শব্দদূষণ। খুব সহজেই আমরা এ দূষণের সঙ্গে মানিয়ে চলি। কিন্তু এই শব্দদূষণ বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একে ‘শব্দ-সন্ত্রাস’ নামে অভিহিত করা যায়। এটা আমার কথা নয়, পরিবেশবাদীরাই একথা বলছেন। আবাসিক, অনাবাসিক এলাকা, অফিসপাড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি হাসপাতালের আশপাশেও শব্দদূষণের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শব্দদূষণের মাত্রা এখন সবস্থানেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
পরিবেশ অধিদফতরের হিসেব মোতাবেক যে-কোনো শহরে শব্দের মাত্রা দিনে সর্বোচ্চ ৪৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৩৫ ডেসিবেল পর্যন্ত সহনীয়। অপরদিকে শয়নকক্ষের জন্য আলাদা পরিমাপ রয়েছে। সেটি ২৫ ডেসিবেলের উপরে অনুমোদিত নয়। অফিস আদালতের ক্ষেত্রে ৩৫-৪০ এবং হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত শব্দের পরিমাপ ধরা হয়েছে ২০-২৫ ডেসিবেল। অথচ এসবের ধারে-কাছেও নেই নগরীগুলোর শব্দের মাত্রা। বরং বহুগুণ শব্দের তাণ্ডবে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
মানুষের শ্রবণযোগ্য শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল হলেও বর্তমানে আমরা অনায়াসে ৬০-৭০ ডেসিবেল শব্দের মাত্রা সহ্য করে যাচ্ছি। অথচ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতে, ৭৫ ডেসিবেল কিংবা তার বেশিমাত্রার শব্দদূষণ হলে মানুষ ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ৮০ ডেসিবেলের অতিরিক্ত মাত্রার শব্দ মানুষের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। তথাপিও আমাদের তা শ্রবণ করতে হচ্ছে। যা দেশের সবস্থানেই এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাস্তার পাশে কিংবা অলিতে-গলিতে সাউন্ড বক্সের আওয়াজ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। নিয়ম লঙ্ঘন করে যত্রতত্র গাড়ির হর্ন বাজানো হচ্ছে। টাইলস বসানো, ইট ভাঙার মেশিন কিংবা বড় বড় দালান নির্মাণের ক্ষেত্রে পাইলিং মেশিনের উচ্চমাত্রার আওয়াজ মানুষকে নাজেহাল করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এটা শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম হচ্ছে তা কিন্তু নয়। দেশের সর্বত্রই একই অবস্থা। রাস্তা-ঘাটে বেরুলেই যত্রতত্র শোনা যায় মাইকিং, ভটভটি বা নছিমন গাড়ির অস্বস্তিকর আওয়াজ, বিয়ে কিংবা গায়ে-হলুদে উচ্চৈস্বরে গান-বাজনা, সবমিলিয়ে ভয়ংকর এক অবস্থা। এসব আওয়াজ অনবরত শ্রবণের ফলে মানুষ তার শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলছেন ধীরে ধীরে। এ ধরনের বিরতিহীন শব্দদূষণের ফলে মানুষ উচ্চরক্তচাপ, শিরঃপীড়া, মানসিক অসুস্থতা, স্নায়ুবিক বৈকল্য, আত্মহত্যার প্রবণতা, আক্রমণাত্মক মনোভাবের উদ্রেক, হূদরোগসহ নানা জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনবরত শব্দদূষণের ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় রোগীদের ক্ষতি করে। তাদের নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটায়। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। মহল্লায় বা কোনো এলাকায় উচ্চ ভলিউমে সিডি বাজালে, মাইকিং হলে এলাকার লোকদের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যারা অসুস্থ বা পরীক্ষার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন তাদের শব্দদূষণে বেশি ক্ষতি হয়। আমাদের আশপাশে অনেকেই রয়েছেন, যারা দূরে কোথাও গাড়ি করে গেলে মাথা ঘুরায় এবং বমি করে। এবং অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এটাকে আমরা সহজভাবেই নেই। আমাদের ধারণা যারা দুর্বল তারা গাড়িতে চড়লে এমন করে। কিন্তু আসলে তা নয়। মূল কথা হচ্ছে, এদের মস্তিষ্ক শব্দ সহ্য করতে পারে না। আর তাই গাড়ির শব্দ শোনার কারণে এমনটা হয়। দীর্ঘক্ষণ গাড়ির শব্দ শুনতে শুনতে অনেকের মস্তিষ্কে এ সমস্যা হয়। যার ফলে বমি, মাথাব্যথা, মাথা ঘুরানো ইত্যাদি সৃষ্টি হয়।
অপরদিকে শব্দ দূষণের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। শিশু-কিশোরদের মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে শব্দদূষণের তাণ্ডবে। বেশিরভাগ শিশু সমপ্রতি কানে কম শোনা রোগে ভুগছে বলে শিশুবিশেষজ্ঞ ও ডাক্তাররা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। শব্দদূষণের ফলে কানের নানারকম ব্যাধির কথা এখন শোনা যায়। কানের পর্দা ফেটে যায় অসহনীয় শব্দ হলে। বয়স্কদের মধ্যে গ্যাস্ট্রিক, আলসার এবং ডায়াবেটিক রোগ হওয়ার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে শব্দদূষণ একটি বড় কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। উচ্চ শব্দ হলে হার্টের বিট বেড়ে যায়। ফলে হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। শুধু মানুষই নয়, জীব-বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও শব্দদূষণ মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শব্দদূষণের এত খারাপ দিক থাকা সত্ত্বেও এর প্রতিকারের জন্য অদ্যাবধি ব্যাপক কোনো কর্মসূচি সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়নি। অবাধে এ দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছে দেশে এ বিষয়টা দেখার কেউ নেই।
কিন্তু এভাবে আর কতদিন? এই অবস্থা থেকে অবশ্যই আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে। দেশবাসীকে একটি স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ দিতে হলে অবশ্যই শব্দদূষণ রোধ করার বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে এবং এই আইনের বিধান লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আরেকটি আইন জারি করতে হবে। তাই শব্দ দূষণ থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাতে এখনই পদক্ষপ নিতে হবে। গণমাধ্যমেও এর কুফল এবং সমস্যাগুলো তুলে ধরতে হবে। তাতে শব্দদূষণের মাত্রা অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।