অভিনেতা জিন হ্যাকম্যান দম্পতির মর্মান্তিক পরিণতির কথা বেরিয়ে এল তদন্তে

লেখক:
প্রকাশ: ২ years ago

Manual4 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

Manual4 Ad Code

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো রাজ্যের সান্তা ফে শহরে অবস্থিত নিজ বাড়ি থেকে অভিনেতা জিন হ্যাকম্যান ও তাঁর স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে এই মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটনে জড়িত বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি মরদেহ পাওয়া গেলেও হ্যাকম্যান মারা গিয়েছিলেন সম্ভবত গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। আর তাঁর স্ত্রী বেটসি মারা গিয়েছিলেন তাঁরও এক সপ্তাহ আগে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুইবারের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড জেতা অভিনেতা জিন হ্যাকম্যান তাঁর শেষ সময়টিতে খুব একাকী ছিলেন। এতটাই একা যে, কারও কাছে সাহায্য চাওয়া, এমনকি নাওয়া-খাওয়ার কথাও ভুলে গিয়েছিলেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ৯৫ বছর বয়সী এই অভিনেতা দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর আলঝেইমার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সম্ভবত বুঝতেই পারেননি, তাঁর স্ত্রী তথা ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের সঙ্গী বেটসি মারা গেছেন। বেটসির মরদেহ পাশে নিয়েই তিনি নিজ বাড়িতে বাস করছিলেন।

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, স্ত্রীর মৃত্যুর বিষয়টি যদি হ্যাকম্যান বুঝেও থাকেন, তবে তিনি হয়তো বিভ্রান্তির বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। হয়তো শুরুর দিকে তিনি তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু বুঝতে পারেননি। পরে তিনি তাঁর মৃত স্ত্রীকে জাগানোরও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পরে আলঝেইমারের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এবং কিছুই করতে পারেননি। আর এই প্রক্রিয়াটি হয়তো কয়েক দিন ধরে চলেছে, যতক্ষণ না গত ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি নিজেও মৃত্যুবরণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বিরল ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় হ্যাকম্যানের সাত দিন আগেই মারা যান তাঁর স্ত্রী ৬৫ বছর বয়সী বেটসি আরাকাওয়া। পরে চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ অবস্থায় হ্যাকম্যানও মারা যান।

সান্তা ফেতে তাঁদের বাড়িটিতে যখন আশপাশের নিরাপত্তা কর্মীরা খোঁজ নিতে যান, তখন জানালা দিয়ে দম্পতির মৃতদেহ দেখতে পেয়ে তাঁরা পুলিশকে খবর দেন। প্রথমে ঘটনাটি সন্দেহজনক মনে হলেও তদন্তের পর জানা যায়, এই দম্পতির মৃত্যুর ঘটনায় কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা নেই।

পুলিশের প্রতিবেদন অনুসারে, বেটসিকে একটি বাথরুমে পাওয়া যায়, যেখানে ওষুধ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। আর হ্যাকম্যানের দেহ পাওয়া যায় রান্নাঘরের কাছে। তাঁর হাতে ছিল একটি লাঠি ও সানগ্লাস। এই দম্পতির পোষা কুকুরটিও মৃত অবস্থায় পড়েছিল।

Manual5 Ad Code

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যাকম্যানের মৃত্যু আলঝেইমারের ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিফলন। এটি এমন একটি রোগ যা মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট করে দেয় এবং স্মৃতি ও অন্যান্য মানসিক দক্ষতা ধীরে ধীরে লোপ পায়।

Manual2 Ad Code

অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ক্যাথরিন পিয়ারসোল বিবিসিকে জানান, আলঝেইমারের চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিরা অতীত বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করতে পারেন না। তাঁরা শুধু বর্তমানেই আটকে থাকেন।

ক্যাথরিন ব্যাখ্যা করেন, ‘আমি কল্পনা করতে পারি, তিনি (হ্যাকম্যান) হয়তো তাঁর স্ত্রীকে জাগানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু সফল হননি। তারপর হয়তো ঘরের অন্য কোথাও মনোযোগ চলে গিয়েছিল, হয়তো কুকুরটির দিকে। পরে আবার ফিরে এসে স্ত্রীর দেহ দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই দুঃখ এভাবে তিনি বারবার অনুভব করছিলেন।’

কেউ জানে না, হ্যাকম্যান তাঁর শেষ দিনগুলো কীভাবে কাটিয়েছিলেন। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁর দেহে অপুষ্টির লক্ষণ দেখা গেছে। যদিও তিনি পানিশূন্যতায় ভুগছিলেন না।

নিউ মেক্সিকোর প্রধান স্বাস্থ্য পরীক্ষক ড. হিদার জ্যারেল জানান, বেটসি আরাকাওয়ার মৃত্যুর কারণ ছিল ‘হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ (এইচপিএস)। এই রোগটি মূলত সংক্রমিত ইঁদুরের সংস্পর্শে এলে হতে পারে। আর হ্যাকম্যানের মৃত্যুর কারণ ছিল গুরুতর হৃদ্‌রোগ, যেখানে আলঝেইমার একটি সহায়ক কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

স্মৃতি ও স্নায়ুবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ ড. ব্রেন্ডান কেলি বলেন, ‘আলঝেইমারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আবেগ অনুভব করতে পারেন—যেমন ভয় বা উদ্বেগ। কিন্তু তাঁরা সেটির সমাধান করতে পারেন না।’

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘একজন সুস্থ ব্যক্তি হলে হয়তো সাহায্যের জন্য কাউকে ফোন করতেন বা প্রতিবেশীর কাছে যেতেন। কিন্তু আলঝেইমারে আক্রান্ত রোগী সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।’

হ্যাকম্যানের মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনা সান্তা ফে শহরের মানুষকে নাড়া দিয়েছে। এই শহরের বাসিন্দা লিন্ডা বলেন, ‘আমার মা ডিমেনশিয়ায় ভুগছিলেন। তাই আমি জানি এটি কতটা কঠিন।’

Manual3 Ad Code

তিনি যোগ করেন, ‘আমরা জানতাম, জিন ও তাঁর স্ত্রী খুব ব্যক্তিগত জীবনযাপন করতেন। হয়তো তাঁর স্ত্রী চেয়েছিলেন তাঁকে জনসাধারণের দৃষ্টির বাইরে রাখতে। কিন্তু একা একা এটি সামলানো সত্যিই কঠিন।’

২০০৪ সালে অভিনয় থেকে অবসর নেওয়ার পর লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গিয়েছিলেন হ্যাকম্যান। অবসর নেওয়ার দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২৩ সালে মাত্র এক বারের জন্য হ্যাকম্যান ও তাঁর স্ত্রীকে জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। হ্যাকম্যানের তিন সন্তান ক্রিস্টোফার, এলিজাবেথ ও লেসলি বরাবরই গণমাধ্যমের বাইরে থেকেছেন এবং নিজেদের মতো করে জীবন কাটাচ্ছেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code