

সম্পাদকীয়: একটি দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে কারিগরি শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। একজন মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে শিক্ষা একটি। তবে সে শিক্ষা সাধারণ শিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষা হতে পারে। একটি দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। যে দেশের মানুষ কারিগরি শিক্ষায় যত উন্নত সে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তত উন্নত। এমন কি ঐ দেশের বেকার মানুষের সংখ্যাও অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম। তাই আমাদের দেশকে উন্নত দেশের পর্যায়ে নিতে হলে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আমাদের আরো নজর দিতে হবে। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ বেকার। এই বেকার জনগোষ্ঠীকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে আমাদের সম্পদে পরিণত হবে। অতি অল্প সময়ে পাল্টে যাবে দেশের চেহারা। শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলাদেশে এখন আগের তুলনায় অনেকটা উন্নয়নের পথে। বর্তমানে অগ্রগতির নানা ধাপ অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে। উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে বাংলাদেশ। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় এখন আমাদের বাংলাদেশের অবস্থান। মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উন্নীত হওয়ার পথ ধরে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। অথচ এক সময়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দরিদ্র দেশের তালিকায়। তলাবিহীন ঝুড়িও আখ্যা দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশকে। কিন্তু গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অগ্রগতি সহজেই চোখে পড়ার মতো।
ছোট্ট একটি ভূখন্ডে আমরা অনেক মানুষ বাস করি। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি। মোট আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার চাপ বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে অভাব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব রয়ে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যে গতিতে এগিয়ে চলেছে, বাংলাদেশ ঠিক সেভাবে এগিয়ে যেতে পারছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি একসময়ে পুরোপুরি কৃষিনির্ভর ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তৈরি পোশাকশিল্প। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে উজ্জ্বল অবস্থানে পৌঁছে গেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে। এছাড়াও আমাদের রফতানি পণ্য তালিকায় নতুন নতুন আইটেম যুক্ত হচ্ছে। আজকাল বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন শিল্পজাত সামগ্রী, ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য পৃথিবীর অনেক দেশে যাচ্ছে। এগুলোর বেশ ভাল চাহিদা রয়েছে। কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে একসময়ে বাংলাদেশের যে পরিচিতি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে সময়ের পালাবদলে। প্রযুক্তির নানা বিকাশ, শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির রাজত্ব গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক কাঠামোয় এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। এখন বিশ্বব্যাপী কারিগরি জ্ঞানের কদর খুব সহজেই চোখে পড়ে। বিদেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছে। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব সৃষ্টি করে রেখেছে অনেক দিন ধরে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশসহ আমেরিকায় বাংলাদেশের অগণিত মানুষ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। জনশক্তি খাত থেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে বর্তমানে তা আরো কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। কারণ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অদক্ষ, কারিগরি জ্ঞান না থাকা অশিক্ষিত কর্মীরা অন্যান্য দেশের দক্ষ অভিজ্ঞ কারিগরি জ্ঞান জানা শিক্ষিত কর্মীদের তুলনায় অনেক কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। অদক্ষ, আধাদক্ষ কারিগরি জ্ঞান না থাকা শ্রমিক, কর্মীদের বেতন নিয়ে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, মালিকের সঙ্গে দর কষাকষির সুযোগ থাকে না। তারা অন্যান্য দেশের কারিগরি জ্ঞান থাকা শিক্ষিত দক্ষ শ্রমিক-কর্মীদের তুলনায় এক্ষেত্রে অনেক দুর্বল এবং অসুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন। ফলে তারা উচ্চ হারে পারিশ্রমিক দাবি করতে পারে না। অনেকটা বাধ্য হয়ে তারা অপেক্ষাকৃত কম বেতনে সেখানে কাজ করে। এ কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ এখনো বেশ অনেকটা পিছিয়ে আছে। ফলে বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানি খাত থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এখাত থেকে আরো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারতো। যদি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তেমন উপযুক্ত কাজ নিয়ে বাংলাদেশের কর্মীরা বিদেশে যেতে পারে তাহলে প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে অন্যান্য দেশের কর্মীদের টেক্কা দিতে পারবে। বাংলাদেশের কর্মীরা অনেক পরিশ্রম করে বটে কিন্তু কারিগরি শিক্ষা না থাকায় তাদের অদক্ষ, আধা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ফলে তারা তাদের শ্রমের উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।