

নিউজ ডেস্ক বাংলাদেশঃ ১৯৩৩ সালের ৪ মার্চ ফ্রাংকলিন ডিলানো রুজভেল্ট যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। তখন আমেরিকায় বেকারত্ব ছিল ঊর্ধ্বে, অর্থনীতি এবং কৃষি খাত ছিল চরম দুরবস্থায়। রুজভেল্ট এসব খাতের উন্নতিকেই তার ১০০ দিনের লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন। ১০০ দিন শেষে তিনি এসব খাতে উন্নতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
এজন্য তিনি কংগ্রেসে ১৫টি বিল পাশ করিয়েছিলেন। আরেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সামনেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ। তিনিও রুজভেল্টের মডেল নিয়ে গবেষণা করছেন। রুজভেল্টের চেয়ে ব্যতিক্রমী এক দুর্যোগের মুখোমুখি বাইডেন। তা হলো—করোনা মহামারি। এতে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং ১ কোটি আমেরিকানের বেকারত্ব তাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। আরো আছে—রাজনৈতিক বিভক্তি, বর্ণবাদ, জলবায়ু ও অভিবাসন নীতিসহ অনেক ইস্যু। তবে এসব কিছুর মধ্যে আমেরিকানদের মাস্ক পরানোই বাইডেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বড় চ্যালেঞ্জ মাস্ক
জো বাইডেন তার ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় বসার প্রথম দিন থেকেই তিনি যে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, তা হয়তো তিনি কখনো প্রত্যাশাই করেননি। বাইডেন বলেছেন, করোনা মহামারি মোকাবিলা করে মার্কিনিদের জীবন রক্ষা করা তার প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। তার প্রথম পদক্ষেপই ছিল দেশ জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সব ভবনে এবং আন্তঃরাজ্য ভ্রমণের সময় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে নির্বাহী আদেশ জারি করা। তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর যারা এতদিন মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার বিরোধিতা করে আসছেন তারা যে হঠাত্ করেই তাদের মত পরিবর্তন করবেন, সেটির নিশ্চয়তা নেই। আর সারা দেশে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে আদেশ জারি করার আইনগত কোনো পথ প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় কার্যত নেই। বাইডেন এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। বাইডেন বলেছেন, গর্ভনরদের মত বদলাতে রাজি করাতে ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করবেন। গভর্নররা তার কথা না মানলে মেয়র এবং পৌর এলাকার কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাবেন। তবে সেটা কার্যকর করার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। বাইডেন চান, প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ১০ কোটি মানুষকে করোনার টিকার অন্তত প্রথম ডোজ দিয়ে দেওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আবার যোগদান
আমেরিকার আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দিচ্ছে। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে বাইডেন প্রশাসন নির্বাহী আদেশও জারি করেছে। গ্রীষ্মে সদ্যবিদায়ি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, চীনে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর বিস্তার ঠেকাতে এবং সংস্থায় জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বের করে আনার ঘোষণা দেন।
অর্থনৈতিক পদক্ষেপ
বাইডেনের প্রশাসনিক টিমের সদস্যরা বলেছেন, বাসা ভাড়া না দিতে পারায় ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ বা বাড়ি কেনার বন্ধকের অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে বাড়ি বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখার মেয়াদ আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা বাইডেনের রয়েছে। মহামারি শুরু হওয়ার পর এই স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছিল। এছাড়াও সরকারের কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে শিক্ষার্থীদের দেওয়া ঋণের কিস্তি সুদসহ পরিশোধের প্রক্রিয়াও এখন বন্ধ রাখা হয়েছে। সেটিও চালু রাখতে চান জো বাইডেন। ট্রাম্প তার ক্ষমতার প্রথম দিকে ২০১৭ সালে যে কর ছাড় অনুমোদন করেন, বাইডেনের টিম বলছে সেটা শুধু ধনী আমেরিকানদের পকেট ভারী করেছে। ছোটখাটো ব্যবসায়ীরা এই ছাড়ের সুবিধা মোটেও পাননি। বাইডেন ব্যবসায়ে বিদেশ থেকে অর্জিত আয়ের ওপরও কর বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন।
১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার করোনা ভাইরাস অর্থনীতি
করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে বিপর্যস্ত আমেরিকান অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের জন্য বাইডেন ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। গত ডিসেম্বরে কংগ্রেস ৯০০ বিলিয়ন ডলারের যে আর্থিক প্যাকেজ অনুমোদন করেছিল এটা তার ওপর বাড়তি প্রণোদনা প্যাকেজ। রিপাবলিকান আইন প্রণেতারা এই বিলের কিছু অংশের বিরোধিতা করতে পারেন এমন সম্ভাবনা আছে। কারণ মহামারির প্রভাব সামাল দিতে আমেরিকা যে ঋণ নিয়েছে তার বোঝা এর ফলে আরো বাড়বে। পরিকল্পিত এই বিল পাশ হতে হলে বাইডেনের জন্য রিপাবলিকানদের সমর্থনের প্রয়োজন হবে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই অল্প ব্যবধানের।
প্যারিস চুক্তিতে ফেরা
বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনই তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আমেরিকাকে আবার ফিরিয়ে নিয়েছেন। এই চুক্তিতে বিশ্ব নেতারা পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে রাখার অঙ্গীকার করেছিলেন, যেটা ছিল শিল্পায়নের আগের বিশ্বের তাপমাত্রা। ট্রাম্প ২০১৫ সালে সম্পাদিত ঐ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন। বাইডেন বলেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে আমেরিকার কার্বন নিঃসারণের মাত্রা যাতে শূন্যে নামিয়ে আনা যায়, তার জন্য এ বছরই তিনি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবেন। এছাড়া ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি বদলানো, ১ কোটি ১০ লাখের বেশি অভিবাসীকে নাগরিকত্ব প্রদান, ৫৪৫ অভিবাসী শিশুকে মা-বাবার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া, সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ রদ, বর্ণবাদ ও ফৌজদারি বিচারে সংস্কার এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকান মিত্রদের কাছে আবার বিশ্বাসযোগ্যতা স্থাপন করা এবং তাদের পাশে থাকার বিষয়ে আশ্বস্ত করা।