

সম্পাদকীয়: ৯৬ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ১৪৪ কোটি মানুষের দেশ চীন। ২২টি প্রদেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশের নাম শিনজিয়াং। গোটা চীনে ৪০,০০০ মসজিদের মধ্যে ২৫,০০০ মসজিদই শিনজিয়াংয়ে।
শিনজিয়াং চীনের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। আয়তন ১৬ লাখ সাড়ে ৪৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। মানে প্রায় ১১টি বাংলাদেশের সমান। শিনজিয়াং আয়তনে চীনের প্রায় ছয় ভাগের একভাগ।
শিনজিয়াংয়ের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে আছে মুসলিম তাজিকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও কাজাখস্তান, দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে আফগানিস্তান, আছে জম্মু-কাশ্মীর, আছে মঙ্গোলীয়া। প্রদেশটি স্বর্ণ, তেল ও গ্যাসসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এটিই হচ্ছে কাল। গরিবের সুন্দরী বউ।
বন্যা-খড়া, দুর্যোগের প্রদেশ বা মরুভূমি কিংবা বরফাচ্ছাদিত প্রতিনিয়তই সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার জাতি যদি হতো শিনজিয়াংয়ের অধিবাসীরা তাহলে তাদের নির্মূলের পরিকল্পনা বা নির্যাতনের ভয়াবহতা আমাদের শুনতে হতো না হয়ত। শিনজিয়াংয়ের হতভাগ্য নাগরিকদের আমরা উইঘুর মুসলমান হিসেবে জানি। তুর্কি বংশোদ্ভূত এবং তুর্কি ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত এই জাতি উইঘুর ভাষায় কথা বলেন, অনেকটা আরবি ভাষাই বলা যায়। ২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, শিনজিয়াংয়ে দেড় কোটি উইঘুর বসবাস করেন। তারা ছাড়াও কাজাখস্তান,উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান, তুরস্কে ও রাশিয়ায় প্রায় ৪ লাখের মতো উইঘুর মুসলিমের বসবাস। শিনজিয়াং ‘স্বায়ত্তশাসিত’ প্রদেশ। কিন্তু আজ চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের নিষ্ঠুরতম নিয়ন্ত্রণে শাসিত হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলেছে, চীন সরকার গোপনে বহু উইঘুর মুসলিম স্কলারের একপক্ষীয় বিচার করেছে। বিশিষ্ট উইঘুর ব্যক্তিত্বদের গত কয়েক বছরে আটক বা গুম/খুন হয়ে গেছেন শিনজিয়াং হতে। কয়েকজন হলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মো. সালিহ হাজিম, অর্থনীতির বিজ্ঞানী ইলহাম তোকতি, নৃতাত্ত্বিক রাহাইল দাউদ, সঙ্গীতশিল্পী ও বেহালার স্টার আবদুর রহিম হায়াত, ফুটবলার এরফান হিজিমসহ অজানা অনেকে ।
ইউনাইটেড নেশনস হিউম্যান রাইটস বিষয়ক কমিটি ২০১৮ সালের শেষে এক প্রতিবেদনে বলেছে,১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ সংশোধন’ সেন্টারগুলোতে আটক রাখা হয়েছে। আর ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক ও দীক্ষাদান কেন্দ্রে’ থাকতে ও ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। অর্থাৎ নারী-শিশু ছাড়া কেউ বাদ নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, যে সব লোকজনের ২৬টি বাইরের দেশে আত্মীয়-স্বজন আছেন তাদের এ সব ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে। চীন মনে করেছিল বিশ্ববাসীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সোনা-রুপার খনি সমৃদ্ধ উইঘুর মুসলিম জাতির নিজস্ব মাটি থেকে উৎখাত করে বা তাদের নিজেদের ‘হান’ জাতিতে রূপান্তর করে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণকে আরও নিখুঁত করবে। কিন্তু শত মাইল উপরের সেটেলাইট ক্যামেরাকে ফাঁকি দিতে পারেনি ।
যেখানে ১ দিন আগে ফসলের মাঠ বা খোলা ময়দান দেখা গেছে সেখানে দিনের ব্যবধানে বিশাল বিশাল স্কুলের মতো সেন্টার। কিসের কেন? বিবিসি সাংবাদিক সরেজমিন চলে যায় আসল খবর নিতে। চীনের পুলিশ বাধা দেয়। কোনোভাবেই ভেতরের খবর নিতে দেয় না।
বিবিসি সাংবাদিক বাঁধা পেরিয়ে নির্যাতন সেন্টারে সরেজমিন গেলে তাকে ‘ওমির’ নামে নির্যাতিত মুসলমানদের মধ্যে একজন বলেছেন, ‘তারা আমাদের ঘুমাতে দেয় না। কয়েক ঘণ্টা ধরে ঝুলিয়ে রেখে পেটানো হয়। কাঠ ও রবারের লাঠি দিয়ে পেটায়। তার দিয়ে বানানো হতো চাবুক। সে চাবুকের আঘাতে আঘাতে আমাদের শরীরের হার গোশত আলগা করা হচ্ছে। সুই শরীরে ফুটানো হতো। প্লাইয়ার দিয়ে তুলে নেয়া হতো নখ। আমার সামনে টেবিলের ওপর এ সব যন্ত্রপাতি রাখা হতো।একটার পর একটার ব্যবহার হয়। এ সময় অন্যরা যে ভয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করত সেটাও আমি শুনতে পেতাম।’
যুক্তরাষ্ট্রে চীনবিষয়ক কংগ্রেসের একটি কমিটির পক্ষ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে শিনজিয়াংয়ে যে সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য।কিছুদিন আগে মালয়েশিয়া, ইরান, কাতার ও তুরস্ক বসল। কই কুয়ালালামপুর ঘোষণায় উইঘুর নিয়ে জোড়ালো কিছু দেখা গেল না। মুসলমানদের গবেষণা আর আবিষ্কারের যুগে ফিরে যেতেই হবে।