

বিশেষ প্রতিনিধি: মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া নতুন করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে মৃত্যু আড়াই লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ইউরোপ ও আমেরিকার বেশির ভাগ দেশই এখন লকডাউন শিথিলের পথে হাঁটছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই লকডাউন তুলে নিয়েছে বা শিথিল করেছে। ফলে কিছুটা আগের জীবনযাত্রায় ফিরতে শুরু করেছে ইউরোপের কয়েক লাখ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যও সোমবার থেকে ব্যবসা বাণিজ্যের ওপর দেয়া বিধিনিষেধ শিথিল করেছে।
অবশ্য লকডাউন শিথিল হলেও মাস্ক পরা ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনাগুলো বহালই থাকছে এবং বিশ্বনেতারা ভ্যাকসিনের উদ্ভাবনের জন্য বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। প্রাণঘাতী এ ভাইরাস প্রতিরোধে সম্ভাব্য টিকা কিংবা ওষুধ উদ্ভাবনে বিভিন্ন সংস্থা ও বিশ্বনেতারা ৮০০ কোটি ডলারের একটি তহবিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিশ্বের কোনো দেশ এ উদ্যোগের বাইরে থাকবে না বলে অনেকে আশা করলেও যুক্তরাষ্ট্র এ তহবিলে কোনো ধরনের সহায়তা করছে না। নতুন করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট রোগ কোভিড-১৯ এ যে কয়েকটি দেশে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু দেখা গেছে, তাদের অন্যতম ইতালি দুই মাস ধরে ঘরবন্দী প্রায় ৪৫ লাখ মানুষকে কাজে ফেরার অনুমতি দিয়েছে। নতুন নির্দেশনায় দেশটিতে নির্মাণকাজ শুরু ও আত্মীয়-স্বজনরা একত্রিত হতে পারছে।
তিন বছর বয়সী নাতিকে রোমের ভিয়া বোর্হেস পার্কে হাঁটতে নিয়ে আসা মারিও আন্তোনিয়েতা গালুজ্জো বলেছেন, আমি আজ ঘুম থেকে উঠেছি ভোর সাড়ে ৫টায়। খুবই উদ্দীপ্ত ছিলাম। লকডাউনের কারণে দাদী-নাতির দেখা হয়েছে আট সপ্তাহ পর।
নতুন এ করোনোভাইরাসের আঘাতে এখন পর্যন্ত বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু দেখা যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও এবং অন্যান্য অঙ্গরাজ্যও ব্যবসা-বাণিজ্যের চাকা ঘোরাতে বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। দেশটিতে এরই মধ্যে কোভিড-১৯ এ জ্ঞাত আক্রান্তের সংখ্যা ১২ লাখ পেরিয়ে গেছে, মৃত্যু ছাড়িয়েছে ৬৯ হাজার। য্ক্তুরাষ্ট্র সরকারের অভ্যন্তরীণ এক রিপোর্টে দেশটিতে জুন পর্যন্ত প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই দেশটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গরাজ্য নিউ ইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো অর্থনীতি সচলে তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নির্মাণ খাতসহ বেশ কিছু শিল্প কারখানা পুনরায় চালু করতে পর্যায়ক্রমিক রূপরেখা হাজির করেছেন। স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, নাইজেরিয়া, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইসরাইল ও লেবাননসহ বিশ্বের অনেকগুলো দেশ এরই মধ্যে লকডাউন শিথিল করে কারখানা, নির্মাণকাজ, পার্ক, সেলুন ও লাইব্রেরি চালুর অনুমতি দিয়েছে।
অর্থনীতি ফের সচলে স্পেনেও সেলুন, লন্ড্রিসহ বিভিন্ন দোকান খুলে দেয়া হয়েছে। দেশটিতে গণপরিবহনে মাস্ক বাধ্যতামূলক হওয়ায় রেড ক্রসের কর্মীদেরকে মাদ্রিদের মেট্রো স্টেশনগুলোতে মাস্ক বিলি করতে দেখা গেছে। স্পেনের ফুটবল লিগ লা লিগা জুনের মধ্যে চালু হতে পারে এমন আশায় ক্লাবগুলোতে অনুশীলনও শুরু হয়ে গেছে।
পর্তুগাল, বেলজিয়াম, ভারত ও ইসরায়েল লকডাউন শিথিলে নানান পদক্ষেপ নিলেও জাপান তাদের জরুরি অবস্থা ৩১ মে পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ব্রিটেনও লকডাউন শিথিল করেনি। দেশটির সরকার করোনাভাইরাস সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায় অতিক্রান্ত হয়েছে বলে দাবি করলেও রোগ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংস্থা বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, ইউরোপে যে ৫টি দেশ এখনো পিক’ অতিক্রম করেনি, ব্রিটেন তাদের মধ্যে অন্যতম।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নতুন করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, মানুষ এখন তার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটনে, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রথমবারের মতো টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে শুনানি করছে, এবং তা সরাসরি সম্প্রচারও হচ্ছে।
রোমে সকালের দিকে গাড়ি, বাস ও মোটরবাইকের শব্দ শোনা গেলেও রাস্তায় যানবাহনের চাপ তুলনামূলক কম এবং মানুষজন নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখছে। লেবাননের বৈরুতে রেস্তোরাঁ খুলে দেয়া হলেও আগের তুলনায় সেখানকার টেবিল-চেয়ারের সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমিয়ে ফেলা হয়েছে। কোভিড-১৯ এ ৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু দেখা ইরানেও ১৩২টি শহরের মসজিদ খুলে দেয়ার কথা রয়েছে।