উবার-পাঠাও চালকরা কেন অ্যাপসে যেতে চান না 

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual7 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ 

মোবাইলফোন অ্যাপসভিত্তিক গাড়ি শেয়ার নেটওয়ার্ক ‘উবার’ ও ‘পাঠাও’-এর কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালে দেশে। এরপর থেকে সড়কে যানজট এড়িয়ে দ্রুত ও সহজে গন্তব্যে পৌঁছাতে  জনপ্রিয় হয়ে ওঠে অ্যাপসভিত্তিক এই রাইড শেয়ারিং। তবে, সম্প্রতি বাড়তি ভাড়া, অ্যাপসের প্রতি অনীহা ও যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ নানা রকম হয়রানির শিকারের অভিযোগ উঠেছে চালকদের বিরুদ্ধে। অ্যাপসে না গেলে চালক ও গ্রাহক উভয়ের তথ্য অ্যাপস কোম্পানিগুলোর ট্র্যাকে থাকে না। আর চুক্তিতে গেলে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাসান আলী রাজধানীর রামপুরা থেকে গাবতলি যাওয়ার জন্য উবার ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং অ্যাপে রিকোয়েস্ট পাঠান। চালক প্রথমে জানতে চান, কোথায় যাবেন? পরে গন্তব্য শুনে তিনি দূরে আছেন বলে রিকোয়েস্ট ক্যানসিল করে দিতে বলেন। পরে অন্য জনকে রিকোয়েস্ট পাঠান। তিনি গন্তব্য শুনে নানা অজুহাত দেখিয়ে বাড়তি ভাড়া চান। হাসান আলী জানান, ‘খুব আর্জেন্ট হওয়ায় ২০০ টাকা বাড়তি ভাড়া দিয়ে রাইড সেবা নিতে বাধ্য হই। এর উপর আগের চালক না যাওয়ায় অ্যাপ থেকে টাকা কেটে নেওয়া হলো।

গত ২০ ডিসেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে দেশের অন্যতম রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম পাঠাওয়ে গাবতলি বাস টার্মিনালে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ আলম। যাওয়ার সময় চালক নিজেই উৎসাহী হয়ে জানতে চান, গাবতলী থেকে অন্য কোথাও যাবেন কি না? তখন  তিনি ‘পাঠাও’ চালকে খিলক্ষেত ফিরে আসার কথা জানান। এ সময় চালক তাকে অনুরোধ করেন, ফিরলে যেন তার গাড়িতে যান। তবে অ্যাপস চালু করতে হবে না। আসার সময় যে ভাড়া দিয়েছিলেন, সেটা দিলেই হবে। আলম পরে এ প্রতিবেদককে জানান, এমন অভিজ্ঞতা তার আগেও হয়েছে। চালকরা অনেক রিকোয়েস্ট করে থাকেন, অ্যাপস বন্ধ করে এভাবে চলাচল করতে।

Manual4 Ad Code

উত্তরায় থাকেন রুবেল হোসেন নামের একজন ব্যবসায়ী। তিনি নিয়মিত উবারে উত্তরা থেকে মতিঝিল যাতায়াত করেন। তিনি জানান, রাইড শেয়ারিংয়ে নিয়মিত আসা-যাওয়ার ফলে অনেক উবার চালকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এখন তারা আর অ্যাপসে যেতে চান না। চালকরা বলেন, ‘অ্যাপস চালু কইরেন না। ভাড়া তো জানেন, সেটা দিলেই চলবে।’ আলম আরও উল্লেখ করেন, তার মতো অনেকেই আছেন, যাদের সঙ্গে চালকেরা মোবাইলফোনে যোগাযোগ করে অ্যাপস ছাড়াই চলাচল করছেন।

রাজধানীর গুলিস্তান, ফার্মগেট, শাহবাগ, শুক্রাবাদ, কলাবাগান, পান্থপথ, বনানী ও খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি মোড়েই মোটরসাইকেল নিয়ে চালকরা যাত্রীর অপেক্ষা করছেন। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে দরদাম মিললেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন। কোনো রকম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করছে।

সম্প্রতি খিলক্ষেত গিয়ে দেখা যায় বেশ কয়েকজন মোটরসাইকেল নিয়ে বসে আছেন। কাছে যেতেই রুবেল নামের এক পাঠাও চালক জানতে চান কোথায় যাবেন? অ্যাপসের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, ভাড়া তো জানেন। সেটা দিলেই হবে। চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি জানান, যারা নিয়মিত চলাচল করেন, তারা বিভিন্ন গন্তব্যের ভাড়া জানেন। যাত্রীরা অ্যাপে রিকোয়েস্ট দিয়ে অযথা সময় নষ্ট করতে চান না। যাত্রীরা চুক্তিতে চলে যান।

Manual7 Ad Code

তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে পরিবহন ধর্মঘট, বাসে অর্ধেক ভাড়া কার্যকরের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে যানবাহনের সংকট থাকায় বেশি ভাড়ার পাশাপাশি যাত্রীরা চুক্তিতে চলতে বাধ্য হন। পরিবহন সংকটের অজুহাত দেখিয়ে চালকরা যাত্রীদের বাধ্য করেন বেশি ভাড়ায় চুক্তিতে চলাচল করতে।

চুক্তিতে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে একাধিক চালক এ প্রতিবেদককে জানান, অ্যাপসের মাধ্যমে গেলে বিভিন্নভাবে টাকা কেটে নেওয়ার পর যা থাকে, তাতে তেলের দাম ওঠে না। তাই বাধ্য হয়ে অ্যাপস ছেড়ে চুক্তিভিত্তিক ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করছেন। অনেকে আবার সময় বাঁচানোর জন্য চুক্তিতে চলাচল করেন। অ্যাপে কল দিয়ে অযথা সময় নষ্ট করতে চান না।

পাঠাওয়ের সিইও অ্যান্ড ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফাহিম আহমেদ বলেন, ‘পাঠাও সবসময় রাইডার ও যাত্রী উভয় পক্ষের কথা বিবেচনা করে সরকার নির্ধারিত নীতিমালার মধ্যে ভাড়া নির্ধারণ করে। কিন্তু কিছু অসাধু রাইডার বাড়তি ভাড়া আদায়ের জন্য দিনের বিশেষ কিছু সময়ে অফলাইন ট্রিপ দিয়ে থাকেন। যাত্রীদের একটি অংশ সচেতনার অভাবে অফলাইন সার্ভিসটি গ্রহণ করছে।  তবে আমরা মনে করি, এক্ষেত্রে যাত্রীদের অনেক বড় একটি ভূমিকা আছে। তারা অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারে আগ্রহী হলে,  চুক্তিতে না যেতে চাইলে রাইডারদের তাতে আপত্তি করার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই আমরা ইউজারদের এই বিষয়ে সচেতন করতে কাজ করছি।

Manual5 Ad Code

‘গন্তব্য পছন্দ না হলে চালকেরা যেতে অস্বীকৃতি জানান। যাত্রীকে রিকোয়েস্ট বাতিল করতে বাধ্য করেন। সেক্ষেত্রে যাত্রীকে জরিমানা গুনতে হচ্ছে।’ এমন অভিযোগের জবাবে ফাহিম আহমেদ বলেন,‘পাঠাও-তে সবসময় রাইডাররা তাদের ডেস্টিনেশন রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার আগেই দেখতে পারেন। তাই রাইডাররা কেবল তখন-ই রাইড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেন, যখন তিনি গন্তব্যে যেতে ইচছুক। যার ফলে রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার পর সচরাচর রাইড ক্যান্সেল করা হয় না। এরপরেও যদি কোনো রাইড ক্যান্সেল হয়, তাহলে সেই রাইডের জন্য ইউজারের কাছ থেকে পাঠাও কোনো ধরনের জরিমানা আদায় করে না।

যাত্রীদের কাছ থেকে চালকদের বাড়তি ভাড়া আদায় করা প্রসঙ্গে পাঠাওয়ের সিইও বলেন, ‘পাঠাও-এর ভাড়া অ্যাপসভিত্তিক। ট্রিপ শুরু হওয়ার আগে রাইডার ও যাত্রী  উভয়েই ভাড়া দেখতে পারেন। রাইড শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত ভাড়া রাইডার ও যাত্রী উভয়েই নিজেদের ফোনে দেখার সুযোগ পান। তাই অ্যাপস ব্যবহার করলে রাইডাররা যাত্রীদের কাছ থেকে কোনোভাবেই বাড়তি ভাড়া আদায় করতে পারবেন না। শুধু অফলাইন ট্রিপ বা চুক্তিভিত্তিক ট্রিপেই এমনটা হয়ে থাকে।

Manual5 Ad Code

অ্যাপসে না যাওয়ায় চালক-যাত্রী  উভয়ের তথ্য অ্যাপস কোম্পানির ট্র্যাকে থাকে না। ফলে নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ছেন উভয়ে। এই প্রসঙ্গে ফাহিম বলেন, ‘ইউজাররা এখন তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে দিনে দিনে আরও সচেতন হচ্ছেন। অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ে রাইডার ও যাত্রীর একে অন্যের নাম, মোবাইল নম্বর পেয়ে থাকেন। এছাড়া, যাত্রীরা জানতে পারেন, বাইকের রেজিস্ট্রেশন ও রাইডারের সার্ভিস কোয়ালিটি সম্পর্কে। জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু থাকায় কোনো দুর্ঘটনা বা জরুরি প্রয়োজনে কিংবা অপরাধ ঘটলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারে।  সঙ্গে রাইডার ও যাত্রীর জন্য আছে ইনস্যুরেন্স সুবিধা। অফলাইন ট্রিপে এই সব সুযোগ থাকে না। তাই চুক্তিভিত্তিক ট্রিপে বা অফলাইনে রাইডার ও যাত্রী; উভইয়েই নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন। বিভিন্ন ট্রেনিং ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আমরা তাদের সচেতন করার চেষ্টা করছি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য সংবাদ মাধ্যমের পক্ষ থেকে ই-মেইলে উবারের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। জবাবে উবারের একজন মুখপাত্র ই-মেইল বার্তায় বলেন, ‘অফলাইন বা প্ল্যাটফর্মের বাইরে নেওয়া ট্রিপগুলোতে যাত্রী বা চালক কারোরই কোনো দায় বা নিরাপত্তা সহায়তার ব্যবস্থা থাকে না। তাই এ ধরনের ট্রিপকে আমরা দৃঢ়ভাবে নিরুৎসাহিত করি। অফলাইন ট্রিপগুলো জিপিএসের আওতায় থাকে না বলে এগুলোকে ট্র্যাকও করা যায় না। অফলাইন ট্রিপে যাত্রী ও চালকরা উবার অ্যাপের কোনো সেইফটি ফিচারের সুবিধা পান না অথবা নিরাপত্তা সহায়তা টিমের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন না। এছাড়া, যাত্রীরা বুকিংয়ের সময় চালকের নাম, ছবি, রেটিং দেখতে পান না। যদি যাত্রী কোনো কারণে পুলিশের কাছে  রিপোর্ট করতে চান, এক্ষেত্রে পুলিশের কাছে দেওয়ার মতো প্রাথমিক তথ্যগুলোও তার হাতে থাকবে না। এ ধরনের ট্রিপের আরেকটি অসুবিধা হলো কোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালক ও যাত্রীদের জন্য এখানে কোনো ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ থাকে না।

মেইলে আরও বলা হয়, ‘প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নেওয়া ট্রিপগুলো যাত্রীদের সুবিধাজনক ও নিরাপদ যাতায়াতের সুবিধা দেয়। চালকরাও এখানে অ্যাপসের সেইফটি ফিচারের সুবিধার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য আয় করার সুযোগ পান। সম্প্রতি, অফলাইন ট্রিপকে বেআইনি ও অনিরাপদ হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষও (বিআরটিএ) যাত্রী ও চালকদের এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে। আমরা যাত্রীদের দারুণ অভিজ্ঞতা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কিন্তু চালকরা ট্রিপ ক্যান্সেল করে দিলে আমাদের প্রতিজ্ঞা আমরা রাখতে পারি না। এই সমস্যা সমাধানেও আমরা কাজ করছি। যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া-মন্তব্য আমাদের সেবাকে উন্নত করতে ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সাহায্য করে। যেসব চালকের ট্রিপ ক্যান্সেল করার হার বেশি তাদের জরিমানা করা হয়। অনেক সময় তাদের উবার অ্যাপে প্রবেশাধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code