

ডেস্ক রিপোর্ট:যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে নৌ অবরোধ পুনর্বহালের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।এর জবাবে তেহরান ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে হামলা শুরু করেছে।ট্রাম্প বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে এখনও চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় মাত্রায় সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের তথ্য অনুযায়ী, ইরান কৌশলগত জলপথে দুটি জাহাজে হামলা চালিয়ে একজন নাবিককে হত্যা করেছে।ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও মঙ্গলবার জানায়, ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় আরও একটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।এর আগে মার্কিন সেনাবাহিনী জানায়, পাঁচ ঘণ্টার অভিযানে উপকূলীয় বুশেহর ও বন্দর আব্বাসসহ ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানো হয়েছে।
তাদের ভাষায়, এর উদ্দেশ্য ছিল ‘বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করা।’
গত সপ্তাহ থেকে নতুন করে শুরু হওয়া মার্কিন হামলায় ইরানে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন।ইরানি গণমাধ্যম ও সরকারি ঘোষণার ভিত্তিতে এএফপি’র হিসাব থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।হামলার পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, তারা বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সেখানে মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত একটি আবাসিক ভবনসহ কয়েকটি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
পরে বাহরাইন জানায়, তারা ইরান থেকে ছোড়া কয়েকটি আকাশপথের হামলা প্রতিহত করেছে। মানামায় বিস্ফোরণ ও সাইরেন শোনার পর তেহরানের বিরুদ্ধে বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তোলে দেশটি।হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ ফেরানোর ট্রাম্পের ঘোষণা ও নতুন করে সংঘাতের ব্যাপক বিস্তার যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের প্রচেষ্টাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
-যুদ্ধ ঘোষণা-
ট্রাম্প সোমবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর ‘নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে’ এবং এ পথ দিয়ে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ কর আরোপ করবে।ইরান এ ঘোষণাকে উপহাস করেছে এবং একে ‘জলদস্যুতা’ বলে আখ্যা দিয়েছে।মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টা থেকে হরমুজ জলপথে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করা হবে।
সংঘাত ফের তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। মঙ্গলবারও দাম আরও ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়।তেহরান অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য মিত্র দেশের ওপরও হামলা চালিয়েছে। জর্ডান জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বলেছে, তাদের হামলা একটি বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে জর্ডানের জনগণকে ‘অঞ্চল থেকে দখলদার মার্কিন ঘাঁটি অপসারণের জোরালো দাবি’ জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইরান দাবি করে, তারা কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করছে।তবে দেশটির সামরিক কমান্ডের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর যেকোনো সহযোগিতা ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
হোয়াইট হাউস এএফপিকে নিশ্চিত করেছে, ট্রাম্প গত সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আবার শুরু করেছে। এর ফলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই পেন্টাগনকে আরও ৬০ দিন ওই অঞ্চলে অভিযান চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ ইস্যুর পাশাপাশি ট্রাম্প নাতাঞ্জের কাছে অবস্থিত গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ ধ্বংসেরও হুমকি দিয়েছেন। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের সন্দেহ, সেখানে ইরান ঘোষণাবিহীন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করছে।
রক্ষণশীল রেডিও উপস্থাপক হিউ হিউইতকে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বলুন। তাদের জানিয়ে দিন, আমরা আসছি। আর তারা এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না।’
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘হরমুজ প্রণালীর অভিভাবক’ হিসেবে পরিচিত করা হবে এবং এ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপ করা হবে।তিনি বলেন, ইরানের বন্দরগুলো আবার অবরোধ করা হলেও ‘অন্য সব দেশ ন্যায্য ও উন্মুক্তভাবে প্রণালীটি ব্যবহার করতে পারবে।’
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে লিখেছেন, নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতকারী পক্ষ পারিশ্রমিক পাবে— এ বিষয়ে ট্রাম্প ‘সম্পূর্ণ সঠিক।’ তবে তেহরান কম হারে ফি নেবে বলে জানান তিনি এবং বলেন, ‘২০ শতাংশ অবশ্যই খুব বেশি।’মঙ্গলবার নিরাপত্তা কমিটির প্রধান জানান, হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি বিলের কাজ শুরু করেছে ইরানের পার্লামেন্ট।
আন্তর্জাতিক আইনে সাধারণত প্রণালীতে টোল আরোপের সুযোগ না থাকায়, ওয়াশিংটন তেহরানের এ পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করছে।তবে সব উত্তেজনার মধ্যেও ট্রাম্প সোমবার বলেন, যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের সঙ্গে চুক্তির সম্ভাবনা এখনও রয়েছে।ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই সোমবার বলেন, আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত জুনের সমঝোতা স্মারক এখন ‘সংকটে’ রয়েছে।
তিনি বলেন, ওয়াশিংটন চুক্তির বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করলে ইরানও তা মানবে না। তবে উত্তেজনা বৃদ্ধি ঠেকাতে কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।চ্যাথাম হাউসের সহযোগী গবেষক বাদর আল-সাইফ বলেন, বাড়তে থাকা হামলা, স্থায়ী সমঝোতাকে কেবল বিলম্বিত করবে।তিনি বলেন, ‘দুই পক্ষই নিজেদের শর্তে অচলাবস্থা শেষ করতে চায়। কিন্তু তা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।’