

বিশেষ প্রতিবেদন:
সপ্তাহ দুয়েক আগে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কথাগুলো বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলছিলেন, ‘প্রতিবছর উৎসবের মরশুমে তার রাজ্যবাসীকে যে পদ্মার ইলিশের ভরসায় তাকিয়ে থাকতে হয়, সেদিন এবার অতীত হতে চলেছে।’ পশ্চিমবঙ্গেও প্রচুর পরিমাণে সুস্বাদু ইলিশ পাওয়া যাবে বলে সেদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন বলেন, ‘আমাদের রাজ্যে কোলাঘাট কিংবা ডায়মন্ড হারবারেও এখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ আসছে। ওপারের ইলিশের ভরসায় আর আমাদের বসে থাকতে হবে না। ডায়মন্ড হারবারে আমরা তো একটি ইলিশ গবেষণা কেন্দ্রও স্থাপন করেছি, তারা দারুণ কাজ করছে।’
খোকা ইলিশ (যাকে বাংলাদেশে জাটকা বলা হয়) ধরা বন্ধ করতে সচেতনতা বাড়াতেও জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
রাজ্য বিধানসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্যের পরেই শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক, পশ্চিমবঙ্গর পক্ষে কি আদৌ পদ্মার ইলিশকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব? যদি গঙ্গা বা হুগলী নদীতে ইলিশের উৎপাদন (প্রোডাকশন) বাড়ানো যায়, তা কি স্বাদে-গন্ধে কখনও পদ্মার ইলিশের তুলনীয় হতে পারবে?
এই প্রশ্নটা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভেতরেও বিশেষজ্ঞ বা ইলিশপ্রেমীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে নানা রকম অভিমত।
কলকাতায় সুপরিচিত ইলিশ গবেষক ও বিজ্ঞানী অসীম কুমার নাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদ্মার ইলিশের কেন এত নামডাক, সেটা আগে আমাদের বুঝতে হবে। ইলিশ যখন বঙ্গোপসাগর থেকে পদ্মায় ঢোকে, তখন প্রথমে মেঘনার এসচুয়ারি দিয়ে ঢুকে পুরো মেঘনা পাড়ি দিয়ে তারপর পদ্মায় আসে। আর মিঠা পানিতে এতটা সময় থাকার জন্যই স্বাদে-গন্ধে অনন্য হয়ে ওঠে সেই ইলিশ।’
তিনি বলেন, ‘সমুদ্রে ইলিশের শরীরে যে ফ্যাট বা লিপিড জমা হয়, নদীতে সাঁতরানোর সময় সেই লিপিড ভেঙেই ইলিশের শরীরে তৈরি হয় পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড বা ‘পুফা’। ওমেগা থ্রি, ওমেগা সিক্স বা লিনোলেনিক অ্যাসিডের মতো এসব পুফা কিন্তু ইলিশের স্বাদ পাল্টে দেয়। সমুদ্রে ধরা ইলিশের চেয়ে তাই চাঁদপুর বা হার্ডিঞ্জ ব্রিজে ধরা ইলিশ খেতে অনেক বেশি ভালো!’
‘এখন প্রশ্ন হলো, পশ্চিমবঙ্গে সেই মানের ইলিশ পাওয়া সম্ভব কি না? আমার উত্তর হলো, হ্যাঁ সম্ভব, যদি আপনি ইলিশটাকে সেই পরিমাণ দৌড় করাতে পারেন। একই তো বঙ্গোপসাগর থেকে গঙ্গায় আসছে, কিন্তু মোহনার কাছাকাছি না ধরে আপনি যদি সেটা কয়েক শ মাইল উজানে মুর্শিদাবাদে গিয়ে ধরতে পারেন, তাহলে সেই একই স্বাদ না পাওয়ার কোনও কারণ নেই। সুতরাং পদ্মার ইলিশের স্বাদ পেতে হলে গঙ্গাতেও ইলিশকে অনেকটা ‘রান’ করাতে হবে। তবেই মিলবে সেই স্বাদ আর গন্ধ’, বলছিলেন অধ্যাপক অসীম কুমার নাথ।