

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :
বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আরজু রহমন ভূইয়া বলেন, আশির দশকে নারায়ণগঞ্জে কাঁচাপাট রপ্তানীকারকদের অধীনেই ৭০ হাজার শ্রমিক কাজ করতো। কিন্তু ১৯৮৪-৮৫ সালের বাংলাদেশ জুট মিলস এসোসিয়েশনের চক্রান্তে তৎকালীন সরকার কাঁচাপাট রপ্তানী বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়ায় শুধু নারায়ণগঞ্জ থেকেই দেড়শত কাঁচাপাট রপ্তানীকারক ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। একইভাবে লতিফ সিদ্দিকী ও মির্জা আজমের সময়েও বাংলাদেশ জুট মিলস এসোসিয়েশনের চক্রান্তে কাঁচাপাট রপ্তানী বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স্বার্থান্বেষী মহলের বার বার চক্রান্তে কাঁচাপাট রপ্তানীকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সারাদেশে অনেক কাঁচাপাট রপ্তানীকারক ঋনগ্রস্ত হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। অনেক প্রেস হাউস বিলুপ্ত। শুধু রপ্তানীকারকই নয় এতে কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবছরও রপ্তানী বন্ধের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে রপ্তানীর মধ্যে ডিউটি ট্যাক্স বসানো হচ্ছে। নতুন প্রজ্ঞাপনে প্রতি মনে ৮৩০ টাকা ট্যাক্স দিতে। এতে করে রপ্তানীকারকরাতো বটেই প্রান্তিক কৃষকও লোকসানের মুখে পড়বে। বর্তমানে দেশে কাঁচাপাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৮৪ লাখ বেল হলেও বন্যায় ক্ষতির কারণে ৭২ লাখ বেল উৎপাদন হয়েছে। বিজেএমসি ও বিজেএসএ ৫৫ লাখ বেল ক্রয় করে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ২৫টি জুট মিল আগে ১২ লাখ বেল পাট ক্রয় করতো। কিন্তু সেটাতো এ বছর লাগছেনা। আমরা মাত্র ৮ লাখ বেল রপ্তানী করছি। এছাড়া বন্ধ হওয়া জুটমিলগুলোও কিন্তু ৭-৮ লাখ বেল বিক্রি করবে। এবছর ১৭-১৮ লাখ বেল কাঁচাপাট অবিক্রিত থেকে যাবে। তাহলে কেন কাঁচাপাট রপ্তানী বন্ধ করতে হবে কিংবা ট্যাক্স বসাতে হবে। বিজেএমসি ও বিজেএসএ’র চক্রান্তের কারণে যখনই এক্সপোর্ট বন্ধ করা হয় তখন কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ পরের বছর কৃষক কাঁচাপাট কম উৎপাদন করে। মূলত ১০-২০ শতাংশ ইনটেনসিভ পাওয়ার আশায় মিল মালিকরা এ ধরনের চক্রান্ত চলছে। বিজেএমসির তালিকায় ২৪টি মিল থাকলেও উৎপাদনে আছে অর্ধেকের চেয়েও কম। জুট স্পিনিং মিলের তালিকায় ১২০টি মিল থাকলেও উৎপাদনে রয়েছে ৭০টির মতো। তাদেরও কিন্তু ঘাটতি রয়েছে। জুট স্পিনার্স এসোসিয়েশনের ১০ জনের একটি সিন্ডিকেট বিশাল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্রাইসিস দেখিয়ে কাঁচাপাট রপ্তানী বন্ধ করতে চাইছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্থানীয় কিছু মজুদদার। আমরা সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই কোনভাবেই এ ধরনের চক্রান্তের ভ্রান্ত নীতি মেনে নেওয়া হবেনা। উৎপাদন মজুদ সঠিকভাবে নিরূপন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি কোন ধরনের অনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাহলে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলবো। কাঁচাপাট রপ্তানীকারকদের ব্যাংক লোক ও শ্রমিকদের দায় দেনা সরকার ও মিল মালিকদেরই নিতে হবে।
শনিবার দুপুরে বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের (বিজেএ) নারায়ণগঞ্জস্থ কার্যালয়ে কাঁচাপাট রপ্তানীকারকদের জরুরী সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসকল কথা বলেন আরজু রহমন ভূইয়া।
সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের (বিজেএ) কার্যকরী সদস্য মো: নুরুল হোসেন, লিয়াকত হোসেন, কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গলের রাজিব প্রসাদ সাহা, নারায়ণগঞ্জের পপুলার জুট মিলের মালিক অনুপ কুমার হোর, কেজে ফাইবার প্রোডাক্টস এর রেদোয়ান ভূইয়া, আরকে জুট বেলিং এর রিশাদ হোসেন, কুমিল্লা জুট ট্রেডার্সের আবু জাফর সিদ্দিক, মেসার্স পাভেল এন্টারপ্রাইজ জুট বেলিং এর দিলীপ কুমার দেব, মেসার্স প্রাইম জুট ফাইবার্সের মো: সিরাজুল ইসলাম, মেসার্স বুলবুল জুট ট্রেডার্সের মো: কামালউদ্দিন বাচ্চু, মেসার্স এনএস জুট বেলিং এর মো: জজ মিয়া, সাত্তার জুট এন্ড ফাইবার এর লোকমান মোল্লা প্রমুখ।
নারায়ণগঞ্জ জোনের শীর্ষ কাঁচাপাট রপ্তানীকারক ইন্টারন্যাশনাল জুট ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী গণেশ চন্দ্র সাহা বলেন, পাটের উপর ট্যাক্স ২৪০ ডলার সেটা অবাস্তব। পাটের উপর আমরা আগে থেকেই সোর্স ট্যাক্স দিচ্ছি। সেখানে আবার ট্যাক্স নির্ধারণ কাঁচাপাট রপ্তানী নিরুৎসাহিত করা। আমাদের এই কাঁচাপাট রপ্তানীকারকদের ব্যাংক ঋন, গোডাউন ভাড়া, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। আমরা যদি রপ্তানী বন্ধ করে দেই তাহলে আমাদের কাছ থেকে যারা কাঁচাপাট নিচ্ছে তাদের মিলও বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেই মিল একবার বন্ধ হলে সেটা আর চালু করা সম্ভব হবেনা। কিংবা তারা আর আমাদের থেকে পাট নিবেনা। এক ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে অন্য ব্যবসায়ীর ব্যবসা বন্ধ করে দেয়াটা কতটুকু যৌক্তিক।
নারায়ণগঞ্জের পপুলার জুট মিলের মালিক অনুপ কুমার হোর বলেন, ইনটেনসিভ ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০-২০ শতাংশ বৃদ্ধি করতেই কাঁচাপাট রপ্তানী বন্ধ করতে চাইছে। এর পাশাপাশি মফস্বল এলাকাতে কিছু মজুদদার আছে যাদের কোন লাইসেন্স নেই। অথচ তারা কাঁচাপাট ক্রয় করে বসে থাকে। এজন্য প্রয়োজন যারা লাইসেন্সধারী রয়েছে তারাও যাতে নির্দিষ্ট সময়ের বেশী কাঁচাপাট মজুদ করতে না পারে সে বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। মূলত মিল মালিকরা ষড়যন্ত্র করছে যাতে আমরা সরে গেলে তারা প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে পাটের দর তাদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন।
বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের (বিজেএ) কার্যকরী সদস্য লিয়াকত হোসেন বলেন, কাঁচাপাটের অভাবে কোন মিল বন্ধ হয়েছে আমরা এমনটি কখনোই শুনি নাই। আমরা যে কাঁচাপাট রপ্তানী করি সেটা সাধারণত উদ্বৃত্ত। আজকে মজুদদারদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপ না নিয়ে বারবার কাঁচাপাট রপ্তানী বন্ধ করে কাঁচাপাট রপ্তানীকারকদের ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসা হচ্ছে।