কথা বলাটাও বোকামি। এগুলো হচ্ছে বড় আকারের সূত্র। এ সূত্রগুলো রাজনীতিতে আরো প্রখর। রাজনীতিতে যিনি বস থাকেন, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারো নেই।
আপনি বলেছেন, ক্ষমতার আশপাশে যারা আছেন, তারা চাটুকারিতায় ব্যস্ত। তারা তাদের চাটুকারিতার মাধ্যমেই আশপাশে আছেন। এর প্রেক্ষাপটটা কী ছিল?
গোলাম মওলা রনি : এমন কথা বলেছি কি না আমার মনে পড়ে না। আর যদি বলে থাকি তাহলে এখন বলব, আমার এই কথাটা ম্যাচিউরড ছিল না। অপরিপক্ব কথা ছিল। আসলে প্রত্যেক দলেরই কিছু লোক থাকে, যারা শুধু সুবিধা ভোগ করে। এটা আমাদের দলেও আছে। সব কথা প্রকাশ্যে বলা ও লেখা নির্বুদ্ধিতার কাজ।
ভবিষ্যতে যারা রাজনীতিতে আসতে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
গোলাম মওলা রনি : ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে আমি যা দেখতে পাই তা হলো— এক দল হচ্ছে উচ্চাভিলাষী, পরিশ্রম করতে চায় না। আরেক দল হচ্ছে তারা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগাতে চায়। রাজনীতি হচ্ছে এমন একটি জায়গা, যেখানে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। আমার প্রতিপক্ষ যা করেছে, আমি যদি তার থেকে ভালো কিছু করতে না পারি, তাহলে জনগণ আমাকে গ্রহণ করবে কেন? আর সাহস থাকতে হবে এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য থাকতে হবে।
রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের যুক্ত হওয়ার একটি ধারা বা ঐতিহ্য লক্ষ করা যায়— এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
গোলাম মওলা রনি : এ কারণে দুটি ক্ষতি হচ্ছে। বড় বড় অর্থবান ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে এসে প্রথমত অনেকেই দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন। এখন যারা নব্য ধনী, তাদের ফাদার ছিলেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশের অনেক ব্যবসা-বাণিজ্যের ফাদার। সত্য এবং বাস্তবতা হলো, এখন সালাহউদ্দিন কাদেরের ফ্যামিলি চলছে খুবই খারাপ অবস্থায়। সাবের হোসেন চৌধুরী— তিনিও অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন; কিন্তু রাজনীতি করতে করতে তার ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুই নেই। অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী এসে দরিদ্র হয়ে যান কিন্তু যারা টাউট বাটপাড় এবং দরিদ্র, তারা এসে ধনী হয়েছেন।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।