

নিজস্ব প্রতিবেদক : গেল কয়েক মাস ধরে সিলেটের বাজার এমনিতেই চড়া। সব জিনিসের দামে ছিল ঊর্ধ্বগতি। ব্যতিক্রম ছিল পিয়াজ। এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও রমজানের বাজারে আরেক দফা দাম বাড়িয়েছেন সিলেটের ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভের অন্ত নেই। তবে এই অবস্থায় সিলেটের জেলা প্রশাসন থেকে বাজার মনিটরিংয়ের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আজ থেকে বাজারে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তদারকি শুরু হবে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পণ্য নিয়ে শত শত ট্রাক সিলেটে ঢুকেছে।
রাত ১০টা থেকে এই ট্রাকগুলো নগরীর পাইকারি আড়ত কালীঘাটের আসে। সর্বশেষ গতকাল শনিবার পর্যন্ত পণ্য বোঝাই ট্রাকের বহর এসেছে সিলেটে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ‘সিলেটের বাজারে পণ্যের কোনো সংকট নেই।’ তবে কেন দাম বেশি- এমন প্রশ্নের জবাবে সিলেটের একাধিক ব্যবসায়ী নেতা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে দাম বাড়লে সিলেটে দাম বাড়ে। পাইকারি কেনাতেই বেশি দাম পড়ায় সিলেটের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। কিন্তু এ নিয়ে গত কয়েকদিন বাজারে প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো মনিটরিং লক্ষ্য করা যায়নি। সিলেটে গত তিন সপ্তাহ ধরে পিয়াজের বাজার ছিল স্থিতিশীল। ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে পিয়াজ বিক্রি হয়েছে। কিন্তু শুক্রবার সকাল থেকে হঠাৎ করে কেজিতে ১০ টাকা বাড়িয়ে দেয়া হয় পিয়াজের দাম। সিলেটের পাইকারি দোকানগুলোতেও বেশি দামে পিয়াজ বিক্রি হয়।
গতকাল ৩০-৩৫ টাকা দরে পিয়াজ বিক্রি করা হয়েছে। ভোজ্য তেল সুয়াবিনের বাজারে দাম আগের মতোই। সরকারি মূল্য পুনর্র্নিধারণের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। নগরীর কালীঘাটের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাজারে সুয়াবিন তেলের সংকট রয়েছে। এর পরও সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু সিলেটের খুচরা বাজারে দামের কোনো ঠিক নেই। আগের দাম অর্থাৎ পাঁচ লিটার ৭৯৫ টাকা দরে সয়াবিন তেল বিক্রি করা হচ্ছে। তবে সিলেট নগরীর পরিচিত কয়েকটি দোকানের মধ্যে কোনো কোনোটিতে ৭৫০, আবার কোনোটিতে ৭৬০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। ছোলা, মটর ও ডালের দামও বেড়েছে। কেজিপ্রতি ৫-৭ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। চালের বাজারে গত দু’দিনে দাম বেড়েছে। আতপ, কাটারিভোগ, কালিজিরা, মালা চালের দাম বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ক্রেতারা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহে সিলেটে চালের বাজার ছিল স্থিতিশীল। আগের দফা যে দাম বাড়ানো হয়েছিল তারচেয়ে এবার আরও বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে রমজানের শুরুতে কালিজিয়া ও চিনিগুড়া চালের দাম বেশি বাড়ানো হয়েছে। কেজিপ্রতি ৪-৫ টাকা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। তিন হাজার টাকার নিচে চালের বস্তা পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। বৃষ্টি শুরু হওয়ার কারণে সিলেটের বাজারে সবজির তীব্র সংকট চলছে। স্থানীয়ভাবে সবজি উৎপাদন না হওয়ার কারণে বাইরের সবজিই ভরসা। এখন বাজারে ৫০ টাকা কেজির নিচে কোনো সবজিই পাওয়া যাচ্ছে না। সংকট দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। সুবহানীঘাটের পাইকারি সবজির আড়তের দোকানিরা জানিয়েছেন, আলুর দাম স্থিতিশীল রয়েছে। অন্যান্য সবজি সিলেটের বাইরে থেকে আসার কারণে পরিবহন ভাড়াসহ দাম বেশি। তবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজির দাম সহনশীল রয়েছে।
গতকাল সিলেটের বাজারে কাঁচা মরিচ ও শসার দাম হঠাৎ করে বেড়ে যায়। কাঁচা মরিচ ও শসা প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারেও দাম ঊর্ধ্বগতি। স্থানীয় ফিশারিজ ও বাইরে থেকে আনা মাছের দাম কেজিপ্রতি ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। মাছ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হাওর ও নদীতে পানি সংকট থাকার কারণে মাছের সংকট রয়েছে। দামও একটু বেশি। তবে ফিশারিজের মাছের দাম বাড়েনি বলে জানিয়েছেন নগরীর লাল বাজারের মৎস্য আড়তের বিক্রেতারা। মাংসের বাজার অস্থির ছিল গতকাল। গরুর মাংস নগরীর একেক স্থানে একেক দামে বিক্রি হয়েছে।
নগরীর কাজিটুলায় গতকাল প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আবার শাহপরাণ এলাকায় মাংসের কেজি ছিল ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। নগরীর মদিনার মার্কেট এলাকায়ও একই দামে মাংস বিক্রি করা হয়েছে। মদিনা মার্কেটে বাজারে আসা লোকমান আহমদ জানিয়েছেন, মাংসের দাম বিক্রেতারা তাদের ইচ্ছামতো নিচ্ছেন। তারা রমজানে ক্রেতাদের জিম্মি করে রেখেছেন। সরকার নির্ধারিত দামের প্রতি বিক্রেতারা তোয়াক্কা করছেন না। মুরগির মাংস ব্রয়লারের দামও বেড়েছে। ব্রয়লার প্রতিকেজি ১৭০-১৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। অথচ এক সপ্তাহ আগে সেটি ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এদিকে দ্রব্যের অস্বাভাবিক দামের কারণে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে নগরীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার প্রস্তুতি চলছে। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নগরীতে চারটি টিম ও উপজেলায় একটি করে টিম বাজার মনিটরিং করবে। এতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও পুলিশ সহযোগিতায় থাকবে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি তাহমিন আহমদ জানিয়েছেন, সিলেটের বাজারে সিন্ডিকেট করা হয় না। চট্টগ্রামে দাম বাড়লে সিলেটে বাড়ে। বেশি দাম নেয়ার অভিযোগ উঠলে প্রশাসন ও সিলেট চেম্বারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনে বাজার মনিটিরং করা হবে। তিনি রমজানে ব্যবসায়ীদের লাভ না করে ন্যায্য মূল্যে পণ্য বিক্রি করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করার আহ্বান: সিলেটের উন্নয়নমূলক সংগঠন সিলেট বিভাগ গণদাবি ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির এক বিশেষ সভা গতকাল শনিবার দুপুরে নগরীর সুরমা ম্যানশন ৩য় তলাস্থ সংগঠনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট বিভাগ গণদাবি ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি চৌধুরী আতাউর রহমান আজাদ এডভোকেটের সভাপতিত্বে সভায় বক্তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সভায় বক্তারা বলেন, পবিত্র রমজান মাসে সিলেট বিভাগের প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে ৫০ হাজার করে ভিজিএফ কার্ড দিয়ে অসহায় দরিদ্র ও সুবিধা-বঞ্চিতদের খাদ্যদ্রব্যসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা। এ ছাড়া ইফতার, সেহ্রি ও তারাবির নামাজের সময় বিভাগের সর্বত্র নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং সকল পৌর ও সিটি করপোরেশন এলাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, খাদ্য ও ইফতারির মান নিয়ন্ত্রণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কঠোর তদারকি ও তৎপরতা বৃদ্ধির জন্য সভা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা বদরুল আহমদ চৌধুরী এডভোকেট, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমদ, সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলম মর্তুজা, সিলেট জেলা শাখার সভাপতি দেওয়ান মসুদ রাজা চৌধুরী, মহানগর শাখার সভাপতি শামীম হাসান চৌধুরী এডভোকেট, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মানিক মিয়া, জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক চৌধুরী দেলওয়ার হোসেন জিলন, সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদুর রহমান চৌধুরী, কেন্দ্রীয় সদস্য শিক্ষক আবদুল মালিক, সাবেক মেম্বার ইর্শাদ আলী, রিয়াজ উদ্দিন আহমদ, কয়েছ আহমদ সাগর, আমীন তাহমীদ, শরীফুল হুদা চৌধুরী এডভোকেট, ওয়াহিদুর রহমান এডভোকেট, মলয় চক্রবর্তী এডভোকেট, নেপাল চন্দ্র চন্দ এডভোকেট, এমএ জলিল, শওকত আলী প্রমুখ।