গণতন্ত্রের জন্য ন্যায্যতা, বাক্‌স্বাধীনতা জরুরি

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ২ years ago

Manual2 Ad Code

নিউজ ডেস্ক: দেশের উন্নয়ন কে করছে—সরকার নাকি জনগণ? আবার উন্নয়নের অর্থই-বা কী—এই বিতর্ক দিয়েই শুরু হয়েছে উন্নয়নের ওপর সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের তিন দিনব্যাপী বার্ষিক সম্মেলন।

সম্মেলনের প্রথম দিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যের আলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এস আর ওসমানী বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য ন্যায্যতা ও বাক্‌স্বাধীনতা জরুরি।

Manual1 Ad Code

অনেক সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমরা উন্নয়ন করে দিচ্ছি। আমি মনে করি, জনগণ উন্নয়ন করছে। সরকার শুধু সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছে। উন্নয়নের মূল কারিগর হলো বেসরকারি খাত।

উন্নয়ন নিয়ে এস আর ওসমানীর এমন বক্তব্যের বিপরীতে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘গণতন্ত্র, অধিকার, ভোটাধিকার, সুশাসন—এসব শব্দ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে বেড়ায় সুশীল সমাজে। আমার কাছে উন্নয়ন মানে হচ্ছে, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ টিউবওয়েল, সেতু, ঘর, খাবার পাচ্ছে কি না।’

অন্যদিকে স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, উন্নয়নের জন্য বাক্‌স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেওয়ার কোনো কারণ নেই।

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও বাক্স্বাধীনতার বিষয়ে এভাবেই নিজেদের মত তুলে ধরেন সরকারের মন্ত্রী ও দেশ-বিদেশে কর্মরত দুই অর্থনীতিবিদ। এ নিয়ে একে অপরের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও পরিকল্পনামন্ত্রী স্বীকার করেছেন, দেশে শ্রেণিবিভাজন আছে। অন্যায্যতা আছে। বৈষম্যও বাড়ছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৭ ডিসেম্বর,২০২৩)রাজধানীর গুলশানের এক হোটেলে তিন দিনের এই সম্মেলন শুরু হয়েছে। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য—উন্নয়ন, ন্যায্যতা ও স্বাধীনতা। উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল প্রবন্ধে এস আর ওসমানী গণতন্ত্র, বাক্‌স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, ভোটাধিকার, মানবাধিকার, উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি—এসবের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরেন। এ ছাড়া বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান।

অধ্যাপক এস আর ওসমানী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, গণতন্ত্রের জন্য বাক্‌স্বাধীনতা ও তথ্যের স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র শুধু ভোটের বিষয় নয়। রাতের ভোট হোক, আর দিনের ভোট হোক—এটি গণতন্ত্রের জন্য পর্যাপ্ত নয়। গণতন্ত্রে জনগণের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। বিভিন্ন বিষয়ে হতে হবে তর্কবিতর্ক। জনস্বার্থে জনপরিসরে জনগণের মধ্যে এসব নিয়ে আলোচনা হবে। এ ধরনের আলোচনা নীতি প্রণয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করে, অর্থনীতিকেও এগিয়ে নিয়ে যায়।

পাল্টা মত পরিকল্পনামন্ত্রীর
মূল প্রবন্ধকারের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আপনাদের কথাবার্তা এবং আমার নির্বাচনী এলাকার চিত্রের মধ্যে পার্থক্য আছে। আমি যখন নিজের এলাকায় যাই, তখন জনগণ টিউবওয়েল চায়, শৌচাগার চায়, সেতু চায়, কমিউনিটি ক্লিনিকে পর্যাপ্ত ওষুধ চায়। বর্তমান সরকার আট লাখ আশ্রয়হীন মানুষকে ঘর দিয়েছে। এসবই উন্নয়ন। তবে স্বীকার করছি, এ দেশে শ্রেণিবিভাজন আছে। অন্যায্যতা আছে। বৈষম্য বাড়ছে। কারা লুণ্ঠন করছে, কারা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নিজেদের আলাদা করে রেখেছে—তা দেখতে হবে।’

একই পর্বে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান বলেন, দেশে সমতা বণ্টনে সহায়তা করে প্রতিষ্ঠান। তাই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোরও ন্যায্যতা জরুরি।

Manual4 Ad Code

বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেনের মতে, গণতন্ত্র না থাকলে মানুষের মন পাথরের মতো হয়ে যায়। জনগণের প্রত্যাশার মাধ্যমেই গণতন্ত্রের তাগিদ বোঝা যায়।

অর্থনৈতিক সংস্কারে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ নিয়ে দিনের অপর এক কর্ম-অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। সেখানে তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে সংস্কার দরকার, আর সে জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, নির্বাচনের আগে সংস্কার করা হয়তো যাবে না। কিন্তু বাজারভিত্তিক সুদের হার ও মুদ্রা বিনিময় হার, বিদেশি ঋণের বকেয়া পরিশোধ—এসব বিষয়ে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনেরা অর্থনীতি বিষয়ে যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গঠন করবে, তাদের যেমন গ্রহণযোগ্য হতে হবে, তেমনি শক্তিশালী রাজনৈতিক ক্ষমতাও থাকতে হবে। এখন যে ধারা চলছে, তা দিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চলবে না।

কর্ম-অধিবেশনটিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আর্থিক খাতে সরকার, বেসরকারি খাত এবং বাজার—এই তিনটি নিয়ামক আছে। নীতিনির্ধারক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। নীতিনির্ধারকেরা সংস্কার করেন, কিন্তু তাঁদের বন্ধু-সহকর্মীরাই ব্যবসায়ী। ব্যাংক খাতে এখন সংস্কার হচ্ছে উল্টোরথের মতো।

Manual4 Ad Code

তাহলে ভবিষ্যৎ কী—এমন প্রশ্ন করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, চ্যালেঞ্জ আছে, অনিশ্চয়তা আছে, শঙ্কা আছে। এই শঙ্কা নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা। আবার নির্বাচনের পরে কী হবে—সেই শঙ্কাও আছে।

Manual5 Ad Code

এরপর এদিন আরও পাঁচটি কর্ম-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মধ্যাহ্ন বিরতি, চা পানের বিরতি দিয়ে এসব অধিবেশন চলে। এসব অধিবেশনে বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ সিদ্ধার্থ শর্মা ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ প্যাট্রিক আলেক্সান্ডার, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক গায়ত্রী বি কুলওয়াল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ, বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মনজুর হোসেন ও মোহাম্মদ ইউনুস, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ জহির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অতনু রব্বানি, গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আলোচনায় অংশ নেন অনলাইনে যুক্ত হয়ে। আর কেউ কেউ সশরীর উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশন শুরু হবে আজ শুক্রবার সকাল নয়টায়। এদিনও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আটটি কর্ম-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code