আত্রাইয়ে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢেঁকি শিল্প

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual7 Ad Code

আত্রাই (নওগাঁ) :
‘ও বউ ধান ভানে রে, ঢেঁকিতে পার দিয়া’ ঢেঁকির পাড়ে পল্লিবধূদের এমন গান এক সময় বাংলার গ্রামীণ জনপদে সবার মুখে মুখে থাকত। ধান থেকে চাল, তা থেকে আবার আটা। একসময়ে নওগাঁর আত্রাইয়ের গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারের চাল আর আটা প্রস্তুতের একমাত্র মাধ্যম ছিল ঢেঁকি। গভীর রাত থেকে ভোর সকাল পর্যন্ত বধূরা ঢেঁকিতে চাল ভাঙতো। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আবহমান বাংলার ঢেঁকি তেমন একটা চোখে পড়ে না। এখন ঢেঁকির সেই ধুপধাপ শব্দ বর্তমান প্রজন্মের কাছে যেন স্বপ্নময় স্মৃতি।

আর নতুন প্রজন্মের কাছে ‘ঢেঁকি’ শব্দটি শুধু অতীতের গল্প মাত্র। বাস্তবে এর দেখা মেলা ভার। উপজেলার দু-এক জায়গায় থাকলেও ব্যবহার তেমন একটা নেই। আশির দশক থেকে ক্রমে বিলুপ্তির পথে ঢেঁকি। ঢেঁকিতে তৈরি করা আটা দিয়ে ঘরে ঘরে প্রস্তুত হতো পুলি, ভাপা, পাটিসাপটা, তেলে ভাজা, চিতইসহ নানা ধরনের বাহারি পিঠা-পুলি। পিঠার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে।

Manual6 Ad Code

আগে অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কৃষক ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে গৃহস্থ ও কৃষাণিদের ঘরে ঘরে ধানের নতুন চাল ভাঙা বা চাল গুঁড়া করা, আর সে চাল দিয়ে পিঠা, পুলি, ফিরনি, পায়েস তৈরি করার ধুম পড়ে যেত বাড়ি বাড়ি। বাতাসে ভেসে বেড়াত পিঠার সুঘ্রাণ। এখন ঢেঁকির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে নবান্নের উৎসবও। আধুনিকতার উৎকর্ষের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার এক সময়ের কৃষাণ কৃষাণিদের ভালো মানের চাল তৈরির প্রধান মাধ্যম ঢেঁকি। এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ঢেউ লেগেছে গ্রামেগঞ্জে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় এক সময় ঢেঁকি দিয়ে চাল তৈরি, চিড়া ভাঙা, আটা, পায়েসের চালের গুঁড়ো, খির তৈরির চাল বানানোর সেই ঢেঁকি- আজ অসহায় হয়ে পড়েছে ইঞ্জিনচালিত মেশিনের কাছে। ধান ভানা, চাল গুঁড়ো করা, বড়ি তৈরি করা, আটা তৈরি চালের গুঁড়াসহ ঢেঁকির যাবতীয় কাজ এখন করছে ইঞ্জিনচালিত মেশিনে। ঢেঁকি নিয়ে এক সময় জনপ্রিয় গান ও প্রবাদ রচিত হয়েছিল। যেমন গ্রাম বাংলার তরুণী-নববধূ ও কৃষাণীদের কণ্ঠে’ ও বউ চাল ভাঙেরে, ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, নতুন চাল ভাঙে হেলিয়া দুলিয়া, ও বউ চাল ভাঙেরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া’ এ রকম গান আর শোনা যায় না। ঢেঁকি শিল্প কি ছিল তা এ যুগের ছেলে মেয়েদের ছবি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে ও পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। সভ্যতার প্রয়োজনে ঢেঁকির আবির্ভাব হয়েছিল, আবার গতিময় সভ্যতার সারাপথে প্রযুক্তি গত উৎকর্ষই ঢেঁকি বিলুপ্তি করে দিয়েছে। ঢেঁকি কাঠের তৈরি কুল, বাবলা, জামগাছ ইত্যাদি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো। সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাত দৈর্ঘ্য। আর পৌনে ১ হাত চওড়া। মাথার দিকে একটু সরু এবং অগ্রভাগে সরু। এর মাথায় এক হাত কাঠের ওচা বা দস্তা থাকে। এর মাথায় লাগানো থাকে লোহার গুলা। গুলার মুখ যে নির্দিষ্ট স্থানে পড়ে সে স্থানকে গড় বলে। ধান ভানতে ন্যূনতম ২ জন লোকের প্রয়োজন। সে সময়ে ঢেঁকিকে নিয়ে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন কবি সাহিত্যিকরা। আর ঢেঁকি ছাঁটা আউশ চালের পান্তা ভাত পুষ্টিমান ও খেতে খুব স্বাদ লাগত। বর্তমান প্রজন্ম সে স্বাদ থেকে বঞ্চিত। প্রাচীনকালে ঢেঁকির ব্যবহার বেশি হলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে গ্রাম বাংলার ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে।

Manual2 Ad Code

ঢেঁকিকে নিয়ে মনের কথা ব্যক্ত করলেন শিরোনাম সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক এমরান মাহমুদ প্রত্যয় তিনি বলেন, এক সময় ঢেঁকি কে নিয়ে বহু গান আমাদের এলাকার প্রবীণদের মুখে শুনেছি। এছাড়া শীতকালে গ্রামে বাড়ী বাড়ী জামাই মেয়েসহ আতœীয় স্বজনদের নিয়ে বিভিন্ন পিঠা খাওয়ার ধুম পরে যেত। আর সে পিঠা খাওয়ার জন্য আটা তৈরীর মাধ্যম ছিল ঢেঁকি। সে সময় আমাদের মা-চাচিদের ঢেঁকিতে ধান ভাঙতে ও আটা তৈরী করতে দেখেছি। এখন আর আগের মত ঢেঁকি তেমন চোখে পড়েনা। তিনি আরো বলেন, ঢেঁকি আমাদের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। ঢেঁকি একটি শিল্প হলেও এ শিল্পকে সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

Manual3 Ad Code

এদিকে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প রক্ষায় সকলকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন উপজেলার সচেতন মহল।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code